অশুভ শক্তি থেকে মুক্তির বিশ্বাস
নিউজ বাজার ২৪ ডেস্ক : জন্ম যেমন আনন্দের, মৃত্যু তেমনই এক চরম সত্য এবং গভীর শোকের। হিন্দু সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করা হয়, মানুষের শরীর নশ্বর কিন্তু আত্মা অমর। আর এই নশ্বর দেহ থেকে আত্মার বিদায়বেলায় যে তেরো দিনের অশৌচ পালন করা হয়, তার অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো ‘ক্ষৌরম কর্ম’ বা মাথা মুণ্ডন।
১. শোকের এক অনন্য প্রকাশ (The Emotional Connection)
মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হলো তার চুল। যখন আমরা আমাদের সবথেকে প্রিয় কোনো মানুষকে হারাই, তখন আমাদের মনের সমস্ত সাজগোজ বা সৌন্দর্যের ইচ্ছা বিলীন হয়ে যায়। মাথা মুণ্ডন করা হলো সেই শোকের এক নীরব বহিঃপ্রকাশ। এটি মৃত ব্যক্তির প্রতি চরম ত্যাগের প্রতীক। এককথায় বলতে গেলে, “আমার প্রিয়জন নেই, তাই আমার সৌন্দর্যেরও কোনো প্রয়োজন নেই”— এই চিরন্তন বিচ্ছেদ-বেদনা থেকেই চুলের মায়া ত্যাগ করা হয়।
২. অহংকার বিসর্জন ও বিনম্রতা
মানুষের মনে চুলের প্রতি এক ধরণের সূক্ষ্ম অহংকার থাকে। শাস্ত্র মতে, যখন কেউ পরিবারের কর্তাকে বা প্রিয়জনকে হারান, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে এই পৃথিবীর সবটাই ক্ষণস্থায়ী। মাথা মুণ্ডন করে ব্যক্তি তাঁর সমস্ত অহংকার বিসর্জন দেন এবং ঈশ্বরের চরণে নিজেকে সঁপে দেন। এটি এক ধরণের বিনম্রতা, যা শোকাতুর ব্যক্তিকে মানসিকভাবে শান্ত হতে সাহায্য করে।
৩. প্রেতাত্মার মোহ থেকে মুক্তি (Spiritual Reason)
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আত্মা তৎক্ষণাৎ তার পুরনো ঘর বা আত্মীয়দের মায়া ত্যাগ করতে পারে না। অনেক সময় সেই আত্মা জীবিত পরিজনদের চুলের মাধ্যমে আকর্ষিত হতে পারে বা নেতিবাচক শক্তির প্রভাবে পড়তে পারে। চুলকে শক্তির ধারক মনে করা হয়। তাই মস্তক মুণ্ডন করলে সেই মোহজাল ছিন্ন হয় এবং মৃত আত্মা বুঝতে পারে যে তার পার্থিব সম্পর্ক শেষ হয়েছে। এটি আত্মাকে পরলোকের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন- মানুষের আগে কলাগাছের সঙ্গে বিয়ে! মাঙ্গলিক দোষ কাটাতে কেন এই অদ্ভুত বিধান?
৪. পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের নিগুঢ় তত্ত্ব (The Scientific Touch)
ধর্মীয় কারণের পাশাপাশি এর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। মৃতদেহ সৎকার করার সময় শ্মশানে দীর্ঘক্ষণ থাকতে হয়। শবদাহের সময় শরীর থেকে বিভিন্ন ধরণের ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও গ্যাস নির্গত হয়। মানুষের চুল ও নখ খুব দ্রুত এই জীবাণুগুলো শোষণ করে নিতে পারে। সাবান দিয়ে স্নান করলেও চুলে আটকে থাকা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণু সম্পূর্ণ যায় না।
সংক্রমণ রোধ: আগেকার দিনে আজকের মতো উন্নত স্যানিটাইজার বা অ্যান্টিসেপটিক ছিল না। তাই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে পুরো চুল কেটে ফেলা এবং নখ কেটে ফেলা ছিল সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। এটি এক ধরণের ‘ফুল বডি ডিটক্স’ বা বিশুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া।
৫. নতুন জীবনের সূচনা
মাথা মুণ্ডন করার পর যখন নতুন চুল গজায়, তখন তা শোকাতুর ব্যক্তির জীবনে নতুন করে চলার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। অশৌচ কাল শেষ করে শুদ্ধ হয়ে ব্যক্তি আবার সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসেন। এটি তাকে মানসিকভাবে বার্তা দেয় যে, শোক কাটিয়ে এবার নতুন উদ্যমে দায়িত্ব পালন করতে হবে।





