news bazar24 : আঙ্গুর এমন একটি ফল যা ছোট থেকে বড় সবাই পছন্দ করে । ইতিহাস বলছে আজ থেকে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে প্রথিবীতে প্রথম আঙ্গুর চাষ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পার্শি এর হাত ভারতীয় উপমহাদেশে আঙুরের চাষ শুরু হয় । আঙ্গুর মূলত লতা জাতীয় এক প্রকারের টক মিষ্টি ফল। এটি বহু বর্ষজীবী বিরুৎ উদ্ভিদ। পাশাপাশি আঙ্গুর নানান পুষ্টি গুনেও ভরপুর। তবে এই আঙ্গুর আমাদের দেশের সব জায়গায় সমান ভাবে আঙ্গুর চাষ হয় না। হলেও গুনাগত মান ভালো হয় না। কিন্তু আপনি যদি চান তাহলে নিজের ছাদ বাগানে খুব সহজেই চাষ করে ফেলতে পারেন এই ফলের। বানিয়ে ফেলতে পারেন ছাদেই আঙুর বাগান।
ছাদে কীভাবে চাষ করবেন আঙুরের, জেনে নিন এখনই-
জমি অপেক্ষা টবে আঙ্গুর গাছের খুব সহজে যত্ন নেওয়া যায় বলে অনেকেই বাড়ির টবে আঙ্গুর চাষ করে থাকেন। এক্ষেত্রে মাটির টব কিংবা বড়ো ড্রামের অর্ধেক অংশে খুব সহজেই আঙ্গুর গাছ লাগানো যায়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন টবের আকার সঠিক হয় এবং গাছ যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান মাটি থেকে নিয়মিত পায়।
টবের আকার-
টবে আঙ্গুর চাষ করতে হলে টবের আকার হতে হবে অন্তত পক্ষে ১৪”/১৪” ইঞ্চি থেকে ১৮। ড্রামের সাইজ বড়ো হলে একসাথে ২টি গাছ লাগাতে পারেন।
জাতের পরিচয় :
আমাদের দেশে এ যাবত ৩টি উৎপাদনশীল আঙ্গুর গাছের জাত নির্বাচন করা হয়েছে। (১)জাক্কাউ, (২)ব্ল্যাক রুবী, (৩) ব্ল্যাক পার্ল। তিনটি জাতই গ্রীষ্মকালীন এবং পরে তিনটি রঙের রূপান্তরিত হয়ে যথাক্রমে হালকা বাদামি, কালো ও করমচা রং ধারণ করে। ফলন আসতে সময় লাগে প্রায় দু’বছর।
আঙ্গুরের বংশ বৃদ্ধি :
বীজ ও কলম উভয় মাধ্যমে আঙ্গুরের বংশবৃদ্ধি ঘটে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, “বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হলে মাতৃগাছের গুণাগুণ সঠিকভাবে বজায় থাকে না। কিন্তু যদি কাণ্ডের কাটিং প্রাফটিং ও বার্ডিং পদ্ধতিতে কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করলে মাতৃগাছের গুণাগুন যথেষ্ট বজায় থাকে। তাই বীজের পরিবর্তে কলমের মাধ্যমে বংশ বিস্তার বা চাষাবাদ আপনার লাভদায়ক হবে। টবে চাইলে বীজ এর মাধ্যমেও করতে পারেন।
কাটিং কলম পদ্ধতি :
এটি সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। প্রধানত শীতে আঙ্গুর গাছের কাটিং করার উপযুক্ত সময়। কাটিং করতে হলে জানুয়ারি মাসে প্রথমেই তিন চোখবিশিষ্ট একটি কাণ্ড বেছে নিতে হবে। তারপর ১৫ সে.মি. লম্বা করে কাণ্ডটি ধারালো ছুরি দিয়ে উপরের দিকে সমান তেরছা করে এবং নিচের দিকে সমান্তরাল করে কাটতে হবে। কাণ্ড কাটার পর সেগুলো একত্রে বেঁধে অন্ধকার ঘরে প্রায় ২৪ ঘন্টা রেখে দিতে হবে, যাতে কাটা অংশ থেকে বের হওয়া আঠালো রস শুকিয়ে যেতে পারে। তারপর কাণ্ডের গিঁটসহ একটি চোখ কিছুটা কাত করে বীজতলায় রোপণ করতে হবে, অপর দু’টি চোখ মাটির উপরের দিকে থাকবে। কাটিং রোপণের ৪-৫ সপ্তাহ পর সেচ দিতে হবে এবং কাটিং রোপণের ৩-৪ মাস পর চারাগুলো মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। সাধারণত জানুয়ারি মাসে কাটিং বীজতলায় রোপণ করা হলে, ফ্রেরুয়ারি মাসে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে এবং মার্চ-এপ্রিল মাসে মূল জমিতে রোপণের উপযুক্ত হয়।
