ইংরেজবাজার শহর যেন অদৃশ্য এক বিপর্যয়ের ওপর দাঁড়িয়ে। শহর জুড়ে ১১ হাজার ভোল্ট (১১ কেভি) বিদ্যুৎ লাইনের জাল—কোথাও মানুষের বাড়ির ছাদের উপর দিয়ে, কোথাও জানলা–বারান্দা ঘেঁষে টানানো হাইভোল্টেজ তার। উন্নয়নের মুখোশের আড়ালে প্রতিদিন ঝুলছে এক নীরব মৃত্যুফাঁদ।
সিঙ্গাতলা, মহানন্দা পল্লী, গয়েশপুর, মনস্কামনা পল্লী—একাধিক এলাকায় এই চিত্র এখন প্রকাশ্য। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্টেপ-ডাউন ট্রান্সফরমার বসানোর নির্দিষ্ট জায়গা না পেয়ে বহু ক্ষেত্রে তা দেওয়াল ঘেঁষে বসানো হয়েছে। স্থানীয়দের কণ্ঠে একটাই কথা— প্রতিদিন আতঙ্কে থাকি—কখন কী হয়!
কী এই ১১ কেভি লাইন ? ঝুঁকি কতটা ভয়ংকর?
শহরের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় সাব-স্টেশন থেকে ১১,০০০ ভোল্ট লাইনে বিদ্যুৎ আসে। পরে পাড়ায় বসানো ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার সেই ভোল্টেজ নামিয়ে আনে ৪১৫/২৩০ ভোল্টে—যা সাধারণ গৃহস্থালির ২২০–২৩0 ভোল্ট। অর্থাৎ ১১ কেভি লাইনে ভোল্টেজ গৃহস্থালির লাইনের তুলনায় প্রায় ৫০ গুণ বেশি। এটাই বিপদের মূল কারণ।
নিরাপদ দূরত্বের অভাব
উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উল্লম্ব ও অনুভূমিক দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ছাদ, জানলা, বারান্দা—সবকিছুর অত্যন্ত কাছে ১১ কেভি লাইন।
এ অবস্থায় সরাসরি স্পর্শ না হলেও ‘ফ্ল্যাশওভার’ বা আর্কিংয়ের আশঙ্কা থাকে। উচ্চ ভোল্টেজের তড়িৎক্ষেত্র আর্দ্র বাতাস ভেদ করে স্পার্ক সৃষ্টি করতে পারে। ঝড়-বৃষ্টি, ভেজা পরিবেশ—সবই ঝুঁকি বাড়ায়।
ইলেকট্রিক ফিল্ড ও ইন্ডাকশন
১১ কেভি লাইনের তড়িৎক্ষেত্র ২২০ ভোল্ট লাইনের তুলনায় বহু গুণ শক্তিশালী। ভেজা ছাদ, উন্মুক্ত লোহার রড, ভিজে প্লাস্টার—এসব পরিবাহী উপাদান থাকলে ইন্ডিউসড ভোল্টেজ তৈরি হতে পারে। অজান্তেই কেউ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতে পারেন।
ব্রডব্যান্ড ও কেবল লাইনের জট
বহু জায়গায় ১১ কেভি লাইনের ইনসুলেটর ঘেঁষে ব্রডব্যান্ড বা কেবল টিভির তার টানানো। যদি ইনসুলেশন ঘষে নষ্ট হয়ে যায় এবং হাইভোল্টেজ লাইনের সংস্পর্শে আসে, তাহলে লো-ভোল্টেজ নেটওয়ার্কে সরাসরি ১১ কেভি ঢুকে পড়তে পারে।
এক মুহূর্তে বহু বাড়ি একসঙ্গে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়বে—এ কথা বলছেন বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরাই।
ট্রান্সফরমারের অবস্থান
দেওয়াল ঘেঁষে, জনবসতির একেবারে কাছে ট্রান্সফরমার বসানো হচ্ছে। তাপ, তেল লিকেজ, শর্ট সার্কিট, এমনকি বিস্ফোরণের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সঠিক আর্থিং বা প্রটেকশন ডিভাইস না থাকলে বিপদ বহুগুণ।
জানলা ঘেঁষে ট্রান্সফরমার!
সিঙ্গাতলা ও অমেন্স কলেজ রোডে বহুতল আবাসনের গা ঘেঁষে বসানো হয়েছে ট্রান্সফরমার। অভিযোগ, জায়গার অভাবে ফ্ল্যাটবাড়ির জানলার সামনে তা বসানো হয়েছে। জানলাটি পিভিসি শিট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাসিন্দাদের প্রশ্ন— পিভিসি দিয়ে জানলা বন্ধ রাখলেই কি বিপদ বন্ধ হয়?
সুকান্ত পল্লিতে ভয়াবহ চিত্র
সুকান্ত পল্লিতে কোথাও দেওয়াল থেকে মাত্র ১ ফুট দূরত্বে ১১ কেভি লাইন। ছাদে দাঁড়ালেই গলায় লাগবে তার—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
এই ভবনগুলির নির্মাণ খুব পুরনো নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—
ছাদ ঢালাই, প্লাস্টার, রং—এসব কাজ কীভাবে হল? নিরাপত্তা বিধি মানা হয়েছিল? শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছিল?
