Newsbazar24 :
অপু, দূর্গা, নিশ্চিন্দিপুর, রেলগাড়ি, হরিহর, সর্বজয়া- এই কথাগুলো শুনলে মাথায় একটি নাম আপনাআপনিই চলে আসে- ‘পথের পাঁচালী’। পথের পাঁচালী পড়ে কাঁদেননি এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া কঠিন। লেখকের জাদুকরী হাতে বানানো গল্পের এমনই ধাঁচ যে, এর প্রতি পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা ঘটনাগুলো পাঠককে সেই ঘটনার একটি অংশ করে ফেলে খুব সহজেই। পথের পাঁচালীর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়। শুধু পথের পাঁচালীই নয়, এর মতন এমন আরো বহু কালজয়ী সাহিত্যের জন্ম হয়েছে তাঁর হাতে। বিভূতিভূষণের বাবা কিছুটা ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন। ফলে সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকতো। বিভূতিভূষণ খুব ছোট থাকতেই তার বাবা মারা যান। ফলে অভাব আরো প্রকট হয়ে উঠে। বিভূতিভূষণকে খুব কষ্ট করে পড়াশোনা করতে হয়েছিলো। বনগ্রামে থাকার সময় তাকে বহুদূরের রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুল করতে হতো। বালক বিভূতিভূষণ পল্লীগ্রামের রাস্তার দু’ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভীষণ রকমের আচ্ছন্ন ছিলেন। পল্লীপ্রকৃতির প্রতি এই টান তার সৃষ্ট বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে ফুটে উঠেছে।
বিভূতিভূষণের শ্রেষ্ঠ কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘পথের পাঁচালী’। এটি বিভূতিভূষণের প্রথম উপন্যাস। পথের পাঁচালী তৎকালীন বিখ্যাত সাময়িকী ‘বিচিত্রা’য় মাসিক ভিত্তিতে প্রকাশিত হতো। মূলত পল্লীগ্রামের একটি পরিবারের নিত্যদিনের দুঃখ-সুখের কাহিনীই এই গল্পের মূল উপজীব্য। অপু আর দুর্গার সাহচর্য পাঠককে তার শৈশবে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য। পথের পাঁচালীর ছত্রে ছত্রে বিভূতিভূষণ মূলত তার চোখে দেখা জীবনকেই ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়তে গেলে তাই কোথাও অতিরঞ্জিত মনে হয় না। ‘দুর্গা’ চরিত্রটির ধারণা তিনি কোথা থেকে পেয়েছিলেন তার খানিকটা আভাস পাওয়া যায় বিভূতিভূষণের দিনলিপি ‘স্মৃতির রেখা’ থেকে। লাইনগুলো হুবহু তুলে ধরা হলো-
“আজ সকালে মাহেন্দ্র ঘাট থেকে স্টীমারে হরিহর ছত্রমেলা দেখতে গিয়ে কত কি দেখলাম। ভেটারীনারী হাসপাতালে জিনিসপত্র রেখে টমটমে বেরুলাম। কি ভিড়, ধূলো। সেই যে মেয়েটি ধূলায় ধূসরিত বেশ নিয়ে বসে আছে ভারি সুন্দর দেখতে। ”- ৭ নভেম্বর, ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দ
পথের পাঁচালীর জনপ্রিয়তা বাংলাভাষী ছাড়াও সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে সত্যজিৎ রায়ের অবদান অনস্বীকার্য।
পথের পাঁচালীর সিক্যুয়েল হিসেবে বিভূতিভূষণ রচনা করেন ‘অপরাজিত’। অপরাজিততে পথের পাঁচালীর নায়ক অপুর বড়বেলাকে তুলে ধরা হয়। ‘অপরাজিত’ অবলম্বনে সত্যজিৎ নির্মাণ করেছিলেন ‘অপুর সংসার‘। অনেক সাহিত্য বিশারদ ও গবেষক মনে করেন, পথের পাঁচালী ও অপরাজিত বিভূতিভূষণের নিজের জীবনেরই প্রতিবিম্ব। কেননা দুটি রচনাতেই বিভূতিভূষণের ছেলেবেলা, বাবা-মা, ব্যক্তিগত জীবন সবকিছুর বেশ গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ প্রসঙ্গে বিভূতিভূষণ নিজেই বলেছেন,
“পথের পাঁচালীর চিত্রগুলি সবই আমার স্বগ্রাম বারাকপুরের। জেলা যশোহর। গ্রামের নিচেই ইছামতী নদী।“



