চিকেন’স নেক করিডর কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক , শিলিগুড়ি: উত্তর বঙ্গের মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয় এক ফালি সরু সুতো দিয়ে ভারত তার সাত বোনকে (সেভেন সিস্টার্স) ধরে রেখেছে। নেপাল, বাংলাদেশ আর ভুটানের মাঝে চেপে থাকা মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই করিডোরটিই হলো শিলিগুড়ির সেই বিখ্যাত ‘চিকেন’স নেক’ যা দেখতে অনেকটা মুরগীর গলার মত। এই পথটুকুর গুরুত্ব আমাদের দেশের জন্য যেমন অপরিসীম, তেমনি এর বিপদও কম নয়। যুদ্ধের পরিস্থিতি হোক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ— এই এক চিলতে পথ যদি কখনও রুদ্ধ হয়ে যায়, তবে মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে উত্তর-পূর্বাঞ্চল। ভারতের এই ‘লাইফলাইন’কে আরও সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করতে এবার এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা নিয়েছে কেন্দ্রীয় রেল মন্ত্রক। আর আকাশপথে নয়, এবার শিলিগুড়ির মাটির গভীর বুক চিরে ৩৫.৭৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক আন্ডারগ্রাউন্ড রেল টানেল তৈরির কাজ শুরু হতে চলেছে।
কেন এই ভূগর্ভস্থ রেল পথ?
উত্তর বঙ্গের অঘোষিত রাজধানী শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর দিয়ে বর্তমানে থাকা জাতীয় সড়ক এবং রেলপথের ওপর চাপের শেষ নেই। ট্রাফিক জ্যাম তো আছেই, তার সঙ্গে রয়েছে আন্তর্জাতিক সীমানার সন্নিকটে হওয়ার কৌশলগত ঝুঁকি। শত্রুদেশের ড্রোন বা স্যাটেলাইট নজরদারি থেকে ভারতের সামরিক সরঞ্জাম ও সৈন্য চলাচলের খবর গোপন রাখা বর্তমানে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। এই টানেলটি মূলত সেই ঝুঁকি এড়াতে তৈরি করা হচ্ছে। মাটির নিচে থাকার ফলে এটি হবে ‘অদৃশ্য’ এবং শত্রুপক্ষের বিমান হামলা বা নজরদারি থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত।
কেমন হবে এই টানেল?
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার। এটি ডুমডাঙ্গি থেকে বাগডোগরা হয়ে রঙ্গাপানি অঞ্চলের মধ্যে বিস্তৃত হতে পারে।
এই টানেল তৈরি হলে—
- ট্রেন চলাচল হবে আরও নিরাপদ
- খারাপ আবহাওয়ায়ও যোগাযোগ বন্ধ হবে না
- উত্তর-পূর্বে পণ্য পরিবহণ দ্রুত হবে
- জরুরি পরিস্থিতিতেও বিকল্প ব্যবস্থা থাকবে
আরও পড়ুন-বঙ্গে কালবৈশাখীর তাণ্ডব! ৭ এপ্রিল ঝড়-বৃষ্টির বড় সতর্কতা, বদলাচ্ছে আবহাওয়া
প্রকল্পের খুঁটিনাটি: আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের (NFR) কাটিহার ডিভিশনের অধীনে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। রেল সূত্রে খবর, ডুমডাঙ্গি থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত এই ভূগর্ভস্থ পথটি বিস্তৃত হবে। এর মধ্যে মূল টানেলটি থাকবে তিনমাইল হাট থেকে রাঙাপানি এবং সেখান থেকে বাগডোগরা পর্যন্ত। মোট ৩৫.৭৬ কিলোমিটার পথের মধ্যে ৩৩.৪০ কিলোমিটার পথই থাকবে মাটির তলায়।
এই রেল করিডোরটি আধুনিকতম ‘টানেল বোরিং মেশিন’ (TBM) প্রযুক্তিতে তৈরি করা হবে। যাতায়াতের সুবিধার জন্য থাকবে ‘টুইন টানেল’ অর্থাৎ পাশাপাশি দুটি সুড়ঙ্গ। এটি সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক এবং স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। শুধু তাই নয়, এর নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ভারী সামরিক ট্যাংক এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম অনায়াসেই এই সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে পারে।
কৌশলগত এবং মানবিক সংযোগ
এই প্রকল্পের মানবিক দিকটি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। বাগডোগরা বিমানবন্দর এবং বেঙ্গলডুবি সামরিক ছাউনির অত্যন্ত কাছে হওয়ার ফলে, যে কোনও জরুরি অবস্থায় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতে এই টানেল জাদুর মতো কাজ করবে। বর্তমানে এই করিডোরে সাধারণ ট্রেনের যে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, তাও অনেকটা লাঘব হবে এই নতুন রুটের ফলে। সিকিম বা অসমের মানুষের কাছে এই টানেল হবে এক নতুন আস্থার নাম।
উত্তরবঙ্গের নতুন দিগন্ত
শিলিগুড়ির জন্য এটি কেবল একটি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকল্প নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির এক নতুন চাবিকাঠি। পর্যটন থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য— দ্রুতগামী ও নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতের চেহারা বদলে দেবে। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের এই ঘোষণা শুধু যুদ্ধের প্রস্তুতি নয়, বরং শান্তির সময়েও উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করার এক বড় পদক্ষেপ।
প্রকৃতির সবুজকে অক্ষুণ্ণ রেখে মাটির গভীর দিয়ে যখন ট্রেনের চাকা ঘুরবে, তখন শিলিগুড়ির চিকেন’স নেক কেবল ভারতের দুর্বল অংশ নয়, বরং ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে পরিচিত হবে। ভারতের অখণ্ডতার এই ভূগর্ভস্থ সেতুবন্ধন আগামীর দিনে এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছে।





