নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক: আমাদের চারপাশে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের মুখ খুললেই শোনা যায় একগুচ্ছ অভিযোগ। রোদ উঠলে গরমের সমস্যা, বৃষ্টি হলে কাদা নিয়ে বিরক্তি, আবার অফিসের কাজ থেকে শুরু করে বাড়ির পরিস্থিতি— কোনো কিছুতেই যেন তারা সন্তুষ্ট নন। এই ধরণের মানুষদের বলা হয় ‘ক্রনিক কমপ্লেনার’ বা চিরকাল অভিযোগকারী। এদের নেতিবাচক কথা কেবল যে বিরক্তির সৃষ্টি করে তাই নয়, দীর্ঘক্ষণ এদের সান্নিধ্যে থাকলে আপনার নিজের মানসিক শান্তি ও কর্মক্ষমতাও নষ্ট হতে পারে।
আজকের দ্রুতগতির জীবনে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কীভাবে এই ধরণের নেতিবাচক মানুষদের সামলাবেন এবং নিজের শান্তি বজায় রাখবেন? জেনে নিন বিশেষজ্ঞ ও মনোবিদদের দেওয়া কিছু কার্যকরী পরামর্শ।
অভিযোগ ও সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বুঝুন
প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে যে ব্যক্তিটি অভিযোগ করছেন, তিনি কি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছেন নাকি এটি তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যারা সত্যিই সমস্যায় পড়েন, তারা সমাধানের পথ খোঁজেন। কিন্তু নেতিবাচক মানুষরা কেবল সমস্যার জাল বুনতে পছন্দ করেন। তারা সমাধানের কথা বললে বিরক্ত হন। এটি বুঝতে পারলে আপনি মানসিকভাবে তাদের কথা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবেন।
সহমর্মিতা দেখান, কিন্তু একমত হবেন না
কেউ যখন অভিযোগ করেন, তখন সরাসরি তাকে ‘থামুন’ বলা কঠিন। এক্ষেত্রে কিছুটা সহমর্মিতা দেখানো যেতে পারে। যেমন— “আমি বুঝতে পারছি আপনার খারাপ লাগছে।” তবে তার নেতিবাচক যুক্তির সঙ্গে একমত হবেন না। আপনি যদি তার সঙ্গে সুর মিলিয়ে অভিযোগ শুরু করেন, তবে সেই নেতিবাচকতা আপনাকেও গ্রাস করবে। মনে রাখবেন, তাকে সান্ত্বনা দেওয়া আপনার দায়িত্ব হতে পারে, কিন্তু তার মানসিক বোঝা বয়ে বেড়ানো আপনার কাজ নয়।
আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিন (The Pivot Technique)
এটি অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। যখনই কেউ ক্রমাগত অভিযোগ শুরু করবেন, কৌশলে আলোচনার বিষয়বস্তু বদলে দিন। ধরুন কেউ অফিসের বসকে নিয়ে গালিগালাজ করছেন, আপনি তখন বলতে পারেন— “আচ্ছা, এই অফিসের ক্যান্টিনের কফিটা কিন্তু আজ বেশ ভালো ছিল, তাই না?” বা “ছুটিতে কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করছেন?” এভাবে আলোচনার গতিপথ বদলে দিলে সেই ব্যক্তিটি বুঝতে পারবেন আপনি তার নেতিবাচকতায় আগ্রহী নন।
আরও পড়ুন- ডিজিটাল যুগে দাম্পত্যের সংকট: শেষ মুহূর্তে কেন ভেস্তে যাচ্ছে বিয়ের স্বপ্ন ?
সীমানা নির্ধারণ করুন (Set Boundaries)
আপনার সময় এবং মানসিক শান্তি অত্যন্ত মূল্যবান। যদি দেখেন নির্দিষ্ট কোনো মানুষ আপনার এনার্জি শুষে নিচ্ছেন, তবে তার সঙ্গে কাটানো সময়ের একটি সীমা বেঁধে দিন। প্রয়োজনে সরাসরি অথচ বিনম্রভাবে বলুন— “আমি এখন একটু ব্যস্ত আছি, এই বিষয়ে পরে কথা বললে ভালো হয়?” অথবা “আমি বর্তমানে একটু পজিটিভ থাকতে চাইছি, তাই এই ধরণের আলোচনা এড়ালে খুশি হবো।” নিজের জন্য ‘না’ বলতে শেখাটা খুব জরুরি।
সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করুন
যখন কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে আপনার কাছে আসেন, তাকে সরাসরি প্রশ্ন করুন— “তাহলে এই সমস্যা মেটানোর জন্য আপনি কী ভাবছেন?” বা “আমি কীভাবে আপনাকে সমাধানে সাহায্য করতে পারি?” নেতিবাচক মানুষরা সাধারণত সমাধান চান না, তারা কেবল বলতে চান। আপনি যখনই সমাধানের ওপর জোর দেবেন, তারা আলোচনা দীর্ঘ করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।
নিজের ‘পিস জোন’ তৈরি করুন
নেতিবাচক মানুষের কথা শুনে আপনার মন খারাপ হলে তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে সরে আসুন। একটু গান শুনুন, কয়েক মিনিট পায়চারি করুন বা পছন্দের কোনো বই পড়ুন। নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য মানসিক দেয়াল তৈরি করুন, যাতে বাইরের কারোর খারাপ কথা আপনার ভেতরটা বিষিয়ে দিতে না পারে। মনে রাখবেন, আপনি অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, কিন্তু নিজের প্রতিক্রিয়া অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
দূরত্ব বজায় রাখা (Detachment)
যদি দেখেন কোনোভাবেই সেই মানুষকে ইতিবাচক করা যাচ্ছে না, তবে সবথেকে ভালো উপায় হলো দূরত্ব বজায় রাখা। এটি রূঢ়তা নয়, বরং আত্মরক্ষা। মানসিক স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। যে মানুষটি কেবল আপনার জীবনে বিষণ্ণতা বয়ে আনছে, তার থেকে কিছুটা দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
পেশাদার পরামর্শ ও সচেতনতা
কখনও কখনও আমাদের খুব কাছের মানুষ বা প্রিয়জনও নেতিবাচক হয়ে উঠতে পারেন। সেক্ষেত্রে তারা কোনো ডিপ্রেশন বা এনজাইটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন কিনা তা দেখা দরকার। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেলে মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। তবে আপনার প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের শান্তি বজায় রাখা।
সব শেষে: জীবন সবসময় সুন্দর বা সহজ হবে না, কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই ঠিক করে দেয় আমরা কতটা শান্তিতে থাকবো। নেতিবাচক মানুষরা পৃথিবীর সব জায়গাতেই থাকবেন। তাই তাদের বদলানোর চেষ্টা না করে নিজেকে শক্তিশালী করে তোলা এবং নিজের চারপাশে পজিটিভ ভাইবস ধরে রাখাই হলো আসল সার্থকতা। আজ থেকেই এই টিপসগুলো মেনে চলুন এবং নিজের অমূল্য শান্তিকে রক্ষা করুন।



