নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক: অবশেষে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে (NBMCH) ২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিষেবা শুরু হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও রোগীকল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক ডায়ালিসিস চালুর দাবি উঠছিল। সেই প্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।
তবে পরিষেবা চালুর ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের অনিয়মিত উপস্থিতি নিয়ে আগেই অভিযোগ ছিল। সেই পরিস্থিতিতে ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে রোগী মহলেই।
আরও পড়ুন-মালদার খাসকোলে র*ক্তাক্ত দে*হ উদ্ধার, একা থাকা দয়া চৌধুরীর মৃত্যু ঘিরে আতঙ্ক
এতদিন সীমিত পরিষেবা, চাপে রোগীরা
নেফ্রোলজি বিভাগের অধীনে থাকা ৬ শয্যার ডায়ালিসিস ইউনিট এতদিন সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চালু থাকত। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, এই সীমিত সময়ের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ জন রোগীর ডায়ালিসিস করা সম্ভব হত।
কিন্তু বাস্তবে ডায়ালিসিসের প্রয়োজনীয় রোগীর সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা—দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার এমনকি উত্তর দিনাজপুর থেকেও বহু রোগী এখানে আসেন। পরিষেবা না পেয়ে বহু ক্ষেত্রেই তাঁদের বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমে যেতে বাধ্য হতে হয়েছে। সেখানে খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যা গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন।
রোগীকল্যাণ সমিতির বৈঠকেও একাধিকবার ২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস চালুর দাবি উঠেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন সেই দাবি বাস্তবায়িত হয়নি।
চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিয়েই মূল প্রশ্ন
নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়মিত হাসপাতালে না আসা নিয়ে আগেই অভিযোগ উঠেছিল। বিভাগীয় প্রধান ডাঃ অর্পিতা রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধেও মাসে খুব কম দিন হাসপাতালে উপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে তিনি দীর্ঘ ছুটিতে রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—পর্যাপ্ত চিকিৎসক উপস্থিতি ছাড়া কীভাবে ২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস পরিষেবা বজায় রাখা সম্ভব হবে? শুধুমাত্র মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের উপর নির্ভর করে কি সার্বক্ষণিক পরিষেবা চালানো যাবে?
কর্তৃপক্ষের দাবি
মেডিকেল সুপার ডাঃ সঞ্জয় মল্লিক জানিয়েছেন,
“২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস বিভাগ চালু রাখতে সমস্ত রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা হচ্ছে।”
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, পর্যাপ্ত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট রয়েছেন এবং পরিষেবা চালু রাখতে প্রশাসনিক স্তরে নজরদারি রাখা হবে।
স্বাস্থ্যসচিবের নির্দেশের পর উদ্যোগ
গত মাসে রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়নস্বরূপ নিগম মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনে এসে বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই ২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস চালুর দাবি জোরদার হয়। প্রসূতি বিভাগের এক চিকিৎসক বৈঠকে জানান, সীমিত সময় পরিষেবা চালু থাকায় বহু রোগী ফিরে যাচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষ পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এরপর স্বাস্থ্যসচিব কলেজের অধ্যক্ষ ও সুপারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তার পরই নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসক ও কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করে সার্বক্ষণিক পরিষেবা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এখন নজর বাস্তবায়নে
ঘোষণা অনুযায়ী শনিবার থেকে ২৪ ঘণ্টা ডায়ালিসিস পরিষেবা শুরু হচ্ছে। তবে প্রশাসনিক ঘোষণা আর বাস্তব পরিষেবার মধ্যে ব্যবধান থাকে কি না, সেটাই এখন দেখার।
ডায়ালিসিস রোগীদের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্দিষ্ট সময় অন্তর চিকিৎসা না হলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। ফলে এই পরিষেবা নিয়মিত, নিরবচ্ছিন্ন ও সুষ্ঠুভাবে চালু রাখা প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
উত্তরবঙ্গের হাজার হাজার কিডনি রোগীর জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন একটাই—ঘোষণার বাইরে গিয়ে, বাস্তবে কতটা সুফল মিলবে রোগীদের? তার উত্তর মিলবে আগামী দিনগুলোতেই।





