বর্গি আক্রমণ ও জহুরা চণ্ডী মেলার ঐতিহ্য
নিউজ বাজার ২৪ ডেস্ক ঃ মালদহ শহরের অদূরে ইংরেজবাজার ব্লকের জহুরাতলায় অবস্থিত জহুরা চণ্ডী মন্দির। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার এখানে ভক্তদের ঢল নামে। তবে এই মন্দির বা মেলার বিশেষত্ব কেবল এর প্রাচীনত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষের অংশগ্রহণ একে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনশ্রুতি
জহুরা চণ্ডী মাতার মাহাত্ম্য নিয়ে এলাকায় নানা লোককথা প্রচলিত। কথিত আছে, কয়েকশ বছর আগে এই এলাকাটি গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল। বর্গি আক্রমণের সময় এলাকার মানুষ দেবীর কাছে সুরক্ষা প্রার্থনা করতেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সেন রাজবংশের আমলে এই দেবী পূজিত হতেন। দেবীর কোনো পূর্ণাবয়ব বিগ্রহ এখানে নেই; বরং একটি মুখাবয়ব বা পিণ্ডকেই দেবী চণ্ডী রূপে পূজা করা হয়।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মেলবন্ধন
এই মেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। জহুরাতলার এই মেলা প্রাঙ্গণে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসব পালন করেন।
সেবায়েত ও ভক্ত: যদিও মন্দিরটি হিন্দুদের আরাধ্য, কিন্তু মেলার মাঠের দোকানপাট থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের একটি বিশাল অংশ মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
সাংস্কৃতিক বিনিময়: মেলার মূল উপজীব্য হলো লোকসংস্কৃতি। এখানে যেমন ধামাইল গান বা হরিনাম সংকীর্তন হয়, তেমনই গ্রামীণ মুসলিম সমাজের লোকজ ঐতিহ্যও মেলার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকে। যুগ যুগ ধরে এই মেলা প্রমাণ করে আসছে যে, উৎসবের কোনো কাঁটাতার হয় না।
আরও বলুন-গরমে কেন ঝরে যায় আম? দয়ে পোকার আক্রমণ কী, কী বলছেন মালদার চাষিরা
মেলার আকর্ষণ ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বৈশাখ মাসের প্রতিটি মঙ্গল ও শনিবার এখানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। মেলার প্রধান আকর্ষণগুলো হলো:
মাটির আসবাব ও ঘর সাজানোর জিনিস: কুমোরপাড়ার কারিগরদের তৈরি বাহারি মাটির পুতুল ও তৈজসপত্র।
খাবার-দাবার: মেলার অবিচ্ছেদ্য অংশ জিলিপি, গজা এবং স্থানীয় কদমা ও মুড়ির মোয়া।
ব্যবসায়িক লেনদেন: দূর-দূরান্ত থেকে আসা ছোট ব্যবসায়ীরা এই মেলায় পসরা সাজিয়ে বসেন, যা এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক মেলা জৌলুস হারালেও জহুরা চণ্ডীর মেলা আজও তার নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর। বর্তমান সময়েও মালদহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মেলার নিরাপত্তা ও আয়োজনে বিশেষ নজর দেওয়া হয়। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষের এই যে প্রাণের মিলন, তা বর্তমান যুগে এক বড় শিক্ষা।
সব শেষে : জহুরা চণ্ডী মেলা কেবল মালদহের একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার চিরাচরিত ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর সেই সংস্কৃতির প্রতীক যেখানে উৎসব মানেই সকলের অংশগ্রহণ। এই মেলার মাটি ও মানুষ আজও সম্প্রীতির গান গেয়ে চলে।



