শেষ মুহূর্তে ভেঙে যাচ্ছে বিয়ে: সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটে অনিশ্চিত সাতপাক
-নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক | ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
বিয়ে—জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কত স্বপ্ন, কত আশা আর কত পরিকল্পনা নিয়ে পথ চলা শুরু করেন দম্পতিরা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সমাজ—সব মিলিয়ে বিয়েকে ঘিরে থাকে আবেগের পাহাড়। কিন্তু বাস্তব বলছে, সব সম্পর্ক আর সাতপাকে বাঁধা পড়ছে না। জীবনের অপ্রত্যাশিত বাঁকে এসে ভেস্তে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত সেই বিয়ের স্বপ্ন।
সম্প্রতি ক্রিকেটার স্মৃতি মান্ধানা ও সঙ্গীত পরিচালক পলাশ মুচ্ছলে-র বিয়ে শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই প্রবণতা। পাত্র-পাত্রি দু’জনই সেলিব্রিটি হওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে বেশি। কিন্তু বাস্তবে এমন ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের নানা প্রান্তে দ্রুত বাড়ছে শেষ মুহূর্তে বিয়ে ভাঙার সংখ্যা।
একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরেই মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৫০টি বিয়ে শেষ মুহূর্তে বাতিল হয়ে গিয়েছে। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দিচ্ছে—সমস্যাটা গভীর, এবং এর কেন্দ্রে রয়েছে আধুনিক সম্পর্কের এক নতুন বাস্তবতা।
২০২৬ সালে কোন কোন রাশির ভাগ্যে জ্যাকপট ? রবি গ্রহের বড় প্রভাব
দাম্পত্যের পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা এখন সোশ্যাল মিডিয়া
রিপোর্ট বলছে, শেষ মুহূর্তে বিয়ে বাতিল হওয়ার প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সোশ্যাল মিডিয়া দায়ী। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর পাত্র বা পাত্রী—যে কোনও একজন অপরজনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ঘাঁটতে গিয়ে এমন কিছু পোস্ট, ছবি বা মন্তব্য দেখে ফেলছেন, যা অতীত প্রেমের সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। আর সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং তিক্ততা।
ইন্দোর ও গুজরাতে এমন একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে প্রি-ওয়েডিং শুট চলাকালীনই সোশ্যাল মিডিয়ায় পাত্রীর পুরনো পোস্ট নিয়ে বিবাদ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত বিয়েটাই বাতিল হয়ে যায়।
আরেকটি ঘটনায়, প্রায় ১ কোটি টাকা খরচ করে সংগীত অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পর হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যান কনে। পরে জানা যায়, তিনি অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন।এক সময় বিয়ে ভাঙার অন্যতম কারণ ছিল যৌতুক, পারিবারিক চাপ বা আর্থিক অসামঞ্জস্য। আজ সেই জায়গা দখল করেছে সোশ্যাল মিডিয়া।
পৌষ অমাবস্যা ২০২৫: কবে, কেন গুরুত্বপূর্ণ এই তিথি? জেনে নিন পূজার মাহাত্ম্য
কেন সহজেই ধরা পড়ছে পুরনো বা গোপন সম্পর্ক?
ডিজিটাল যুগে সম্পর্ক লুকিয়ে রাখা আগের মতো সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার কারণেই আজকাল খুব সহজেই সামনে চলে আসছে পুরনো প্রেমের সম্পর্ক, কিংবা বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার পরেও ধরে রাখা সম্পর্ক।
পুরনো পোস্ট ও ছবি সহজেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে
বহু বছর আগের ছবি বা পোস্ট মুছে না ফেললে সেগুলিই হয়ে উঠছে সন্দেহের সূত্র।লাইক, কমেন্ট ও রিঅ্যাকশনেই ধরা পড়ছে ঘনিষ্ঠতা
নিয়মিত লাইক, ব্যক্তিগত মন্তব্য বা বিশেষ ইমোজি থেকেই তৈরি হচ্ছে প্রশ্ন।মেমোরিজ ও টাইমলাইন ফিচার বিপদ ডেকে আনছে
‘On This Day’ বা মেমোরিজে হঠাৎ পুরনো প্রেমের ছবি ভেসে উঠছে।বিয়ে ঠিক হলেও পুরনো সম্পর্ক পুরোপুরি না ছেঁড়ার প্রবণতা
অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের তারিখ ঠিক হলেও আগের প্রেম বা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় থাকছে, যা পরে বড় সমস্যার কারণ হচ্ছে।প্রি-ওয়েডিং শুটের সময় গভীর স্ক্রুটিনি
বিয়ের প্রস্তুতির সময় একে অপরের ফোন ও সোশ্যাল প্রোফাইল খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে, তখনই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য।কমন বন্ধু ও ট্যাগ থেকেই সূত্র মিলছে
বন্ধুদের ট্যাগ, পুরনো চেক-ইন বা কমন কানেকশন থেকেও ধরা পড়ছে অতীত সম্পর্ক।
শুধু আবেগ নয়, বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে বিয়ের বাজার
শেষ মুহূর্তে বিয়ে বাতিল মানে শুধু মানসিক ধাক্কা নয়, আর্থিক দিক থেকেও ভয়াবহ ক্ষতি। হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমিত সুরির জানিয়েছেন, শুধুমাত্র বিয়ে বাতিলের কারণে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
আজকের দিনে বিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইভেন্ট। ওয়েডিং প্ল্যানার, ক্যাটারার, ফটোগ্রাফার, ব্যান্ড পার্টি, ফুল ও আলো সজ্জাকারী—অসংখ্য মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অগ্রিম বুকিং নিয়ে মাসের পর মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি চলে। শেষ মুহূর্তে বিয়ে বাতিল হলে সেই ক্ষতির দায় গিয়ে পড়ে সকলের উপর।
ডিজিটাল যুগে বদলে যাচ্ছে সম্পর্কের সংজ্ঞা
আগের সেই জমানা আর নেই। এখন মানুষের জীবন মোবাইল ফোনের মধ্যেই বন্দি। এক ক্লিকেই জানা যাচ্ছে কার অতীত, কার বর্তমান, কার ব্যক্তিগত মুহূর্ত। বিয়ের আগে একে অপরের অনলাইন উপস্থিতি খুঁটিয়ে দেখা এখন প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে।
কেউ আগে কোনও সম্পর্কে ছিলেন কি না, কাকে নিয়ে কী লিখেছেন—এসবই হয়ে উঠছে বিয়ের সিদ্ধান্তের মানদণ্ড। এতে একদিকে যেমন স্বচ্ছতা বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে সন্দেহ ও অবিশ্বাস।
সতর্কতার সময়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতীতের চেয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যতের গুরুত্ব বেশি হওয়া উচিত। সোশ্যাল মিডিয়ার কয়েকটি পোস্ট বা ছবির ভিত্তিতে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক।
বিয়ে শুধু দুটি মানুষের নয়, দুটি পরিবারেরও বন্ধন। তাই শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানোর আগে প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা, বিশ্বাস এবং পরিণত মানসিকতা। নচেৎ ডিজিটাল যুগের এই তাড়াহুড়ো একদিন বিয়ের মতো সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেই গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে।





