দু’বছর আগেই দিল্লি গিয়েছিল রানাঘাট–মালদা মেমু প্রস্তাব, অথচ অন্ধকারে ফাইল! জানেন না মালদা ডিভিশনের অনেক আধিকারিকরাও
শঙ্কর চক্রবর্তী ,নিউজ বাজার২৪ঃ রানাঘাট–মালদা টাউন রুটে নতুন মেমু (MEMU) ট্রেন চালুর প্রস্তাব নতুন করে সামনে আসতেই তীব্র প্রশ্নের মুখে রেল প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় দু’বছর আগেই এই প্রস্তাব রেল বোর্ডে পাঠানো হয়েছিল। মুর্শিদাবাদ ও আজিমগঞ্জ হয়ে দুটি জোড়া মেমু ট্রেন চালুর বিস্তারিত পরিকল্পনা, সম্ভাব্য সময়সূচি ও স্টেশন তালিকাও ওই প্রপোজালে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। অথচ এতদিন পরেও সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের কোনও অগ্রগতি নেই।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, মালদা ডিভিশনের একাধিক রেল আধিকারিকই দাবি করছেন, তাঁরা এই প্রস্তাবের বিষয়ে অবগত নন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—তাহলে এতদিন ফাইলটি কোথায় ছিল?
এই প্রসঙ্গে মালদা ডিভিশনের ডিভিশনাল রেল ম্যানেজার (ডিআরএম) মনিশ কুমার গুপ্তা জানান, রানাঘাট–মালদা মেমু ট্রেন সংক্রান্ত ওই প্রপোজালের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে তিনি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন বলে আশ্বাস দেন।
কী ছিল প্রস্তাবিত সময়সূচি
প্রপোজাল কপি অনুযায়ী, রানাঘাট–মালদা টাউন–রানাঘাট রুটে মোট দুটি জোড়া মেমু ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা ছিল। সম্ভাব্য সময়সূচি ছিল—
মালদা টাউন → রানাঘাট
একটি ট্রেন মালদা টাউন থেকে ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রানাঘাট পৌঁছত।
অন্য ট্রেনটি রাত ৮টা ৫০ মিনিটে মালদা টাউন ছেড়ে রাত ২টা ৫০ মিনিট নাগাদ রানাঘাট পৌঁছনোর পরিকল্পনা ছিল।
রানাঘাট → মালদা টাউন
একটি ট্রেন রানাঘাট থেকে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে মালদা টাউন পৌঁছনোর প্রস্তাব।
আর একটি ট্রেন দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে রানাঘাট ছেড়ে রাত ৮টা ৫০ মিনিটে মালদা টাউন পৌঁছনোর কথা ছিল।
এই মেমু ট্রেনগুলি কৃষ্ণনগর সিটি জংশন, বহরমপুর কোর্ট, মুর্শিদাবাদ, আজিমগঞ্জ জংশন, জঙ্গিপুর রোড, নিউ ফারাক্কা জংশন সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে দাঁড়ানোর কথা ছিল। পাশাপাশি নদিয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলার বহু ছোট স্টেশনেও যাত্রী ওঠানামার সুবিধা থাকত।
রেল মহলের একাংশের মতে, প্রস্তাব পাঠানোর পর জেলার ব্যবসায়ী সংগঠন কিংবা জনপ্রতিনিধিদের তরফে জোরালো ফলো-আপ না থাকায় রেল বোর্ডও আর বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই যাত্রী পরিষেবা কার্যত ফাইলের মধ্যেই আটকে রয়েছে।

মালদা ম্যাঙ্গো মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উজ্জ্বল সাহা বলেন, “এই প্রস্তাব যে দিল্লি পর্যন্ত গিয়েছিল, সেটা আমরা জানতাম না। এই মেমু ট্রেন চালু হলে মালদা, মুর্শিদাবাদ ও নদিয়া জেলার যাত্রীরা যেমন উপকৃত হতেন, তেমনই ব্যবসায়ীরাও লাভবান হতেন। কৃষিজ পণ্য পরিবহণ সহজ হতো, জেলার ব্যবসা বাড়ত।” তিনি আরও জানান, রেল বোর্ডের কাছে লিখিতভাবে এই প্রপোজাল বাস্তবায়নের দাবি জানাবেন। এছারাও তিনি ক্ষোভের সাথে বলেন, অবিলম্বে এই ট্রেন চালু না হলে জেলার ৫০ হাজার আম চাষি ও আম ব্যবসার সাথে যুক্ত মানুষ নিয়ে বড় মাপের আন্দোলনে নামবো ।
এদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। নিত্যযাত্রীদের প্রশ্ন, গত দু’বছরে জেলার সাংসদ ও বিধায়কেরা কী করেছেন? কেন এই গুরুত্বপূর্ণ মেমু পরিষেবা চালুর দাবিতে কোনও আন্দোলন বা চাপ সৃষ্টি করা হয়নি?
মালদা মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জয়ন্ত কুণ্ডু এই বিষয়ে বলেন, রেলের আধিকারিকদের সাথে কথা বলবেন। জেলার টি এম সি নেতা ,প্রাক্তন আই পি এস প্রসুন ব্যনারজী আক্ষেপের সাথে বলেন, মালদার বিজপি নেতাদের খালি পুরাতন ও স্পেশাল ট্রেনের জন্য নারকেল ফাটাতে দেখা যায়। মালদা যে কয়টি ট্রেন পেয়েছিলো গনিখান সাহেবের পর প্রাক্তন রেল মন্ত্রী মমতা ব্যনারজীর জন্য। বাকি যে কয়টি আছে সব এক্স টেনশন করে অন্য জেলায় চলে যাবে। গৌড় এক্সপ্রেস ট্রেন কে লোকাল ট্রেন বানিয়ে দিয়েছে। এত সময় লাগে কলকাতা যেতে ,এর থেকে অন্য ট্রেন আগে চলে যায়। মালদার নেতারা এগুলো হয়ত বোঝে না বা বুঝলেও কিছু করার ক্ষমতা রাখে না।
বিজেপির দক্ষিন মালদা জেলা সভাপতি অজয় গাঙ্গুলী জানান, বিষয়টি তিনি জানেন না, এটা রেলের বিষয়, তবেঁ খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
আরও পড়ুন-প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগেই হতাশা—মালদা পেল না একটি ট্রেনও, প্রশ্নে রেলের ভূমিকা
নদিয়া–মুর্শিদাবাদ–মালদা এই তিন জেলার মধ্যে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন। তাঁদের মতে, রানাঘাট–মালদা মেমু ট্রেন চালু হলে অফিসযাত্রী, পড়ুয়া ও ব্যবসায়ীদের যাতায়াত অনেক সহজ হতো।
সব মিলিয়ে, দু’বছর আগেই দিল্লিতে পৌঁছনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব আজও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। এখন প্রশ্ন একটাই—এই মেমু ট্রেন কি আবারও ফাইলের মধ্যেই হারিয়ে যাবে, নাকি নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হবে? সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন জেলার মানুষ।





