৫০টি আসনে কেন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দিভাষী ভোটাররা
শঙ্কর চক্রবর্তী ,নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক : বাংলার রাজনীতিতে প্রবাদ আছে— “বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি”। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা থেকেই লক্ষ্য করা যাছে রাজ্যে অনেকটাই বেড়ে গেছে হিন্দিভাষী ভোটারদের সংখ্যা। আর তাতেই প্রশ্ন উঠছে তাহলে কি নির্বাচনে সেই দুর্জয় ঘাঁটির চাবিকাঠি কি এবার হিন্দিভাষী ভোটারদের হাতে? সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ বলছে, রাজ্যের প্রায় ৫০টি বিধানসভা আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে চলেছেন হিন্দিভাষী মানুষ। শিল্পাঞ্চল থেকে কলকাতা—তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি, দুই পক্ষই এখন এই বড় ভোটব্যাঙ্ক নিজেদের দিকে টানতে মরিয়া।
৫০টি আসনে হিন্দিভাষী ফ্যাক্টর: কেন এত গুরুত্ব?
পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ হিন্দিভাষী। মূলত কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে এদের সংখ্যা বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে:
কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকা: উত্তর ও মধ্য কলকাতার বেশ কিছু আসন এবং হাওড়া শহরের আসনগুলিতে হিন্দিভাষী ভোটাররা হার-জিত ঠিক করবে এবার থেকে, বেড়েছে অনেক হিন্দি ভাষী নতুন ভোটার।
শিল্পাঞ্চল (Industrial Belts): আসানসোল, দুর্গাপুর, খড়গপুর, হলদিয়া এবং উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর ও ভাটপাড়া শিল্পাঞ্চলে হিন্দিভাষী ভোটারদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি এবং তাদের একটি অলিখিত কমিউনিটি আছে।
উত্তরবঙ্গ: ডুয়ার্স এবং শিলিগুড়ির মতো এলাকাতেও হিন্দিভাষী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর। এখানেও বেড়েছে প্রচুর নতুন ভোটার। যারা এবার প্রথম ভোট দিবে ।
- আরও পড়ুন-বিহারে বিজেপির নতুন চাল!নীতীশকে সাথে রেখেই কি বড় ফায়দা তুলবে পদ্ম শিবির?
তৃণমূল বনাম বিজেপি: লড়াই যেখানে সেয়ানে সেয়ানে
২০১৯-এর লোকসভা এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল, হিন্দিভাষী ভোটারদের বড় অংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল। তবে ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই ছবি কিছুটা বদলায়।
তৃণমূলের কৌশল: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হিন্দিভাষী মানুষদের আপন করে নিতে ‘হিন্দি সেল’ গঠন করেছেন। ছট পুজোয় ছুটি দেওয়া থেকে শুরু করে মন্দির সংস্কার—নানাভাবে এই ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছে জোড়াফুল শিবির। শত্রুঘ্ন সিনহা বা যূথিকা কশ্যপের মতো মুখদের সামনে রেখে তৃণমূল বোঝাতে চাইছে, তারা শুধু বাঙালিদের নয়, সবার দল।
বিজেপির পাল্টা চাল: অন্যদিকে, বিজেপি মনে করছে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ আবেগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পগুলোর সুবিধা হিন্দিভাষী ভোটারদের আবার তাদের দিকে ফিরিয়ে আনবে। বিশেষ করে রাম মন্দির ইস্যু এবং জাতীয়তাবাদের বার্তা দিয়ে এই ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
কেন এরা ‘কিং মেকার’?
পশ্চিমবঙ্গের কোনো রাজনৈতিক দলই এককভাবে সরকার গড়তে পারবে না যদি না তারা হিন্দিভাষী ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পায়। কারণ: ১. এককাট্টা ভোট: অনেক সময় হিন্দিভাষী ভোটাররা জোটবদ্ধভাবে ভোট দেন, যা সরাসরি ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ২. প্রচার মাধ্যম: হিন্দি সংবাদপত্র ও সোশ্যাল মিডিয়া এই ভোটারদের ওপর বড় প্রভাব ফেলে, যা নির্বাচনের প্রচারের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তৃণমূল ও বিজেপির লড়াই: তৃণমূল কংগ্রেস যেমন ‘হিন্দি সেল’ গঠন করে এবং ছট পুজো বা হনুমান জয়ন্তীর মতো উৎসবে সামিল হয়ে এই ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে চাইছে, বিজেপি ঠিক তেমনই ‘হিন্দি-হিন্দু’ আবেগকে কাজে লাগিয়ে এই ৫০টি আসনে থাবা বসাতে মরিয়া। গত লোকসভা নির্বাচনে এই আসনগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই তার প্রমাণ।
প্রার্থীদের ভাষা ও পরিচিতি: যে দল হিন্দিভাষী প্রার্থী দাঁড় করাবে বা হিন্দি ভাষায় সাবলীল নেতাদের দিয়ে প্রচার চালাবে, এই আসনগুলোতে তাদের জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শত্রুঘ্ন সিনহার মতো বড় নামকে আসানসোলে জেতানো তৃণমূলের সেই কৌশলেরই অংশ ছিল।
বিশ্লেষণ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একসময় বামপন্থীদের দুর্গ ছিল এই শিল্পাঞ্চলগুলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে হিন্দিভাষী ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বদলেছে। বেড়েছে নতুন প্রজন্মের ভোট, এখন তারা শুধুমাত্র শ্রমিকের অধিকার নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন এবং ধর্মীয় আবেগের নিরিখেও ভোট বিচার করেন। তাই ২০২৬-এর মেগা লড়াইয়ে এই ৫০টি আসনই হয়ে উঠতে চলেছে ‘ব্যাটলগ্রাউন্ড’।



