নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক: পৃথিবীতে সোনা, প্লাটিনাম বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতু কীভাবে তৈরি হয়—এই প্রশ্ন বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের বিষয়। এতদিন পর্যন্ত মনে করা হত, মূলত নিউট্রন তারকার সংঘর্ষের ফলেই এই ধরনের ভারী ধাতুর সৃষ্টি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সামনে এসেছে এক নতুন তত্ত্ব। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকাশে ঘটে যাওয়া শক্তিশালী ম্যাগনেটার বিস্ফোরণ থেকেও সোনা ও প্লাটিনামের মতো ভারী ধাতুর জন্ম হতে পারে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানীর গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। তাঁদের মতে, অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রযুক্ত নিউট্রন তারকা, যাকে ম্যাগনেটার (Magnetar) বলা হয়, তার ভয়াবহ বিস্ফোরণ থেকেই মহাবিশ্বে তৈরি হতে পারে বহু মূল্যবান ভারী ধাতু।
আরও পড়ুন- মানুষের আগে কলাগাছের সঙ্গে বিয়ে! মাঙ্গলিক দোষ কাটাতে কেন এই অদ্ভুত বিধান?
কী এই ম্যাগনেটার
ম্যাগনেটার আসলে এক ধরনের নিউট্রন তারকা। কোনো বিশাল নক্ষত্র সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হলে তার অবশিষ্টাংশ থেকে নিউট্রন তারকার জন্ম হয়।
ম্যাগনেটার সেই নিউট্রন তারকারই একটি বিশেষ রূপ, যার চৌম্বক ক্ষেত্র অত্যন্ত শক্তিশালী। বিজ্ঞানীদের মতে, ম্যাগনেটারের চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর তুলনায় লক্ষ লক্ষ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এই শক্তিশালী চৌম্বক শক্তির কারণেই মাঝে মাঝে ভয়াবহ শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে, যাকে ম্যাগনেটার ফ্লেয়ার বলা হয়।
২০০৪ সালের এক বিশাল বিস্ফোরণের সূত্র
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া একটি শক্তিশালী ম্যাগনেটার বিস্ফোরণ। সেই সময় পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে একটি ম্যাগনেটার থেকে বিশাল শক্তির ফ্লেয়ার নির্গত হয়েছিল।
এই বিস্ফোরণের শক্তি এতটাই প্রবল ছিল যে তার প্রভাব পৃথিবীর স্যাটেলাইট ও মহাকাশযন্ত্রেও ধরা পড়ে। গবেষকদের মতে, সেই বিস্ফোরণের সময় বিপুল পরিমাণ নিউট্রন সমৃদ্ধ পদার্থ মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। এই পদার্থ থেকেই তৈরি হতে পারে সোনা, প্লাটিনামসহ অন্যান্য ভারী মৌল।
কীভাবে তৈরি হয় ভারী ধাতু
বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্বে ভারী মৌল তৈরির জন্য প্রয়োজন বিশেষ এক ধরনের নিউক্লিয়ার প্রক্রিয়া, যাকে র্যাপিড নিউট্রন ক্যাপচার বা r-process বলা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় কোনো মৌল দ্রুত নিউট্রন গ্রহণ করে ধীরে ধীরে আরও ভারী মৌলে পরিণত হয়। ম্যাগনেটার বিস্ফোরণের সময় বিপুল পরিমাণ নিউট্রন ও শক্তি উৎপন্ন হয়, যা এই r-process ঘটার জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে।
ফলে সেই বিস্ফোরণ থেকেই সোনা, প্লাটিনাম বা ইউরেনিয়ামের মতো ভারী মৌল তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
আরও পড়ুন- কেন এক শালিক অশুভ আর জোড়া শালিক শুভ? জানুন আসল রহস্য
মহাবিশ্বের রহস্য বোঝার নতুন দিশা
এই গবেষণা মহাবিশ্বে ভারী ধাতুর উৎপত্তি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে। আগে যেখানে নিউট্রন তারকার সংঘর্ষকেই প্রধান উৎস মনে করা হত, সেখানে এখন ম্যাগনেটার বিস্ফোরণকেও সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ধরা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত মহাকাশ পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই তত্ত্বকে আরও ভালোভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে।
মহাকাশে জন্ম, পৃথিবীতে সম্পদ
পৃথিবীতে ব্যবহৃত সোনা বা প্লাটিনামের মতো ধাতুর উৎপত্তি যে এত দূরের মহাজাগতিক ঘটনাবলির সঙ্গে জড়িত, তা ভাবলেই বিস্ময় জাগে। কোটি কোটি বছর আগে মহাকাশে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের ফলেই আজ পৃথিবীতে এই মূল্যবান ধাতুগুলির অস্তিত্ব।
এই নতুন গবেষণা মহাবিশ্বের রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সামনে আরও নতুন প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।