গুটি কলম পদ্ধতি :
আঙ্গুরের সুস্থ, সবল ও সোজা কাণ্ড বেছে নিয়ে তার ১ ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা থেকে বাকল তুলে ফেলতে হবে, যাতে কাঠ দেখা যায়। কাণ্ডের বাকল তোলা স্থানটি যাতে দু’টি চোখের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তারপর বাকল তোলা স্থানে সার-গোবর মিশ্রিত মাটি লাগিয়ে পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে দুই মাথা বেঁধে দিতে হবে। এভাবে ৩-৪ সপ্তাহ পর বাকল তোলা স্থান থেকে নতুন শিকড় গজাতে শুরু করবে এবং তা কেটে মূল জমিতে রোপণের উপযুক্ত হবে।
বাডিং কলম পদ্ধতি :
বাডিং পদ্ধতি মানে গাছের এক জাতকে অন্য জাতে রূপান্তরিত করা। প্রথমে, স্টক গাছের কিছু অংশের বাকল তুলে সেখানে অন্য একটি নির্বাচিত গাছের একই পরিমাণ চোখসহ চামড়া লাগিয়ে পলিথিন দিয়ে চোখ ছাড়া বাকি অংশ মুড়িয়ে দিতে হবে এবং ১০-১৪ দিন পর দেখা যাবে যে সংযুক্ত বাকলটি স্টক গাছের সাথে লেগে গেছে। তখন পলিথিনের বাঁধন খুলে দিতে হবে এবং স্টক গাছের উপরের অংশ কেটে দিতে হবে।
মাটি তৈরি –
চারা রোপনের আগে মোট মাটির তিনভাগের একভাগ পরিমান পচা গোবর সারের সাথে ১০০ গ্রাম টিএসপি ৫০ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে ১০ দিন রেখে দিতে হবে । মনে রাখতে হবে রাসায়নিক সারের পরিমাণ নির্ভর করবে টবের সাইজের উপর। এই হিসাবটি ১৬ ইঞ্চি টবের জন্য তৈরি করা। টবের আকার যদি আরো বড় হয় তবে ওই একই অনুপাতে প্রয়োজন মত রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে।
আঙ্গুর গাছের জলের চাহিদা তুলনামূলক একটু বেশি থাকে যার কারণে প্রায় প্রতিদিনই গাছে জল দিতে হয়। তবে অবশ্যই গাছের অবস্থা দেখে জল দেওয়া উচিৎ। ফল আসা শুরু হলে টবের নিচে জলকানদা ব্যবহার করতে হবে। কারণ ফল বা ফুল আসা অবস্থায় জলের অভাব হলে ফল ও ফুল ঝরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আঙ্গুর গাছে পোকামাকড়ের উপদ্রব দেখা দিলে রিপকরড বা ডেসিস ঔষধ প্রতি লিটার জলে ১ এম এল করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। গাছে মুচি আসার পর প্রায় সময় দেখা যায় মুচি পড়ে যায় বা কালো হয়ে যায় । এ অবস্থা থেকে গাছকে বাঁচাতে হলে ব্যাভিস্টিন বা টিল্ট প্রতি লিটার জলে ১ এম এল করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
এছাড়া এম৪৫ বা সাফ বা ব্লাইটক্স ১ লিটার জলে ১ চামচ দিয়ে প্রত্যেক সপ্তাহে একবার করে স্প্রে করা যায় তবে তেমন রোগবালাই আসার সম্ভাবনা নাই। আর মিলিবাগের আক্রমণ দেখা দিলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক ( যেমন এডমায়ার অথবা টিডো) প্রয়োগ করতে হবে। থ্রিপস এর জন্য ডাইমথয়েড কীটনাশক দিতে হবে। আর মাইটস/মাকড় এর জন্য ভার্মিটেক/ওমাইট/থিয়াভিট স্প্রে করতে হবে।
আঙ্গুর গাছের ফল অনেক সময় অপুষ্টিজনিত ঘাটতির কারণে ঝড়ে পড়ে এবং বড় হতে চায় না । এ অবস্থায় ফল ঝরা বন্ধ করতে এবং সঠিক মাত্রায় বৃদ্ধি নিশ্চত করতে ভেজিম্যাক্স ২ গ্ৰাম প্রতি লিটার জলে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এতে ফলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।


