অবসরেও থামেননি স্বপ্না দিদিমণি! ১১ বছর ধরে বিনা বেতনে স্কুলে গিয়ে অঙ্ক শেখাচ্ছেন মালদার এই শিক্ষিকা
নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক: সকাল ঠিক দশটা। ঘড়ির কাঁটা সেই সময় ছুঁলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তিনি। হাতে ব্যাগ, মনে অদম্য টান—গন্তব্য স্কুল। অবসরের পর কেটে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। তবু তাঁর দিনযাপন বদলায়নি। কারণ, তিনি শুধু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা নন—তিনি এক নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক।
মালদার ইংরেজবাজার ব্লকের কমলাবাড়ি হাইস্কুলের অঙ্কের শিক্ষিকা স্বপ্না ঘোষ রায় ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি নিয়মে অবসর নেন। কিন্তু পরের দিন থেকেই আবার হাজির হন নিজের প্রিয় স্কুলে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত—টানা ১১ বছর—তিনি বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়ে চলেছেন পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের।
স্কুলটাই যেন তাঁর নিজের সংসার
১৯৯৮ সালে যখন কমলাবাড়ি হাইস্কুলের যাত্রা শুরু, তখন থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত স্বপ্না দেবী। একেবারে শূন্য অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে স্কুলটিকে বড় হতে দেখেছেন তিনি। ছাত্রসংখ্যা বাড়ানো থেকে শুরু করে শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
শিক্ষকতার শুরুর দিকে এলাকায় পড়াশোনার আগ্রহ ছিল কম। তখন তিনি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝাতেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর গুরুত্ব। সেই প্রচেষ্টার ফল আজ স্পষ্ট—স্কুলে এখন বহু পড়ুয়া।
আরও পড়ুন-বুলবুলচণ্ডী আর.এন. রায় গ্রামীণ হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবায় সন্তুষ্ট স্বাস্থ্য অধিকর্তা
পারিশ্রমিক নয়, আনন্দই বড়
স্কুল কর্তৃপক্ষ একাধিকবার তাঁকে পারিশ্রমিক দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এমনকি ‘অতিথি শিক্ষক’ হিসেবেও কাজ করার সুযোগ আসে। কিন্তু স্বপ্না ঘোষ রায় স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি অর্থের জন্য নয়, ভালবাসা আর দায়িত্ববোধ থেকেই পড়ান।
তাঁর কথায়, “পড়ানো আমার নেশা। ক্লাসে ঢুকলেই আমি অন্য রকম শক্তি পাই। যতদিন শরীর সুস্থ থাকবে, ততদিন স্কুলে যাব। সমাজ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, আমিও সমাজকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চাই।”
প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর ছাত্র
সবচেয়ে বড় আনন্দ কী? এই প্রশ্নে একটু থেমে আবেগঘন গলায় বলেন তিনি, “অনেক পরিবার আছে, যাদের প্রথম প্রজন্ম আমার কাছে পড়েছে। এখন তাদের সন্তান বা নাতি-নাতনিরাও আমার কাছেই অঙ্ক শিখছে। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে?”
সহ শিক্ষক কনকেন্দু মোদক বলেন, “স্বপ্নাদি আমাদের সবার অনুপ্রেরণা। অবসর মানেই যে থেমে যাওয়া নয়, তা তিনি প্রমাণ করেছেন।
স্বামী পীযূষ দাসও স্ত্রীর এই সিদ্ধান্তে গর্বিত। তাঁর কথায়, পড়ানোই ওর সত্যিকারের ভালবাসা। পড়াতে পারলেই ও মানসিক শান্তি পায়।
অবসর নয়, নতুন পথচলা
যেখানে অবসরের পর অনেকেই বিশ্রামকে বেছে নেন, সেখানে স্বপ্না ঘোষ রায় বেছে নিয়েছেন দায়িত্ব। প্রতিদিন নিয়ম করে স্কুলে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের অঙ্কের জট ছাড়িয়ে দেন তিনি।
মালদার এই অঙ্কের দিদিমণি দেখিয়ে দিয়েছেন—শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, এটা এক আজীবন সাধনা। তাঁর মতো মানুষদের জন্যই সমাজে এখনও মানবিকতা, দায়বদ্ধতা আর ভালোবাসার আলো জ্বলছে।





