কীভাবে শুরু হল সজনে ফুলের ব্যবসা ?
নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক , হিঙ্গলগঞ্জ, উত্তর ২৪ পরগনা |
সুন্দরবনের উপকূলবর্তী অঞ্চলে সজনে গাছ নতুন কিছু নয়। এতদিন সজনে ডাটা ছিল রান্নাঘরের জনপ্রিয় উপাদান। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন ডাটা নয়, সজনে ফুলই হয়ে উঠছে আয়ের নতুন ভরসা। উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদ, হিঙ্গলগঞ্জ-সহ সুন্দরবনের একাধিক এলাকায় একদল যুবক সজনে ফুল সংগ্রহ ও বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন।
বসন্ত এলেই গ্রামবাংলার উঠোনে, রাস্তার ধারে কিংবা পতিত জমিতে সজনে গাছ ভরে ওঠে সাদা-হলুদ ফুলে। আগে এই ফুল ঝরে পড়ত অবহেলায়। এখন সেই ফুলই নগদ টাকার উৎস। কলকাতার পাইকারি বাজারে সজনে ফুলের চাহিদা বাড়ায় গ্রামাঞ্চলের তরুণেরা সরাসরি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
কীভাবে চলছে এই ব্যবসা?
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যুবকেরা গাছের মালিকদের কাছ থেকে প্রতি গাছ ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় মরশুমি লিজ নিচ্ছেন। নির্দিষ্ট সময় ধরে সেই গাছ থেকে নিয়মিত ফুল সংগ্রহ করা হয়। একটি পরিণত গাছ থেকে মরশুমে গড়ে ৫০–৭০ কেজি পর্যন্ত ফুল পাওয়া যায় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। কলকাতার পাইকারি বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি সজনে ফুলের দাম প্রায় ৭০–৯০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে।
হিসেব বলছে, একটি গাছ থেকেই মরশুমে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব। একাধিক গাছ লিজ নিলে সেই অঙ্ক আরও বাড়ে। কয়েকজন মিলে দল গঠন করে কাজ করলে লাভের পরিমাণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শুধু ফুল পাড়াই নয়, রয়েছে প্রক্রিয়া
এই ব্যবসা শুধুমাত্র ফুল সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গাছ থেকে খুব সতর্কভাবে ফুল পাড়তে হয়, যাতে কুঁড়ি নষ্ট না হয় এবং পরবর্তী দিনেও ফলন বজায় থাকে। এরপর ফুল পরিষ্কার করা, বাছাই করা ও প্যাকেটজাত করার কাজ চলে। ভোরবেলা ভ্যান বা ছোট গাড়িতে করে ফুল পাঠানো হয় কলকাতার পাইকারি বাজারে। সময়মতো সরবরাহ না করলে দাম কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট যত্ন ও পরিকল্পনার দাবি রাখে।
কেন বাড়ছে চাহিদা?
পুষ্টিগুণ ও ভেষজ গুণে ভরপুর সজনে ফুল এখন শহুরে বাজারেও জনপ্রিয়। বিভিন্ন পদ, বড়া, তরকারি এবং স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরিতে এই ফুলের ব্যবহার বাড়ছে। আয়ুর্বেদিক গুণাগুণের কারণে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের মধ্যেও এর কদর বৃদ্ধি পেয়েছে।
ফলে কলকাতা-সহ শহুরে বাজারে নিয়মিত সরবরাহ থাকলে বিক্রির সমস্যা হয় না বলেই জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি
সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। অনেকেই কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দেন। সেই প্রেক্ষাপটে অল্প পুঁজিতে শুরু করা যায় এমন একটি স্থানীয় উদ্যোগ যুবকদের স্বনির্ভরতার পথে এগোতে সাহায্য করছে।
গ্রামের বাড়ির পাশের অব্যবহৃত সজনে গাছ এখন আর অবহেলার নয়—তা হয়ে উঠেছে ‘সবুজ সম্পদ’। কয়েকজন যুবক জানান, “চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে বসে থাকার চেয়ে গ্রামের সম্পদকে কাজে লাগানোই ভালো। পরিশ্রম করলে আয় সম্ভব।”
ব্যবসার অভিনব মডেল: লিজ ও আয়ের হিসেব
কীভাবে কাজ করছে এই যুব সমাজ? স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ব্যবসার ধরণটি বেশ আকর্ষণীয়। যুবকেরা গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে প্রতিটি সজনে গাছ ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকায় পুরো মরশুমের জন্য ‘লিজ’ বা ইজারা নিচ্ছেন।
ফলন: একটি পরিণত গাছ থেকে পুরো মরশুমে গড়ে ৫০ থেকে ৭০ কেজি পর্যন্ত ফুল পাওয়া যায়।
বাজারদর: বর্তমানে কলকাতার পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি সজনে ফুলের দাম প্রায় ৭০ থেকে ৯০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
মুনাফা: হিসেব বলছে, খরচ বাদ দিয়ে একটি গাছ থেকেই মরশুমে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত নিট লাভ করা সম্ভব। কয়েকজন যুবক মিলে দল গঠন করে একাধিক গাছ লিজ নিলে লাভের অঙ্ক অনায়াসেই লাখে পৌঁছে যাচ্ছে।
সংগ্রহ থেকে বাজারজাতকরণ: এক কঠিন লড়াই
এই ব্যবসাটি যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। এর পেছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও নিপুণ পরিকল্পনা: ১. সতর্ক সংগ্রহ: গাছ থেকে ফুল পাড়ার সময় খুব সাবধান থাকতে হয় যাতে কুঁড়ি নষ্ট না হয়। কুঁড়ি নষ্ট হলে পরবর্তী দিনের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২. বাছাই ও প্যাকিং: সংগৃহীত ফুলগুলো পরিষ্কার করা, পোকা বা পাতা বাছাই করা এবং সুন্দর করে প্যাকেটজাত করার কাজ চলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। ৩. দ্রুত সরবরাহ: সজনে ফুল পচনশীল। তাই ভোরবেলা ভ্যান বা ছোট ম্যাটাডোর গাড়িতে করে এই ফুল সরাসরি কলকাতার বাজারে পাঠানো হয়। একটু দেরি হলেই ফুলের সতেজতা কমে যায় এবং বাজারদর পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ যদি আরও সংগঠিত রূপ পায়—যেমন সমবায় গঠন করা বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ (Cold Storage) ব্যবস্থা করা যায়, তবে আয়ের পরিমাণ আরও কয়েক গুণ বাড়বে। সরকারি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেলে সজনে ফুল রপ্তানি শিল্পে সুন্দরবন এক অনন্য নজির গড়তে পারে।
প্রাকৃতিক সম্পদকে ভালোবেসে এবং তাকে পুঁজি করে স্বনির্ভরতার এই লড়াই এখন হিঙ্গলগঞ্জের আনাচে-কানাচে অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।





