চ্যালেঞ্জের অন্ধকারে দিশা দেখান স্বামী বিবেকানন্দ, যুবসমাজের চিরন্তন পথপ্রদর্শক
(জাতীয় যুব দিবস বিশেষ)
শঙ্কর চক্রবর্তী , নিউজ বাজার২৪ ঃ স্বামী বিবেকানন্দ কেবল একজন সন্ন্যাসী বা চিন্তাবিদ নন—তিনি ভারতের চিরন্তন আত্মচেতনার এক উজ্জ্বল প্রতীক। পরাধীনতা, দারিদ্র্য ও আত্মবিস্মৃতির অন্ধকারে যখন ভারত হোঁচট খাচ্ছিল, তখন বিবেকানন্দই সেই কণ্ঠস্বর, যিনি জাতিকে আত্মবিশ্বাসে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর জীবন, চিন্তা ও বাণী আজও ভারতীয় সমাজের জন্য এক দীপস্তম্ভ, যা দেখায়—জাতির প্রকৃত উত্থান হয় আত্মবল, চরিত্র ও করুণার মাধ্যমে।
এই কারণেই তাঁর জন্মদিন প্রতি বছর জাতীয় যুব দিবস হিসেবে পালিত হয়। উদ্দেশ্য একটাই—যেন ভারত নিজের ভাগ্যোন্নতির মূল মন্ত্র ভুলে না যায়।
উনিশ শতকের ভারত ও আত্মজাগরণের সূচনা
উনিশ শতকের ভারত ছিল গভীর সামাজিক ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলা এক দেশ। ১৭৬৫ সালের পর ইংরেজ শাসন দৃঢ় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজের সংস্পর্শে আসে পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞান ও আধুনিক চিন্তাধারা। শাসন ও বাণিজ্যের পাশাপাশি ইংরেজরা নিয়ে আসে এক নতুন বৌদ্ধিক কাঠামো, যা ভারতকে আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেই আত্মমंथনের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয় আধুনিক ভারতের আধ্যাত্মিক নবজাগরণ।
এই নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংস এবং তাঁর যোগ্য শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। রামকৃষ্ণ মিশনের সূচনা কোনও ধর্মপ্রচারের উদ্যোগ ছিল না, বরং উপনিষদে নিহিত বেদান্ত দর্শনকে জীবনের বাস্তবতায় প্রয়োগ করার এক মহান সংকল্প।
অধ্যাত্ম ও কর্মের মিলন
বিবেকানন্দ অধ্যাত্মকে কর্ম থেকে আলাদা করেননি। তাঁর মতে, মানবসেবাই ছিল সর্বোচ্চ সাধনা। তিনি ছিলেন যোগী, কিন্তু যোগ ও সাধনাকে কখনও রহস্য বা অলৌকিকতার মোড়কে দেখেননি। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল—গুরুর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ ছাড়া যোগসাধনা পূর্ণতা পায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় জ্ঞান-পরম্পরার সেই মূল সত্যকে আবার প্রতিষ্ঠা করে, যেখানে জ্ঞান কেবল গ্রন্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শৃঙ্খলা ও অভিজ্ঞতার ফসল। তাঁর বাণীর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে শ্রীঅরবিন্দের মতো মহামানবও তাতে অনুপ্রাণিত হন। কারাবাসের নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে বিবেকানন্দের চিন্তা শ্রীঅরবিন্দের কাছে আলোর দিশা হয়ে উঠেছিল। বিবেকানন্দ দেখিয়েছিলেন—যোগ ও অধ্যাত্ম ভারতীয়দের দুর্বল করে না, বরং তাদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে।
