দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর ভারত–কানাডা সম্পর্কে বরফ গলছে, অটোয়ায় গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বৈঠক

ভারত–কানাডা সম্পর্কে ধীরে ধীরে বরফ গলছে: নিরাপত্তা সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা

নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক ঃ  দীর্ঘ টানাপোড়েন ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার পর ভারত ও কানাডা তাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আবার স্থিতিশীল করার পথে হাঁটছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশই সংযত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের বিষয়ে উভয় পক্ষই আগ্রহী। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল-এর অটোয়া সফরকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপট থেকে সংলাপের পথে

২০২৩ সালে কানাডায় এক খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ফাটল ধরে। সেই ঘটনার পর রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, কূটনৈতিক তৎপরতার স্থবিরতা এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে ভারত–কানাডা সম্পর্ক কার্যত তলানিতে ঠেকেছিল। তবে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সংলাপ সেই অচলাবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আরও পড়ুন-আজ কেমন থাকবে আবহাওয়া? কলকাতা, উত্তর বঙ্গ ও মালদার সর্বশেষ পূর্বাভাস

অটোয়া সফর ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক

৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি কানাডা সফরকালে অজিত ডোভাল দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকগুলোর মধ্যে ছিল কানাডার ডেপুটি ক্লার্ক এবং প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা উপদেষ্টা নাথালি ড্রুইন, পাশাপাশি জননিরাপত্তা মন্ত্রী গ্যারি আনন্দাসাঙ্গারীর সঙ্গে আলোচনা। আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলোকে নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা সংলাপের অংশ বলা হলেও, সফরের সময়কাল ও আলোচনার গুরুত্ব থেকে স্পষ্ট—এটি ছিল সম্পর্ককে নতুন করে স্থিতিশীল করার একটি সচেতন প্রয়াস।

বিশেষ করে এই সফর একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে খালিস্তানি সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক বা অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠী নতুন কানাডীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনও প্রকার রাজনৈতিক প্রশ্রয় পাবে না। এতে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা সহযোগিতার ভিত্তি আরও শক্ত হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

যৌথ কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী সহযোগিতা

বৈঠকের পর ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুই দেশই নিজেদের নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের অগ্রগতি স্বীকার করেছে। পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনায় সম্মত হয়েছে উভয় পক্ষ। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হবে বাস্তবসম্মত এবং ফলাফলভিত্তিক সহযোগিতা।

কানাডার পক্ষ থেকেও প্রায় একই সুর শোনা গেছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে নির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপে জোর দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত ছিল—একটি অপর দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য লিয়াজোঁ কর্মকর্তা নিয়োগ। এর ফলে তথ্য আদান-প্রদান দ্রুত হবে এবং পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

সংগঠিত অপরাধ থেকে সাইবার নিরাপত্তা

এই সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো কেবল সন্ত্রাসবাদ বা চরমপন্থা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। আলোচনায় আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ, মাদক পাচার—বিশেষ করে ফেন্টানিলের পূর্বসূরি রাসায়নিকের অবৈধ প্রবাহ—এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নীতি, সাইবার হুমকি সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, জালিয়াতি ও অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে।

উভয় দেশই স্পষ্ট করেছে যে এই সহযোগিতা নিজ নিজ দেশের আইন ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এতে অতীতের বিতর্ক ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার প্রতিফলন দেখা যায়।

বৃহত্তর কূটনৈতিক ইঙ্গিত

যদিও সরকারি বিবৃতিগুলোতে শব্দচয়ন ছিল সতর্ক ও সংযত, তবুও কূটনৈতিক মহলে এই সফরের গুরুত্ব আলাদা করে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অজিত ডোভালের অটোয়া সফর আগামী মাসগুলোতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি-র সম্ভাব্য ভারত সফরের পথ প্রশস্ত করতে পারে। যদি সেই সফর বাস্তবায়িত হয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি হবে দুই দেশের মধ্যে প্রথম প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ, যখন সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ সময় অতিক্রম করেছে।

ট্রুডো পর্বের টানাপোড়েন

এর আগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো-র শাসনকালে ভারত–কানাডা সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বক্তব্য, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং সংবেদনশীল ইস্যু সামলানোর কৌশল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালে খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডে ভারতের সম্ভাব্য যোগসূত্রের অভিযোগ সম্পর্ককে কার্যত চূড়ান্ত সংকটে ফেলে দেয়। ভারত তখন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

ধাপে ধাপে আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা

এই পটভূমিতে আবার কাঠামোগত নিরাপত্তা সংলাপ শুরু হওয়াকে অনেকেই বাস্তববাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। বড় ধরনের রাজনৈতিক পুনর্মিলনের পরিবর্তে আইন প্রয়োগ, নিরাপত্তা যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ওপর জোর দিয়ে শুরু থেকে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই কার্যকর সহযোগিতা যদি দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

উপসংহার

সব মিলিয়ে বলা যায়, অজিত ডোভালের অটোয়া সফর হয়তো ভারত–কানাডা সম্পর্কের সব জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান আনেনি, তবে এটি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে দুই দেশই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে আন্তরিক। সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের প্রেক্ষাপটে এই নিরাপত্তা সংলাপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে—বহু বছরের অস্থিরতার পর ভারত ও কানাডা ধাপে ধাপে, সতর্কতার সঙ্গে একটি আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য সম্পর্কের দিকে ফিরে যেতে চাইছে।

সপ্তাহের সেরা

ভারতে চালু হচ্ছে ই-পাসপোর্ট! কীভাবে পাবেন, আবেদন পদ্ধতি থেকে সুবিধা—জানুন এক নজরে সবকিছু

ই-পাসপোর্টে কী কী সুবিধা পাবেন সাধারণ নাগরিকরা নিউজবাজার২৪ ডিজিটাল ডেস্ক:...

টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে ২৫০ রানও আর নিরাপদ নয়! আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে বদলে যাচ্ছে ক্রিকেটের পুরনো দর্শন

টি–টোয়েন্টি ক্রিকেটে কেন এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে ব্যাটিংয়ের ধরন? নিউজ...

গাজোলে পুকুর খুঁড়তেই উঠল প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি, বালুরঘাটে রহস্যময় সিঁড়ি! দোলপূর্ণিমায় দুই জেলায় হুলুস্থুল

গাজোলে পুকুর সংস্কারে উঠে এল প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি: পূজার্চনায় মাতলেন...

Topics

ভারতে চালু হচ্ছে ই-পাসপোর্ট! কীভাবে পাবেন, আবেদন পদ্ধতি থেকে সুবিধা—জানুন এক নজরে সবকিছু

ই-পাসপোর্টে কী কী সুবিধা পাবেন সাধারণ নাগরিকরা নিউজবাজার২৪ ডিজিটাল ডেস্ক:...
spot_img

Related Articles

Popular Categories

spot_imgspot_img