Newsbazar24 :
পহেলগাঁও কাণ্ডের পরে নতুন করে বিতর্ক তৈরী হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা না সেকুলারিজম নিয়ে। এই আলোচনায় বার বার করেই এসেছে কাজী নজরুল ইসলামের প্রসঙ্গ। খুবই অসুস্থ অবস্থায় নজরুল নিজেই লিখে গেছেন, ‘আর সব কিছু ভাগ হয়ে যাবে, ভাগ হবে না কো নজরুল।’ একদম ঠিক, তিনি না হিন্দু, না মুসলিম, না খ্রিস্টান – তিনি মানবতার মূর্ত প্রতীক। একটা কথা মনে রাখতে হবে, খিলাফতের উদ্দেশ্যের সঙ্গে তিনি সহমত ছিলেন না। তরুণ তুর্কি কামাল পাশা নজরুলের কাছে একজন কাল্ট ফিগার বলা চলে। সশস্ত্র অভ্যুত্থানে খলিফাতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে কামাল পাশা তুর্কির যে নবনির্মাণ করতে শুরু করলেন, তা নজরুলকে আবিষ্ট করে রেখেছিল। একাধিক রচনায় তার প্রমাণ মেলে। কামাল পাশার তুর্কি ইসলামের গোঁড়ামি থেকে মুক্ত তুর্কির ঘোষণা করে। এইখান থেকে নজরুলের সম্প্রীতিচেতনার একটা দিক ধরা যেতে পারে।
নজরুল শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমান বা সর্বধর্মসমন্বয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাটুকু বলে থেমে যাননি। তিনি যেকোনো ধর্মেরই, এমনকি নিজধর্মেরও গোঁড়ামি, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বারংবার তোপ দেগেছেন। ধর্মনিরপেক্ষ হতে গিয়ে ধর্মের যাবতীয় কু-আচার সহিষ্ণু হয়ে যাননি।
নজরুল ৩০০র বেশি ইসলামি গান লিখেছেন। ‘ওরে ও মদিনা বলতে পারিস কোন সে পথে তোর/ খেলত ধূলা-মাটি নিয়ে মা ফাতেমা মোর।’ ইসলামের ভিতরকার ভক্তি, আবেগকে পুঁজি করে অসংখ্য গান লিখেছেন এরকম। তবে তা শুধু নিবেদনমূলক হয়েই থেমে থাকেনি। ইসলাম যে সাম্যের ইঙ্গিত দেয় নজরুল সেই সাম্যকেই তার গানে প্রকাশ করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করব ‘ঈদের চাঁদ’ গানের কথা। ‘সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা;/ মোদের হিস্সা আদায় করিতে ঈদে’। আমরা নজরুলকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যত সোচ্চারে নজরুলের শ্যামাসংগীতের কথা বলি তত ঔদাসিন্যেই ওনার ইসলামি সংগীত এড়িয়ে যাই। অথচ এই অসামান্য ধর্মবোধ, যার পরতে পরতে তিনি শ্রেণিচেতনা মিশিয়ে দিচ্ছেন, মিশিয়ে দিচ্ছেন সাম্যের ধারণা, যা ভেদাভেদের পাঁকে যে মানুষ ডুবে যাচ্ছে তাকে উদ্ধার করবে আগে— তাকে আমরা স্বীকৃতি দিচ্ছি না যথার্থভাবে। এই নিয়ে নিশ্চিত সন্দেহ নেই যে নজরুল মানবতার ধর্মকেই ঊর্দ্ধে স্থান দিচ্ছেন। তার একাধিক রচনায় এই প্রমাণ আমরা পাই। অথচ তার ইসলামি গান গ্রহণ করল মুসলমানরা, শ্যামাসংগীত গ্রহণ করল হিন্দুরা। ভাগ হয়ে গেল নজরুল? এই প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু এত সহজে এর বিচার চলে না। ‘কাটায়ে উঠেছি ধর্ম-আফিম-নেশা/ ধ্বংস করেছি ধর্মযাজকী পেশা,/ ভাঙি মন্দির, ভাঙি মসজিদ/ ভাঙিয়া গির্জা গাহি সঙ্গীত,/ এক মানবের একই রক্ত মেশা/ কে শুনিবে আর ভজনালয়ের হ্রেষা!’
নজরুলের প্রকাশ কী উদাত্ত ও সত্য! তাই অবলীলায় ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে উনি লিখতে পারছেন : ‘ইহারা ধর্মমাতাল। ইহারা সত্যের আলো পান করে নাই, শাস্ত্রের অ্যালকোহল পান করিয়াছে।’ অথচ এই উচ্চারণ আজ করলে হয়ত গঙ্গায় তুফান উঠে যেত। এ খানিক আমাদেরই দায়িত্ব হওয়া উচিৎ এই উচ্চারণের দ্যোতনা জিইয়ে রাখা। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রাম এডুকেশন (মুসলিম সংস্কৃতির চর্চা, রুদ্র-মঙ্গল) সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সভাপতির ভাষণে নজরুল বলেছেন, ‘ভারত যে আজ পরাধীন এবং আজও যে স্বাধীনতার পথে তার যাত্রা শুরু হয়নি শুধু আয়োজনেরই ঘটা হচ্ছে এবং ঘটাও ভাঙছে তার একমাত্র কারণ আমাদের হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের প্রতি হিংসা ও অশ্রদ্ধা।’ আজকে নজরুল ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক খালি নয়, আক্ষরিক অর্থেই আধুনিকও। যে সংকটের আভাস বারবার দিয়েছেন তার লেখায়, সেখান থেকে মুক্তির যে দীপ্ত পথের সন্ধান দিয়েছেন, পীড়িত মানুষের যন্ত্রণার উল্লেখ করেছেন, ধর্ম নামক প্রতিষ্ঠানটির শৃঙ্খলের কথা বলেছেন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চিরন্তন ভাষ্য নির্মাণ করেছেন,— তার প্রয়োজন কোনোভাবে ফুরিয়ে যায়নি।



