Newsbazar 24: রথ যাত্রার ইতিহাস:- কথিত আছে রথযাত্রা হল বড়ো ভাই বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে করে নিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনযাত্রার স্মারক।
আবার পুরাণ অনুযায়ী কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের প্রাঙ্গণ থেকে শ্রীকৃষ্ণকে রথে করে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেই প্রথম শুরু হয়েছিল রথযাত্রা।
রথযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জগন্নাথ আর পুরীর জগ্ননাথ ধামের প্রাচীন কাহিনি।
জানা যায়, মালবরাজ ইন্দ্রদুম্ন্য ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। একদিন সন্ন্যাসীর কাছ থেকে পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের নীল পর্বতে ভগবান বিষ্ণুর পূজার কথা জানতে পারেন। এখানে ভগবান বিষ্ণু গুপ্ত ভাবে শবরদের হাতে নীলমাধব রূপে পূজিত হন। শোনেন তাঁর মাহাত্ম্যের কথাও। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য ভগবান নীলমাধবের সেই রূপ দর্শনে আকুল হয়ে উঠেন। রাজা তাঁর পুরোহিতের ভাই বিদ্যাপতিকে শবরদের রাজ্যে গিয়ে নীলমাধবের সন্ধান আনতে বলেন।
বিদ্যাপতি শবরদের রাজা বিশ্বাবসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাজা অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব দেন কন্যা ললিতাকে। এ দিকে ক্রমে ললিতার প্রেমে পড়েন বিদ্যাপতি। ললিতা অন্তঃসত্ত্বা হন। ললিতা এ কথা বিদ্যাপতিকে জানান এবং তাঁকে বিবাহ করতে বলেন। বিদ্যাপতি ললিতাকে এর বিনিময়ে নীলমাধব দর্শন ইচ্ছার কথা বলেন।
বিদ্যাপতিকে দুই চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ অবস্থায় নিয়ে যেতে চান ললিতা। বিদ্যাপতি তাতেই রাজি হয়ে যান। কিন্তু বিদ্যাপতি সঙ্গে করে সরষে নিয়ে যান। সারা রাস্তায় তা ফেলতে ফেলতে যান। ললিতা এ সবের কিছুই জানতে পারেননি। বিদ্যাপতি নীলমাধবের মন্দিরে পৌঁছোন। কিন্তু নীলমাধব বিদ্যাপতির হাতের নাগাল থেকে অন্তর্ধান হন। পরে অবশ্য ললিতার সাহায্যে নীলমাধবের দর্শন লাভও করেন তিনি। তার পর রাজাকে সব কথা জানালে নীলমাধবের দর্শনে আসেন ইন্দ্রদুম্ন্য।
ইন্দ্রদুম্ন্য নীলমাধব দর্শন করতে গেলে নীলমাধব অন্তর্ধান হয়ে যান। শোনা যায় বিশ্বাবসু লুকিয়ে রাখেন। রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য এতে খুব দুঃখ পান। অনশনে প্রাণ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় দেবর্ষি নারদ মুনি জানান, তাঁর দ্বারাই ভগবান জগন্নাথদেব দারুব্রহ্ম রূপে পূজা পাবেন। এ কথা শুনে রাজা শান্তি পান।
ভগবান বিষ্ণু রাজাকে স্বপ্ন দেন। বলেন, সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ইন্দ্রদুম্ন্যের কাছে আসছেন তিনি। পুরীর বাঙ্কিমুহান নামক স্থানে দারুব্রহ্ম রূপে তাঁকে পাওয়া যাবে।
রাজা সেই স্থানে গিয়ে দারুব্রহ্মের সন্ধান পেলেন। ভগবানের আদেশানুসারে শবর রাজ বিশ্বাবসু, বিদ্যাপতি ও রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য স্বর্ণরথ করে ওই দারুব্রহ্ম নিয়ে আসেন।
