পিরিয়ড লিভ বিতর্ক: শরীরী যন্ত্রণা ও কর্মসংস্থানের দ্বন্দ্ব
নিউজ বাজার২৪, কল্পনা চক্রবর্তী , কলকাতা: ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড—প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম, যা প্রাণসৃষ্টির আধার। অথচ এই অতি সাধারণ জৈবিক প্রক্রিয়াটি ঘিরেই আমাদের সমাজে জমে আছে হাজার বছরের জড়তা, লজ্জা আর এক অমীমাংসিত বিতর্কের পাহাড়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট যখন পিরিয়ড লিভ বা মাসিকের ছুটির আবেদন খারিজ করে দিল, তখন নতুন করে প্রশ্ন উঠল—আমরা কি সত্যিই প্রগতির পথে হাঁটছি, নাকি অজান্তেই নারীদের জন্য কর্মক্ষেত্রের দরজাটা আরও সরু করে দিচ্ছি?
লজ্জার দেওয়াল ভাঙার লড়াই ও ‘প্যাডম্যান’ যুগ
গত কয়েক দশকে ‘লেট আস টক অ্যাবাউট পিরিয়ডস’-এর মতো প্রচারের দৌলতে আমরা কিছুটা হলেও জড়তা কাটিয়েছি। ওষুধের দোকানে কালো প্যাকেটে প্যাড লুকিয়ে নিয়ে আসা কিংবা পিরিয়ড হলে রান্নাঘরে ঢুকতে না পারার মতো কুসংস্কারগুলো শহরতলিতে অন্তত ফিকে হয়েছে। অক্ষয় কুমারের ‘প্যাডম্যান’ সিনেমার মতো উদ্যোগগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে, এটি কোনো অসুখ নয়, বরং স্বাস্থ্যের লক্ষণ। স্কুল-কলেজে এখন প্যাড ভেন্ডিং মেশিন বসছে, মেয়েরা খোলাখুলি কথা বলছে। কিন্তু আসল লড়াইটা শুরু হয় যখন এই জৈবিক সত্যটি রুটিরুজির লড়াই বা কর্মক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়।
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ: অধিকার নাকি অন্তরায়?
সর্বোচ্চ আদালত যখন পিরিয়ড লিভ সংক্রান্ত আবেদন খারিজ করে জানাল, “ছুটি বাধ্যতামূলক করলে কোম্পানিগুলো মহিলাদের চাকরি দিতে অনীহা দেখাবে”, তখন অনেকের কাছেই তা নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল। কিন্তু একটু গভীরে ভাবলে এর মধ্যে এক তিক্ত সত্য লুকিয়ে আছে। আমাদের কর্পোরেট জগত এখনও পুরোপুরি সংবেদনশীল হয়ে ওঠেনি।
যদি প্রতি মাসে তিন দিনের ছুটি বাধ্যতামূলক হয়, তবে বছরে ৩৬ দিন অতিরিক্ত ছুটি দিতে হবে। বেসরকারি মালিকপক্ষ তখন হয়তো অংক কষবে—সমান বেতন দিয়ে যদি মহিলা কর্মীর বদলে পুরুষ কর্মী নিলে ৩৬ দিন বেশি কাজ পাওয়া যায়, তবে মহিলা কেন নিয়োগ করব? মাতৃত্বকালীন ছুটি তিন মাস থেকে বাড়িয়ে ছয় মাস করার সময়ও আমরা এই একই মানসিকতা দেখেছি। অর্থাৎ, একটি অধিকার দিতে গিয়ে আমরা হয়তো পরোক্ষভাবে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগই কেড়ে নিচ্ছি।
আরও পড়ুন-জানেন কি, রবিবার কেন ছুটির দিন? এর পেছনে কী চমকপ্রদ ইতিহাস লুকিয়ে আছে
অসংগঠিত ক্ষেত্রের সেই ‘অদৃশ্য’ ১৫ কোটি মুখ
আমরা যখন এসি ঘরে বসে ল্যাপটপে পিরিয়ড লিভ নিয়ে টাইপ করি, তখন আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায় ভারতের সেই ১৫ কোটিরও বেশি নারী, যাঁরা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। খেত-খামারে রোদে পোড়া নারী, ইঁটভাটায় পাথর ভাঙা শ্রমিক, কিংবা অন্যের বাড়িতে বাসন মাজা পরিচারিকা—তাঁদের কি পিরিয়ড হয় না? তাঁদের কি শরীরে যন্ত্রণা নেই?
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সন্তান জন্ম দেওয়ার ঠিক পরের দিনই অনেক শ্রমিক নারীকে ইঁট বইতে দেখা যায়। এই নারীদের কাছে ‘ছুটি’ মানেই ‘বেতন কাটা’। এঁদের জন্য কোনো প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, কোনো বিমা নেই। পিরিয়ডের তীব্র যন্ত্রণা পেটে চেপে নিয়ে যখন একজন নারী প্রখর রোদে রাস্তা তৈরির কাজ করেন, তখন আমাদের তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’ আলোচনাগুলো বড় বেশি ফিকে মনে হয়। তাঁদের কথা কি রাষ্ট্র আদৌ ভাবছে?
শাবানা আজমির যুক্তি ও অন্দরমহলের ছবি
আরেকটি বড় অংশ হলো আমাদের গৃহিণীরা। তাঁদের কাজের কোনো সময়সীমা নেই, নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি। আগেকার দিনে পিরিয়ড চলাকালীন নারীদের আলাদা রাখা বা কাজ করতে না দেওয়ার প্রথাকে আমরা ‘অন্ধবিশ্বাস’ বলে উড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু বিখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমির একটি কথা এখানে খুব প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, ওই প্রথার একটা ইতিবাচক দিকও ছিল—হয়তো সেই অজুহাতে বাড়ির মেয়েটি অন্তত ওই তিনটে দিন একটু বিশ্রাম পেত। আজ প্রগতির যুগে সেই বিশ্রামটুকুও হারিয়ে গেছে। পিরিয়ড হোক বা তীব্র জ্বর—ঘরের কাজ থামার জো নেই।
শেষ কথা: পথ তবে কোথায়?
পিরিয়ড লিভ কেবল একটি আইনি ছুটি নয়, এটি একটি মানবিক প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যদি নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তা হিতে বিপরীত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধানের পথ লুকিয়ে আছে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে। বাধ্যতামূলক ছুটির চেয়ে বেশি জরুরি কর্মক্ষেত্রে পরিকাঠামোর উন্নয়ন—বিশ্রামের জন্য আলাদা ঘর (Rest Room), পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং সহকর্মীদের মধ্যে সংবেদনশীলতা বাড়ানো। পিরিয়ড কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি শরীরের একটি স্বাভাবিক ছন্দ। সমাজকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যেখানে একজন নারী তাঁর শারীরিক কষ্টের কথা বলতে দ্বিধা করবেন না, আবার সেই কারণে তাঁকে ‘অযোগ্য’ও ভাবা হবে না।