মালঞ্ছ পল্লী থেকে নিমাইসরাই—একই চিত্র
মালঞ্ছ পল্লী, ঘোড়া পির, রবীন্দ্র ভবন চত্বর, নিমাইসরাই—একই দৃশ্য। শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অস্বস্তি।
“আমাদের বাচ্চারা ছাদে খেলতে পারে না”
মহানন্দা পল্লীর এক বাসিন্দা বলেন— ছাদ ঢালাই, প্লাস্টার—সব কাজ করতে হয়েছে ১১ কেভি তারের নিচে দাঁড়িয়ে। কাজের লোকেরা ভয় পায়। বাচ্চাদের ছাদে উঠতে দিই না।
গয়েশপুরের এক গৃহবধূর কথায়— বারান্দা থেকে হাত বাড়ালেই তার দেখা যায়। ঝড়ের রাতে বুক কাঁপে। এই আতঙ্ক কেবল বৈদ্যুতিক নয়—মানসিকও।
আন্ডারগ্রাউন্ড কেবলিংয়ের দাবি ফাইলবন্দি
এর আগে বহুবার দাবি উঠেছিল ১১ কেভি লাইন মাটির নিচ দিয়ে নেওয়ার। মাপজোকও হয়েছিল। প্রস্তাব গিয়েছিল উপরমহলে। কিন্তু অজানা কারণে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। অভিযোগ—সব ফাইলবন্দি।
দায় এড়াচ্ছে কে? পৌরসভা বনাম বিদ্যুৎ দপ্তর
এই প্রসঙ্গে ইংরেজবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলেন, জমির বৈধ কাগজপত্র, নির্মাণের পরিকাঠামো এবং অনুমোদিত নকশা খতিয়ে দেখেই বাড়ি তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়। তাঁর কথায়,
“তার কোথায় আছে, সেই দায়িত্ব পৌরসভার দেখার বিষয় নয়। বিদ্যুৎ দপ্তর কেন আপত্তি জানাচ্ছে না বা নতুন করে সংযোগ দিচ্ছে, সেটাই প্রশ্ন।”
চেয়ারম্যানের বক্তব্যে স্পষ্ট—হাইভোল্টেজ লাইনের অবস্থান বা নিরাপদ দূরত্ব রক্ষা করা বিদ্যুৎ দপ্তরের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে বলে পৌরসভার মত।
তবে এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে ভিত তৈরির সময়ই অস্থায়ীভাবে মিটার সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ নির্মাণ শুরুর পর্যায়েই বিদ্যুৎ সংযোগ মিলছে। যদি বাড়িটি ১১ কেভি লাইনের বিপজ্জনক দূরত্বে হয়, তবে সেই সময়েই কেন আপত্তি তোলা হচ্ছে না?
নাগরিক মহলের দাবি, অনুমোদন ও সংযোগ—দুই প্রক্রিয়াতেই যদি যথাযথ সমন্বয় থাকত, তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হত না। যদিও এই বিষয়ে বিদ্যুৎ দপ্তরের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— দায় কার? পৌরসভা, না বিদ্যুৎ দপ্তর? নাকি দায়িত্বহীনতার ফাঁকেই শহরের ওপর ঝুলছে ১১ কেভির অদৃশ্য বিপদ?
সমাধান কী?
✔ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ১১ কেভি লাইন ভূগর্ভস্থ করতেই হবে
✔ রুট রি-অ্যালাইনমেন্ট ও পোল শিফটিং
✔ কঠোর সেফটি অডিট
✔ কেবল ও ব্রডব্যান্ড লাইনের শৃঙ্খলা
✔ বিদ্যুৎ দপ্তর–পৌরসভা–বাসিন্দাদের যৌথ সমন্বয়
বিকল্প মডেল: সেক্টরভিত্তিক বড় ট্রান্সফরমার স্থাপন
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মত, গলিতে গলিতে ছোট ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার বসানোর পরিবর্তে শহরকে সেক্টরে ভাগ করে বড় ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার বসানো যেতে পারে।
অর্থাৎ ২০–২৫টি ছোট ট্রান্সফরমারের কাজ একটি উচ্চক্ষমতার কেন্দ্রীয় ট্রান্সফরমার দিয়েই করা সম্ভব।
শহর বাড়ছে, বহুতল উঠছে, ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়ছে—কিন্তু তারের জট আরও ঘন হচ্ছে। উন্নয়ন যদি নিরাপত্তাহীন হয়, তবে তা উন্নয়ন নয়—অপেক্ষমাণ বিপর্যয়।
ইংরেজবাজার আজ দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য বৈদ্যুতিক ফাঁদের ওপর।
প্রশ্ন একটাই— বড় দুর্ঘটনার আগে কি জাগবে প্রশাসন?





