বালুরঘাটের সাত কালী পুজোর ইতিহাস কত বছরের?
ডিজিটাল ডেস্ক , নিউজ বাজার২৪: উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সদর শহর বালুরঘাটের আত্রেয়ী নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শত শত বছরের ইতিহাস ও জনশ্রুতি। তবে শহরের ডাঙা গ্রাম পঞ্চায়েতের মাহিনগর এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘সাত কালী’-র পুজো বঙ্গদেশের শক্তি আরাধনার ইতিহাসে এক বিরল ও অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। আজ থেকে প্রায় ৩০০ বছর আগে শুরু হওয়া এই পুজোয় সাতজন দেবীকে সাত বোন হিসেবে কল্পনা করে আরাধনা করা হয়, যা ভক্তি, ঐতিহ্য এবং অনন্য সামাজিক আচারের অপূর্ব মিলনক্ষেত্র।
জমিদারি আমলের সূচনা ও ‘সাত বোন’ কালীর অবস্থান:
স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের বয়ান অনুযায়ী, প্রায় তিনশো বছর আগে এই অঞ্চলের তৎকালীন সুকুল জমিদার মহাসমারোহে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। এলাকার অধিবাসীরা এই সাত দেবীকে নিজের পরিবারের সাত বোনের মতোই পরম স্নেহে ও ভক্তিভরে দেখে আসছেন। এই সাত বোনের মণ্ডপগুলি পুরো এলাকাজুড়ে আলাদা আলাদা স্থানে অবস্থিত:
১)বামাকালী: স্থান—স্কুল মোড় এলাকা।
২)সুরকালী: স্থান—সেন্ট পিটার্স এলাকা।
৩)চণ্ডীকালী: স্থান—মাহিনগর এলাকা।
৪)নির্দয়াকালী: স্থান—আত্রেয়ী নদীর পার।
৫)বুড়াকালী: স্থান—মিশন এলাকা।
৬)ঘাটকালী: স্থান—বিসর্জনের ঘাট। (সাত বোনের মধ্যে কনিষ্ঠা বা সবথেকে ছোট বোন)।
৭) সন্ন্যাসকালী: স্থান—মণ্ডলপাড়া। (তবে দুঃখের বিষয়, সন্ন্যাসকালীর মণ্ডপ এলাকাটি সরকারি কৃষি ফার্মের অধীনে চলে যাওয়ায় বর্তমানে এই একটি পুজো বন্ধ রয়েছে)।
আরও পড়ুন- মা কালীর গায়ের রং কালো, নীল, সবুজ বা লাল কেন? জানুন এর ধর্মীয় ও দার্শনিক তাৎপর্য
একই পুরোহিতের পুজো ও ভোরের আলোয় ‘ঘাটকালী’ আরাধনা:
এই পুজোর সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অলৌকিক নিয়ম হলো—সাতটি আলাদা মণ্ডপে দেবীদের পুজো করার জন্য আলাদা কোনো পুরোহিত থাকেন না। একজনমাত্র পুরোহিতই পুরো রাত জেগে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে ঘুরে পর্যায়ক্রমে পুজো সম্পন্ন করেন।
ক্রম অনুযায়ী ছোট বোন ‘ঘাটকালী’র পুজো হতে হতে রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটে যায়। তাই শত শত বছর ধরে চলা প্রাচীন নিয়ম মেনে ঘাটকালীর পুজো কালীপুজোর পরদিন সকালে শুরু হয় এবং বিকেল পর্যন্ত চলে।
ঘাটকালী চত্বরে সমাগম ও নদী না পুড়িয়ে পুকুরে বিসর্জন:
সাত কালীর এই বিসর্জন প্রথা ও নিয়ম বঙ্গদেশের অন্য কোনো পুজোয় দেখা যায় না:
পরদিনের বিসর্জন মিলনক্ষেত্র: কালীপুজোর পরদিন বিকেলে অন্যান্য সমস্ত কালী প্রতিমাকে শোভাযাত্রা করে নিয়ে এসে কনিষ্ঠা বোন ‘ঘাটকালী’র মন্দিরে একত্রিত করা হয়।
আরও পড়ুন-ভাইফোঁটার ধর্মীয় তাৎপর্য: যমরাজ ও যমুনার কাহিনীতে নিহিত ভালোবাসা ও আশীর্বাদ
পুকুরে বিসর্জনের নিয়ম: এই পুজোর প্রতিষ্ঠাতা সুকুল জমিদার আত্রেয়ী নদীর মূল স্রোতে প্রতিমা বিসর্জন দিতেন না। দেবী প্রতিমার পবিত্রতা রক্ষায় তিনি নদীর পাশেই একটি পৃথক জলাশয় বা পুকুর খনন করিয়েছিলেন। আজও পুরনো সেই নিয়ম মেনেই ঘাটকালী চত্বরের কাছে সব প্রতিমা জমায়েত করে পুকুরেই একসঙ্গে বিসর্জন দেওয়া হয়।
ঘাটকালীর পুজোকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর এলাকাজুড়ে বসে জমজমাট মেলা। ভক্তদের বিশ্বাস, সাত বোন রূপী এই মা কালীর দরবারে পরম নিষ্ঠায় মানত করলে কোনো ভক্তই খালি হাতে ফেরেন না।



