কেন ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে প্রাক্তনের কথা মনে পড়ে
বর্তমান সম্পর্কের মাঝেও হঠাৎ প্রাক্তনের স্মৃতি ভেসে ওঠে—এটা কি স্বাভাবিক? মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে জটিল মানসিক কারণ। জানুন কেন এমন হয় এবং কীভাবে নিজেকে সামলাবেন।
নিউজ বাজার ২৪ ডেস্ক : জীবন নদীর স্রোত বয়ে চলে ঠিকই, কিন্তু কিছু বাঁকে জল জমে থাকে পুরনো স্মৃতির শ্যাওলা হয়ে। বর্তমান সঙ্গীর বাহুবন্দি হয়ে যখন ভালোবাসার উত্তাপ নিচ্ছেন, ঠিক তখনই হঠাৎ মনের কোনো এক চোরাকুঠুরি থেকে উঁকি দিল পুরনো সেই মুখ। সেই স্পর্শ, সেই চেনা সুগন্ধ কিংবা কোনো এক হারানো মুহূর্ত। বর্তমানের পূর্ণতার মাঝেও অতীতের এই চোরাবালিতে পা পিছলে যাওয়া— অনেকের কাছেই এক চরম অস্বস্তি আর অপরাধবোধের কারণ।
কিন্তু কেন এমন হয়? কেন বর্তমানের নিবিড় সুখেও প্রাক্তনের ছায়া দীর্ঘতর হয়? মনস্তত্ত্ববিদরা একে কেবল ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন না, বরং এর পেছনে দেখছেন এক জটিল ও রসালো মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণ।
স্মৃতির সেই মায়াবী মরীচিকা
আমাদের মস্তিষ্ক বড় অদ্ভুত এক রেকর্ডার। বিজ্ঞান বলছে, আমাদের শরীরে যখন ভালো লাগার হরমোন বা অক্সিটোসিনের জোয়ার আসে, তখন ব্রেন তার পুরনো ডায়েরিটা খুলে বসে। একে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘সেক্সুয়াল নস্টালজিয়া’। অনেকটা সেই পুরনো গানের মতো, যা শুনলেই মনের কোণে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে। প্রাক্তনের সঙ্গে কাটানো কোনো বিশেষ রসায়ন বা কোনো এক মুহূর্তের রেশ হয়তো অবচেতন মনে গেঁথে ছিল, যা বর্তমানের উদ্দীপনায় হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন – নেতিবাচক মানুষ থেকে সাবধান! মনের শান্তি বজায় রাখতে মেনে চলুন এই টিপস
কল্পনার ডানায় ভর করে ফেরা
মানুষের মন সব সময় যা পায়, তার চেয়ে যা হারিয়েছে তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যাকে পাওয়া যায়নি বা যার সঙ্গে পথ চলা শেষ হয়েছে, তাকে ঘিরে মনের কোণে একটা রহস্যময় রোমাঞ্চ থেকে যায়। বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে জীবন কাটানোর একঘেয়েমি বা যান্ত্রিকতা অনেক সময় আমাদের অবচেতনকে সেই পুরনো ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘হারানো’ স্বাদের খোঁজে পাঠায়। এটি ভালোবাসার অভাব নয়, বরং এক ধরণের মানসিক ফ্যান্টাসি।
অপ্রাপ্তির সেই চোরাকাঁটা
অনেক সময় বিচ্ছেদ হলেও মনের সব হিসেব মেলে না। কিছু না বলা কথা, কিছু না পাওয়া আদরের রেশ থেকে যায় মনের গহীনে। সেই অপূর্ণতার তৃষ্ণা মেটাতেই মন অনেক সময় বর্তমানের ক্যানভাসে অতীতের রঙ মিশিয়ে দেয়। একে প্রাক্তনের প্রতি টান ভাবলে ভুল হবে, এটি আসলে নিজেরই কিছু অতৃপ্ত অনুভূতির প্রতিধ্বনি মাত্র।
যখন বর্তমানের সুর কাটে
মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, অনেক সময় বর্তমান সম্পর্কের শীতলতা বা মানসিক দূরত্বের ফলেও এমনটা হতে পারে। আপনি যার পাশে আছেন, তার সঙ্গে যদি মনের মিল বা শারীরিক ছন্দের অভাব থাকে, তবে ব্রেন তার ‘ডিফল্ট সেটিং’ হিসেবে পুরনো সেই নিরাপদ ও আনন্দদায়ক স্মৃতিগুলোকেই আঁকড়ে ধরে।
