কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এর সারসংক্ষেপ
প্রকাশের তারিখ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | সময়: ১:১০ PM
সূত্র: Press Information Bureau (PIB), দিল্লি
ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে, যুবশক্তিকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে এবং দরিদ্র, শোষিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে জোর দিয়ে সংসদে পেশ হল কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭। কर्तব্য ভবনে প্রস্তুত হওয়া এই বাজেট এক নতুন প্রশাসনিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তাঁর বাজেট ভাষণে স্পষ্ট করে বলেন, এই বাজেট তিনটি মৌলিক ‘কর্তব্য’-এর ভিত্তিতে তৈরি—
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুততর করা, মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলা এবং ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর আদর্শ বাস্তবায়ন।
তিন কর্তব্যের দর্শনে বাজেট
অর্থমন্ত্রী জানান, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ভারতকে আরও সহনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। সেই লক্ষ্যেই বাজেটে উৎপাদন, পরিকাঠামো, মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিকে সমান্তরালভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, ২০১৪ সালের পর থেকে পাবলিক ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার প্রায় ছয় গুণ বেড়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে মূলধনী ব্যয় বাড়িয়ে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা করা হয়েছে, যা শিল্প, কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা নেবে।
শিল্প, MSME ও বায়োফার্মা খাতে জোর
বাজেটে ভবিষ্যতের ‘চ্যাম্পিয়ন’ শিল্প গড়ে তুলতে ১০,০০০ কোটি টাকার SME ডেভেলপমেন্ট ফান্ড গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি টেক্সটাইল খাতে শ্রমঘন উৎপাদন বাড়াতে প্রাকৃতিক ফাইবার, মানবনির্মিত ফাইবার ও নতুন প্রজন্মের ফাইবারকে একত্র করে সমন্বিত কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে।
বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘বায়োফার্মা শক্তি’ প্রকল্প। আগামী পাঁচ বছরে ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বায়োলজিক্স ও বায়োসিমিলার উৎপাদনে দেশীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। নতুন NIPER স্থাপন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল নেটওয়ার্ক এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ক্ষমতায়ন এই প্রকল্পের মূল স্তম্ভ।
পরিবহন ও অবকাঠামো: গতি ও সংযোগ
পরিবেশবান্ধব ও দ্রুত যাত্রী পরিবহনের লক্ষ্যে বাজেটে ৭টি উচ্চগতির রেল করিডর তৈরির ঘোষণা করা হয়েছে। মুম্বই-পুনে থেকে শুরু করে দিল্লি-বারাণসী এবং বারাণসী-শিলিগুড়ি পর্যন্ত এই করিডরগুলি দেশের অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলিকে নতুনভাবে যুক্ত করবে।
এছাড়া পণ্য পরিবহণে কার্বন নির্গমন কমাতে নতুন ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর, জাতীয় জলপথ সম্প্রসারণ এবং বন্দর-সংযোগ উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে।
শিক্ষা, দক্ষতা ও যুবশক্তি
বাজেটে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখে AVGC (অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, গেমিং ও কমিক্স) শিল্পে বড় বিনিয়োগের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। IIT মুম্বই-এর নেতৃত্বে ১৫,০০০ স্কুল ও ৫০০ কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েশন ল্যাব স্থাপন করা হবে।
উচ্চশিক্ষায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রতিটি জেলায় ছাত্রীনিবাস নির্মাণের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।
পর্যটন খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ২০টি পর্যটন কেন্দ্রে ১০,০০০ ট্যুর গাইডকে প্রশিক্ষণের জন্য IIM-এর সঙ্গে যৌথভাবে বিশেষ কোর্স চালুর প্রস্তাব রয়েছে।
কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা
কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ভারত বিস্তার’ নামে এক বহুভাষিক এআই টুল চালুর ঘোষণা করা হয়েছে, যা কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে।
লখপতি দিদি কর্মসূচির সাফল্যের উপর ভর করে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির জন্য কমিউনিটি-ওনড রিটেল আউটলেট গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে NIMHANS-2 স্থাপন এবং পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বিশেষ শিল্প ও পর্যটন প্রকল্প বাজেটের সামাজিক দিককে আরও জোরালো করেছে।
কর সংস্কার ও ব্যবসার সহজতা