মানবতার দর্শন
বিবেকানন্দের দৃষ্টি ছিল অসীম ও মানবিক। তাঁর কাছে ভারত কোনও জাতি বা বর্ণে বিভক্ত সমাজ নয়, বরং অবহেলিত ও নির্যাতিত মানুষের এক বৃহৎ পরিবার। তিনি নির্ভয়ে বলেছিলেন—অজ্ঞ, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ বা চণ্ডাল—সকলেই তাঁর ভাই। তাঁর প্রার্থনা ছিল, ঈশ্বর যেন তাঁকে প্রথমে একজন মানুষ করে গড়ে তোলেন। এই বক্তব্য মানবতার সেই চিরন্তন সত্যকে উন্মোচিত করে, যেখানে মানুষের পরিচয় তার জাতিতে নয়, তার মানবিকতায়।
ডেবিট কার্ড ছাড়াই Google Pay-এ UPI PIN রিসেট করবেন কীভাবে? জেনে নিন স্টেপ-বাই-স্টেপ পদ্ধতি
আজকের ভারত ও বিবেকানন্দের প্রাসঙ্গিকতা
আজকের ভারত বহু সাফল্যের পাশাপাশি গভীর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বৈষম্য ও ভয়ের পরিবেশ আমাদের সামনে স্পষ্ট। এই সময়ে বিবেকানন্দকে স্মরণ করা কেবল অতীতচর্চা নয়, বরং ভবিষ্যতের দিশা খোঁজা।
১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্ম সংসদে তাঁর বজ্রকণ্ঠী ভাষণ আজও ভারতের আত্মগৌরবের প্রতীক। তিনি কান्याकুমারীর উত্তাল সমুদ্র থেকে রাজস্থানের মরুভূমি পর্যন্ত ভারতীয় আত্মায় জীবন্ত।
‘কঠোপনিষদ’-এর অমর বাণী—
“উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত, প্রাপ্য বরান্ নিবোধত”
অর্থাৎ—উঠো, জাগো এবং শ্রেষ্ঠদের সান্নিধ্যে জ্ঞান অর্জন করো—এই আদর্শই ছিল তাঁর জীবনের মন্ত্র।
যুবসমাজের চিরন্তন পথপ্রদর্শক
বিবেকানন্দ যুবসমাজের পথপ্রদর্শক, কারণ তিনি প্রাচীন জ্ঞান ও আধুনিকতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন। ভয়, স্বার্থপরতা ও দুর্নীতির সময়ে তিনি এক বিরাট বটবৃক্ষের মতো আশ্রয় দেন। যখন চরিত্রবোধ ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন তিনি শিক্ষার কেন্দ্রে চরিত্র গঠনের কথা বলেন।
বিদেশিনী ভগিনী নিবেদিতা তাঁর অনুপ্রেরণায় ভারতের আত্মাকে চিনতে পেরেছিলেন। ধন-সম্পদ বা জাঁকজমকহীন জীবনযাপন করেও বিবেকানন্দ কোটি কোটি ভারতীয়ের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত, কারণ তাঁর প্রেম ছিল নিঃস্বার্থ ও দেশমাতৃকার প্রতি অটল।
দু’বছর আগে দিল্লি গেল প্রপোজাল, তবু অন্ধকারে ফাইল—কার গাফিলতিতে আটকে রানাঘাট–মালদা মেমু ?
বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন—শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জীবিকা নয়, বরং নির্ভীক ও চরিত্রবান মানুষ গড়ে তোলা। তাঁর কাছে সেবা ও সাধনা ছিল একই পথের দুই নাম। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনা পরস্পরের বিরোধী নয়, বরং পরিপূরক।
এক কথায়-
বিবেকানন্দ আমাদের শেখান—রাষ্ট্র কেবল ভূখণ্ড নয়, রাষ্ট্র গড়ে ওঠে চরিত্র, করুণা ও চেতনার ভিতর দিয়ে। তিনি আজও প্রতিটি ভারতীয়কে আহ্বান জানান—উঠো, জাগো এবং শ্রেষ্ঠ হও।
(এটি মূল ভাবের আধারে নতুন করে লেখা একটি প্রবন্ধ।)