অপরাধবোধ কি জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে প্রাক্তনের কথা মনে পড়া মানেই আপনি চরিত্রহীন নন। এটি আপনার কল্পনাপ্রবণ মনের একটি বিচিত্র খেলা মাত্র। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই অতীতের ছায়া যেন বর্তমানের ঘর না পোড়ায়। যদি এই স্মৃতি আপনার বর্তমান সম্পর্কে দেওয়াল তুলে দেয়, তবে সাবধান হওয়া প্রয়োজন।
অতীতের মায়া কাটিয়ে বর্তমানে ফেরার ৫টি অব্যর্থ উপায়
১. অপরাধবোধ ঝেড়ে ফেলুন: প্রথমেই এটা মেনে নিন যে, এটি মনের একটি অনিচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়া। নিজেকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বা ‘খারাপ মানুষ’ ভাবা বন্ধ করুন। আপনি যত বেশি এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন, স্মৃতিগুলো তত বেশি জেঁকে বসবে। বিষয়টিকে সহজভাবে নিলে এর গুরুত্ব ধীরে ধীরে কমে যাবে।
২. বর্তমানের স্পর্শে মনোযোগী হন (Mindfulness): মিলনের মুহূর্তে যখনই মন অতীতে চলে যেতে চাইবে, তখনই বর্তমান সঙ্গীর স্পর্শ, গলার স্বর বা নিঃশ্বাসের শব্দের ওপর জোর দিন। বর্তমান মুহূর্তের অনুভূতিগুলোকে অনুভব করার চেষ্টা করুন। একে বলা হয় ‘গ্রাউন্ডিং টেকনিক’—যা আপনাকে অবাস্তব কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনবে।
৩. একঘেয়েমি কাটান: অনেক সময় সম্পর্কের যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পেতে মন পুরনো স্মৃতির রোমাঞ্চ খোঁজে। বর্তমান সঙ্গীর সঙ্গে নতুন কিছু ট্রাই করুন। খোলামেলা কথা বলুন, দুজনে মিলে নতুন কোনো শখ বা ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন। সম্পর্কে নতুনত্বের ছোঁয়া লাগলে মন আর পুরনো গলিতে ঘুরপাক খাবে না।
৪. প্রাক্তনের সঙ্গে সব যোগাযোগ ছিন্ন করুন: যদি আপনি এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাক্তনের প্রোফাইল চেক করেন বা তাঁর খবর রাখেন, তবে অবচেতন মনে তাঁর ছবি গেঁথে থাকবেই। পুরোপুরি মুক্তি পেতে হলে ডিজিটাল এবং মানসিক—উভয় দিক থেকেই দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। ‘আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড’—এই নীতি মেনে চলুন।
৫. বর্তমান সঙ্গীর গুণের তালিকা তৈরি করুন: নিজের মনের ডায়েরিতে লিখুন, কেন আপনার বর্তমান সঙ্গী প্রাক্তনের চেয়ে আলাদা এবং কেন আপনি তাঁকে ভালোবাসেন। বর্তমান সম্পর্কের ইতিবাচক দিকগুলো যখন আপনার সামনে স্পষ্ট থাকবে, তখন অতীতের ম্লান স্মৃতিগুলো আর আপনাকে টানবে না।
শেষ কথা:
মন কোনো যন্ত্র নয় যে সুইচ টিপলেই সব মুছে যাবে। একে সময় দিন। ভালোবাসা আর বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানকে সাজিয়ে তুলুন। মনে রাখবেন, অতীত হলো একটা পাঠশালা, আর বর্তমান হলো আপনার আসল ঘর। ঘরটাকে সাজাতে মন দিলে পাঠশালার স্মৃতি কেবল অভিজ্ঞতাই হয়ে থাকবে, বাধা হয়ে নয়।
আপনার নিউজ পোর্টালের পাঠকদের জন্য এই ‘টিপস’ অংশটুকু সংবাদের শেষভাগে যুক্ত করে দিতে পারেন, যা প্রতিবেদনটিকে আরও পূর্ণতা দেবে।