নতুন আয়কর আইন ২০২৫ আগামী এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। সহজ ফর্ম, কম জরিমানা, দ্রুত নিষ্পত্তি—সব মিলিয়ে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও সহজ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিদেশ সফর প্যাকেজে TCS কমানো, ব্যক্তিগত আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং একাধিক ওষুধে কাস্টম ডিউটি ছাড় সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি আনবে বলে আশা।
উপসংহার
কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ কেবল একটি আর্থিক নথি নয়, বরং আগামী দুই দশকের জন্য ভারতের উন্নয়ন দর্শনের ইঙ্গিতবাহী দলিল। যুবশক্তি, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সমন্বয়ে সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি পথরেখা আঁকছে, তার বাস্তবায়নই নির্ধারণ করবে ‘উন্নত ভারত’-এর গতি ও গভীরতা।
যুবশক্তি দ্বারা পরিচালিত কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ দরিদ্র, শোষিত ও বঞ্চিত শ্রেণির কল্যাণে সরকারের প্রতিশ্রুতির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।
এটি কर्तব্য ভবনে প্রস্তুত হওয়া প্রথম বাজেট, যা তিনটি মূল কর্তব্য দ্বারা অনুপ্রাণিত।
প্রথম কর্তব্য—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দ্রুততর করা এবং তা বজায় রাখা।
দ্বিতীয় কর্তব্য—মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণ এবং তাদের সক্ষমতা গড়ে তোলা।
তৃতীয় কর্তব্য—‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়ন।
নতুন আয়কর আইন, ২০২৫ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। সহজতর আয়কর নিয়ম ও ফর্ম শীঘ্রই বিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করা হবে।
জরিমানা ও অভিযোজনকে যুক্তিসংগত করতে প্রক্রিয়ার জটিলতা কমানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কিছু প্রাথমিক সমবায় সমিতিকে দেওয়া করছাড় পশুখাদ্য ও তুলোর বীজ পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি পরিষেবাকে একক শ্রেণির আওতায় এনে ১৫.৫ শতাংশ অভিন্ন সেফ হারবার মার্জিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইটি পরিষেবার জন্য সেফ হারবার সুবিধার সীমা ৩০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
বিদেশি ক্লাউড পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাকে ২০৪৭ সাল পর্যন্ত করছাড় দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
অনুমানভিত্তিক কর প্রদানকারী সকল অনাবাসীকে ন্যূনতম বিকল্প কর (MAT) থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
মূলধনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে শহরগুলির মধ্যে সাতটি উচ্চগতির রেল করিডর ‘বিকাশ পরিবহন সংযোগ’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
ব্যাটারির লিথিয়াম-আয়ন সেল উৎপাদনে ব্যবহৃত মূলধনী যন্ত্রাংশে শুল্কছাড় অব্যাহত থাকবে।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী পণ্যের আমদানিতে শুল্কছাড় দেওয়া হবে।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে।
১৭টি ওষুধ ও ঔষধিতে মৌলিক শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।
‘বায়োফার্মা শক্তি’ প্রকল্পের অধীনে ১০,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বায়োলজিক্স ও বায়োসিমিলার উৎপাদনের জন্য দেশীয় ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হবে।
ভবিষ্যতের চ্যাম্পিয়ন MSME তৈরির লক্ষ্যে ১০,০০০ কোটি টাকার SME উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষা ও STEM প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের সুবিধার জন্য প্রতিটি জেলায় একটি করে ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করা হবে।
IIM-এর সহযোগিতায় ২০টি পর্যটন কেন্দ্রে ১০,০০০ পর্যটন গাইডকে ১২ সপ্তাহের হাইব্রিড প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
‘খেলো ইন্ডিয়া মিশন’ আগামী এক দশকে দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রকে রূপান্তরিত করবে।
‘ভারত বিস্তার’ নামে একটি বহুভাষিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক কৃষি সহায়ক ব্যবস্থা চালু করা হবে।
বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের উপর TCS হার ৫ শতাংশ ও ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে।
সীমাশুল্ক গুদাম ব্যবস্থাকে স্ব-ঘোষণা, ইলেকট্রনিক নজরদারি ও ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে।
অর্থবর্ষের শেষ নাগাদ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার কার্গো ছাড়পত্র একক ডিজিটাল উইন্ডোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।
কেন্দ্রীয় অর্থ ও কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রী শ্রীমতি নির্মলা সীতারামণ আজ সংসদে কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৬-২৭ পেশ করেন।
এনবি/এমজি/কেসি/হিন্দি ইউনিট
(রিলিজ আইডি: 2221391)