ভগবানের আদেশেই পুরীর দৈতাপতিরা রথের সময় ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা আর সুদর্শনের সেবা করার অধিকার পান। এঁরা ব্রাহ্মণ বিদ্যাপতি এবং শবরকন্যা ললিতার বংশধর। নব-কলেবরের পর পুরোনো বিগ্রহের পাতালীকরণের কাজ সমাপন করেন। একে বলে ‘কোইলি বৈকুন্ঠ’।
সেই দারুব্রহ্ম থেকে নারদ মুনির পরামর্শে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ তৈরির জন্য অনেক ছুতোর কারিগরকে ডেকে পাঠান। কিন্তু কেউই কাজ করতে সমর্থ হল না। শেষে বিশ্বকর্মা এক ছুতোরের বেশে এসে মূর্তি তৈরিতে সম্মত হলেন। মতান্তরে এই ছুতোর ছিলেন ভগবান বিষ্ণু।
এই ছুতোরের নাম অনন্ত মহারাণা। তিনি একটি শর্তে মূর্তি গড়ার প্রস্তাবে রাজি হন। বড়ো ঘর ও ২১ দিন সময়। ২১ দিন দরজা বন্ধ করে কাজ করবেন। সে সময় কেউ যেন দরজা না খোলে। তিনিই আগত অন্যান্য ছুতোরদের তিনটি রথ তৈরি করতে নির্দেশ দেন।
কিন্তু ১৪ দিনের মাথায় মহারানি দরজা খুলে দেন। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ ঘরেই অনন্ত মহারাণা অন্তর্হিত হন। অসম্পূর্ণ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি দেখে রানি জ্ঞান হারান। বিষ্ণুভক্ত রাজা ইন্দ্রদুম্ন্য ভগবানের এই রূপ দেখে দুঃখিত হলেন। রাজাকে ভগবান বিষ্ণু আবার স্বপ্ন দিলেন। বলেন, তাঁর ইচ্ছায় দেবশিল্পী মূর্তি নির্মাণ করতে এসেছিলেন। কিন্তু শর্ত ভঙ্গ হওয়াতে এই রূপ মূর্তি গঠিত হয়েছে। কিন্তু তিনি অসম্পূর্ণ বিকট মূর্তিতেই পূজা নেবেন। বলেন, রাজার ইচ্ছা হলে ঐশ্বর্য দ্বারা সোনা রূপার হাত পা নির্মিত করে সেবা করতে পারে। সেই থেকে উলটোরথের পর একাদশীর দিন তিন ঠাকুরের রাজবেশ হয় রথের ওপর।
স্বপ্নে রাজা ছদ্মবেশী অনন্ত মহারানার বংশধরেরাই যেন ভগবানের সেবায় রথ যুগ যুগ ধরে প্রস্তুত করতে পারে, সেই আশীর্বাদও চেয়েছিলেন। ভগবান নারায়ণ বলেন, পরম ভক্ত শবররাজ বিশ্বাবসুর বংশধরেরাই সেবক রূপে যুগ যুগ ধরে সেবা করবে। বিদ্যাপতির প্রথম স্ত্রীর সন্তানরা পূজারী হবে। আর বিদ্যাপতির দ্বিতীয়া স্ত্রী তথা বিশ্বাবসুর পুত্রী ললিতার সন্তানের বংশধরেরা ভোগ রান্নার দায়িত্ব নেবে।
ব্রাহ্মণ ও শূদ্র জাতির একত্র মেলবন্ধন ঘটিয়ে ছিলেন স্বয়ং ভগবান। সে জন্যই পুরীতে জাতি বিচার নেই।
ইন্দ্রদুম্ন্য স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রতিদিন মাত্র এক প্রহর মানে তিন ঘণ্টার জন্য মন্দিরের দ্বার বন্ধ থাকবে। বাকি সময় মন্দিরের দ্বার খোলা থাকবে। সারা দিন ভোজন চলবে। ভগবানের হাত কখনও শুকনো থাকবে না।
ভগবান বিষ্ণু রাজার ভক্তির পরীক্ষা নিয়েছিলেন। নিজের জন্য কিছু প্রার্থনা করতে বলেছিলেন। রাজা নির্বংশ হওয়ার বর চেয়েছিলেন। যাতে তাঁর কোনো বংশধর দেবালয়কে নিজ সম্পত্তি বলে দাবি করতে না পারে। ভগবান তাই বর দিয়ে ছিলেন। জগন্নাথ মন্দিরে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা।




