জ্যোতিষশাস্ত্রের নিরিখে ‘মাঙ্গলিক দোষ’ ও এর প্রভাব
নিউজ বাজার ২৪ ডেস্ক : বিয়ের সানাই বাজার ঠিক আগের মুহূর্তে যদি জ্যোতিষী বলেন পাত্র বা পাত্রী ‘মাঙ্গলিক’, তবে আনন্দের আমেজে যেন হঠাৎই ভয়ের ছায়া নেমে আসে। আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যখন মানুষ বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় সামিল, তখনও এই ‘মাঙ্গলিক দোষ’ বা ‘ভৌম দোষ’ নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। বিশেষ করে যখন বিয়ের বিধান হিসেবে ‘কলাগাছের সঙ্গে প্রতীকী বিবাহ’-এর কথা শোনা যায়, তখন অনেকের কাছেই তা বিস্ময়কর ও অদ্ভুত মনে হয়। কিন্তু কেন এই প্রথা? এর পেছনে কি শুধুই কুসংস্কার, নাকি শাস্ত্রের কোনো গভীর ব্যাখ্যা রয়েছে?
কেন কলাগাছই প্রথম জীবনসঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হয়?
১. জ্যোতিষশাস্ত্রের নিরিখে ‘মাঙ্গলিক দোষ’ কী?
প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্র অনুসারে, যখন কোনো জাতক বা জাতিকার কোষ্ঠীতে লগ্ন সাপেক্ষে প্রথম, চতুর্থ, সপ্তম, অষ্টম বা দ্বাদশ স্থানে মঙ্গল গ্রহ অবস্থান করে, তখন তাকে ‘মাঙ্গলিক দোষ’ বা ‘ভৌম দোষ’ বলা হয়। মঙ্গল গ্রহটি মূলত তেজ, সাহস, শক্তি ও ক্রোধের কারক।
জ্যোতিষীদের মতে, মঙ্গল গ্রহের এই অশুভ অবস্থান বৈবাহিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে:
কলহ ও ভুল বোঝাবুঝি: দাম্পত্য জীবনে অকারণে অশান্তি ও মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া।
স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা: সঙ্গী বা সঙ্গিনীর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব, এমনকি অকাল মৃত্যুর মতো চরম আশঙ্কার কথা উল্লেখ রয়েছে প্রাচীন গ্রন্থে।
মিলের অভাব: একজন মাঙ্গলিক ব্যক্তির সঙ্গে অ-মাঙ্গলিক ব্যক্তির বিয়ে হলে দাম্পত্য জীবনে স্থায়িত্ব কমে যায় বলে বিশ্বাস।
২. কেন বেছে নেওয়া হয় কলাগাছকে? (শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা)
‘দোষ স্থানান্তর’ বা ‘প্রতীকী তর্পণ’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অশুভ শক্তি দূর করাই এই প্রথার মূল লক্ষ্য। কলাগাছকে বেছে নেওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে:
পুনর্জন্ম ও পবিত্রতা: হিন্দু ধর্মে কলাগাছ অত্যন্ত পবিত্র। একে ভগবান বিষ্ণু এবং দেবগুরু বৃহস্পতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত মনে করা হয়। কলাগাছ নেতিবাচক শক্তি শোষণ করতে এবং শুভ শক্তির বিস্তার ঘটাতে সক্ষম বলে বিশ্বাস।
প্রথম বিয়ের বিসর্জন: জ্যোতিষীদের বিধান অনুযায়ী, মাঙ্গলিক দোষের সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে ব্যক্তির ‘প্রথম বিবাহ’-এর ওপর। একটি কলাগাছকে পাত্র বা পাত্রী হিসেবে সাজিয়ে সব নিয়ম মেনে সাতপাক ঘোরার মাধ্যমে প্রতীকীভাবে ওই দোষ গাছটির ওপর স্থানান্তর করা হয়।
বিসর্জন ও শুদ্ধিকরণ: বিয়ের আচার সম্পন্ন হওয়ার পর গাছটিকে নিয়ম মেনে কেটে ফেলা হয় বা কোনো জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো, ব্যক্তির প্রথম বিবাহটি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো এবং সেই সঙ্গে যাবতীয় অশুভ প্রভাব ওই গাছটির সঙ্গেই বিদায় নিল। এর ফলে পরবর্তী প্রকৃত বিয়েটি শাস্ত্রীয়ভাবে ‘দ্বিতীয় বিবাহ’ হিসেবে গণ্য হয়, যা মাঙ্গলিক দোষমুক্ত।
আরও পড়ুন-২০২৬ সালে কোন কোন রাশির ভাগ্যে জ্যাকপট ? রবি গ্রহের বড় প্রভাব
৩. মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ
আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদরা মনে করেন, এই রীতিগুলো মূলত মানুষের মনে থাকা গভীর ভয় ও অনিশ্চয়তা দূর করার এক প্রকার ‘কগনিটিভ থেরাপি’।
ভয় মুক্তি: বিয়ের আগে অনেকের মধ্যেই জীবনসঙ্গী হারানোর বা দাম্পত্য কলহের ভয় কাজ করে। এই রীতির মাধ্যমে তারা মানসিকভাবে আশ্বস্ত বোধ করেন যে, অশুভ শক্তির প্রভাব দূর হয়েছে।
বিশ্বাস ও মানসিক শান্তি: হাজার বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য পালন করলে মনের ওপর এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদী দাম্পত্য জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সব শেষে-
বিজ্ঞান হয়তো একে সরাসরি স্বীকার করে না, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতির গভীরে এই বিশ্বাসগুলো মিশে আছে। কলাগাছের সঙ্গে এই প্রতীকী বিয়ে কোনো নিষ্ঠুর প্রথা নয়, বরং দাম্পত্য জীবনের সুখ ও সুরক্ষার জন্য নেওয়া এক প্রাচীন ও মানসিক শান্তি প্রদানের উপায়। আজও বহু মানুষ, এমনকি শিক্ষিত সমাজেও এই রীতি মেনে চলেন, যাতে সম্পর্কের শুরুটা হয় দুশ্চিন্তামুক্ত ও আনন্দময়।
সচেতনতামূলক বার্তা — “এই নিবন্ধটি শাস্ত্রীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে লেখা। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিজ্ঞ জ্যোতিষী বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।”





