শিলিগুড়িতে গ্যাস সংকট, উনুনে ফিরছে রেস্তোরাঁ
নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক, শিলিগুড়ি: পাহাড়ের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি কি তবে পিছিয়ে যাচ্ছে কয়েক দশক? উত্তরের এই ব্যস্ততম শহরের অলিগলি এখন এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী। নীল শিখার এলপিজি সিলিন্ডার উধাও, বদলে জায়গা করে নিয়েছে কাঠকয়লার উনুন আর কাঠের চ্যালা। বাণিজ্যিক গ্যাসের তীব্র সংকটে আজ দিশেহারা শহরের ছোট-বড় ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ মালিকরা। পেটের টানে বাধ্য হয়েই তাঁরা ফিরে গিয়েছেন সেই পুরনো দিনের ‘উনুন যুগে’।
ধোঁয়া মাখা ব্যস্ততা: অভ্যেস বদলের লড়াই
সূর্যনগর এলাকার একটি রেস্তোরাঁর সামনে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। উনুন ধরাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন এক কর্মী। চোখে জল, নাকে ধোঁয়া। হাসিমুখে বললেন, “দাদা, বহু বছর আগে উনুন ধরানোর অভ্যেস চলে গিয়েছিল। এখন আবার সেই পুরনো কসরত শিখতে হচ্ছে। গ্যাস নেই, দোকান তো আর বন্ধ রাখা যায় না!”
একই ছবি রবীন্দ্রনগরেও। ফাস্ট ফুড ব্যবসায়ী রূপক দাসের গলায় ঝরে পড়ল একরাশ হতাশা। তিনি জানালেন, “সাত- সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়েও এক একটা বাণিজ্যিক সিলিন্ডার মিলছে না। জোগাড় হলেও দু-তিন দিনের বেশি চলে না। এত টাকা খরচ করে ব্যবসা টেকে না। তাই এখন কয়লা আর খড়িই আমাদের শেষ ভরসা।”
বড় রেস্তোরাঁতেও রান্নার ‘কাটছাঁট’
গ্যাসের এই সংকটের আঁচ লেগেছে মাল্লাগুড়ি বা হাকিমপাড়ার নামী রেস্তোরাঁগুলোতেও। যেখানে একসময় আধুনিক কিচেনে ঝকঝকে গ্যাস ওভেনে রান্না হতো, সেখানে এখন ব্যাকইয়ার্ডে তৈরি হয়েছে মাটির বড় বড় উনুন। মাল্লাগুড়ির এক নামী রেস্তোরাঁর ম্যানেজার তারক চন্দের কথায়, “ইন্ডাকশনে সব রান্না সময়মতো শেষ করা অসম্ভব। তাই বাধ্য হয়ে পেছনের ফাঁকা জায়গায় চারটে বড় উনুন বসিয়েছি।” অন্যদিকে, হাকিমপাড়ার জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ মালিক বান্টি দত্ত জানালেন, পরিস্থিতি এতটাই জটিল যে খাবারের মেনুতেও বড়সড় কাটছাঁট করতে হয়েছে। যেসব পদ বানাতে বেশি সময় বা গ্যাস লাগে, তালিকায় আপাতত সেগুলোর জায়গা নেই।
আরও পড়ুন-সিম কার্ডের মতো এবার ‘পোর্ট’ হবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট! আসছে ‘অ্যাকাউন্ট পোর্টেবিলিটি’র সুবিধা
কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ
শহরের রেস্তোরাঁ মালিকদের কপালে যখন দুশ্চিন্তার ভাঁজ, তখন দীর্ঘ বছর পর হাসি ফুটেছে কয়লা ও খড়ি বিক্রেতাদের মুখে। বাইপাস এলাকায় খড়ির ব্যবসা করেন দুলাল সাহা। তিনি জানালেন, শুধু দোকানদার নয়, সাধারণ বাড়ির লোকও এখন উনুনের দিকে ঝুঁকছেন। চাহিদা বাড়ায় খড়ির দামও কিলো প্রতি ১-২ টাকা বেড়ে গিয়েছে। ডাঙ্গিপাড়ার কয়লা ব্যবসায়ী অখিল ঘোষের কথাতেও একই সুর। ব্যবসার মরা গাঙে যেন হঠাৎ বান ডেকেছে।
জলপাই মোড় থেকে কয়লা কিনতে আসা সুমন হালদারের গল্পটা আরও করুণ। তিনি জানালেন, গ্যাস না পেয়ে গত ৫-৬ দিন দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সংসার চলবে কী করে? শেষমেশ উনুন আর কয়লা সম্বল করেই আবার ঝাঁপ খুলেছেন তিনি।
শেষ কথা
শিলিগুড়ির আকাশ এখন কাঠকয়লার ধোঁয়ায় ধূসর। কিন্তু এই ধোঁয়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার লড়াই। শহরবাসী আশা করছেন, দ্রুত গ্যাসের এই সংকট কাটবে এবং শিলিগুড়ি আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। তবে ততদিন পর্যন্ত নীল শিখার বদলে লাল আগুনের উনুনই হয়ে উঠেছে শিলিগুড়ির ‘কিচেন কুইন’।





