সন্দেহ হলেই পুনঃনির্বাচন—কঠোর সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের
নিউজ বাজার ২৪ ডেস্ক, কলকাতা: বাংলায় ভোট মানেই কি সন্ত্রাস? ভোট মানেই কি বুথ দখল? এই চেনা ছবিটা এবার আমূল বদলে দিতে মরিয়া ভারতের নির্বাচন কমিশন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যা অতীতে এ রাজ্যে কখনও দেখা যায়নি। কমিশনের সাফ কথা— সন্ত্রাস তো দূরস্থান, ভোটদানে বাধা দেওয়ার সামান্যতম ‘সন্দেহ’ থাকলেও সেই বুথে পুনর্নির্বাচন বা রিপোল হবে।
‘সন্দেহ’ হলেই ভোট বাতিল: আইনের কঠোর প্রয়োগ
সাধারণত প্রিজাইডিং অফিসারের রিপোর্টের ভিত্তিতেই পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এবার নিয়ম বদলেছে। কমিশন জানিয়েছে:
প্রিজাইডিং অফিসার সুপারিশ না করলেও, রিটার্নিং অফিসার, সেক্টর অফিসার বা পর্যবেক্ষকদের রিপোর্টের ভিত্তিতে কমিশন নিজে থেকে (Suo Motu) সিদ্ধান্ত নেবে।
বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে ভোটারকে বাধা দিলে, এমনকি ভোটারের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দিলেও অভিযোগ খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট বুথে ভোট বাতিল করা হতে পারে।
এই লক্ষ্যে ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৫৮এ ধারা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
জেল ও জরিমানা: রেয়াত করা হবে না কাউকেই
বুথ জ্যাম বা বুথ দখলের মতো অপরাধ রুখতে আইনের ধারায় বড়সড় সাজার বিধান রাখা হয়েছে:
সরকারি কর্মীদের জন্য (১২৯ ধারা): যদি কোনো ভোটকর্মী বা সরকারি আধিকারিক কারচুপিতে জড়িত থাকেন, তবে তাঁর ৩ থেকে ৫ বছরের জেল এবং মোটা টাকা জরিমানা হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য (১৩৫এ ধারা): বুথ জ্যাম বা ভোটদানে বাধা দিলে ১ থেকে ৩ বছরের জেল ও জরিমানা।
রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন, “আসন্ন নির্বাচনকে হিংসামুক্ত করতে আমরা অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাংলার নির্বাচনী সংস্কৃতি বদলে দিতে আমরা বদ্ধপরিকর।
আরও পড়ুন-ভোট দিতে না পারলেই ভোটাধিকার শেষ নয়: স্পষ্ট বার্তা সুপ্রিম কোর্টের
ত্রিস্তরীয় নজরদারি: আকাশে চোখ, মাটিতে ক্যামেরা
ভোটের দিন নজরদারি ব্যবস্থায় আকাশ-পাতাল পরিবর্তন আনছে কমিশন। সিইও দপ্তরে থাকবে তিনটি ভিন্ন কন্ট্রোল রুম:
ভোটদান মনিটরিং: ৩৬টি বড় স্ক্রিনে ৪৩২টি জায়গা একসঙ্গে দেখা হবে।
নাকা চেকিং মনিটরিং: রাজ্যের প্রতিটি প্রবেশপথে নাকা পয়েন্টের ওপর নজর রাখা হবে।
মিডিয়া মনিটরিং: খবরের কাগজের বা টিভির প্রতিটি খবরের ওপর নজর থাকবে।
প্রতিটি স্ক্রিন পর্যবেক্ষণের জন্য থাকবেন দুজন করে মাইক্রো অবজারভার। এছাড়া পুরো ব্যবস্থার দায়িত্বে থাকবেন একজন প্রধান সচিব পদমর্যাদার আধিকারিক।
সংখ্যাতত্ত্বে কমিশনের ‘সুরক্ষাকবচ’
নির্বাচন কমিশন এবার যে পরিমাণ প্রযুক্তি এবং জনবল নিয়োগ করছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন:
ক্যামেরা লাগানো গাড়ি: ২,৬৪৬টি ফ্লায়িং স্কোয়াড এবং ৩,০৯৩টি কুইক রেসপন্স টিমের গাড়িতে ক্যামেরা থাকবে। কন্ট্রোল রুমের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই এরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাবে।
৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা: ক্রিটিকাল বা স্পর্শকাতর বুথগুলিতে ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরায় নজরদারি চালানো হবে।
নাকা চেকপোস্ট: ১,৭৪০টি চেকপোস্টের প্রতিটি সরাসরি কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
পর্যবেক্ষক বাহিনী: রাজ্যে ২৯৪ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ১০০ জন আয়-ব্যয় পর্যবেক্ষক এবং ৮৪ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক থাকছেন। তাঁদের সাহায্য করবেন ৯৫৬ জন আধিকারিক। এছাড়াও থাকবেন ২,৩৫২ জন মাইক্রো অবজারভার।
শেষ কথা
বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত স্পষ্ট করেছেন, “যোগ্য ভোটারের ভোটদান সুনিশ্চিত করতে যে ধরণের নিরাপত্তা পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা অতীতে এ রাজ্যে কোনোদিন হয়নি।” এখন দেখার, কমিশনের এই ‘ডিজিটাল এবং আইনি ব্যুহ’ ভেদ করে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা কতটা সফলভাবে আটকানো সম্ভব হয়। তবে কমিশনের এই কঠোর অবস্থান যে দুষ্কৃতীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
নির্বাচন সংক্রান্ত আরও আপডেটের জন্য চোখ রাখুন আমাদের পোর্টালে।





