নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক ঃ বর্ষার শেষে যখন মহানন্দার জল ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, তখন নদীর চর জেগে ওঠে। সেই চরই যেন কারও কাছে ‘সোনার খনি’। উত্তরবঙ্গের প্রাণরেখা মহানন্দা নদী-র বুকে ফের সক্রিয় হয়েছে বালি মাফিয়াদের চক্র। অভিযোগ, মালদহ জেলার চাঁচল-২ ব্লকের চন্দ্রপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের হোসেনপুর ও পুরাতন খানপুর এলাকায় দিনরাত চলছে অবৈধ বালি উত্তোলন।
নদীর বুকে আর্থমুভারের গর্জন, তার পরেই সারি সারি ট্র্যাক্টর। দিনের আলোতেও চলছে এই কারবার, রাত নামলে তো কথাই নেই। স্থানীয়দের কথায়, বর্ষাকাল বাদ দিলে প্রায় সারা বছরই এভাবেই নদী কেটে বালি তোলা হয়। তারপর তা পাচার হয়ে যায় বিভিন্ন জায়গায়। অথচ সরকারকে এক টাকাও রাজস্ব দেওয়া হচ্ছে না—এমনই অভিযোগ।
বৈধদের কাজ বন্ধ, দাপট অবৈধদের
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, যাঁদের সরকারি অনুমতি রয়েছে, তাঁরাই নাকি কাজ করতে পারছেন না। প্রয়োজনীয় নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও ঘাটে ঢুকতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাঁদের বক্তব্য, “আমরা রাজস্ব দিই, নিয়ম মেনে কাজ করতে চাই। কিন্তু মাফিয়াদের চাপে কাজই করতে পারছি না।” প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জানানো হলেও এখনও কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি বলে দাবি তাঁদের।
ফলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে—বেআইনিরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর আইন মেনে চলা মানুষরাই কোণঠাসা।
আরও পড়ুন- অবসরের ১১ বছর পরও রোজ স্কুলে! বিনা বেতনে অঙ্ক শেখাচ্ছেন মালদার স্বপ্না দিদিমণি
‘নদী তার পথ হারাচ্ছে’
গ্রামবাসীদের ভয় আরও গভীর। গোলাম নবী আজাদ বলেন,
“অবৈধভাবে বালি কাটার ফলে নদী তার নিজস্ব গতিপথ হারিয়ে ফেলছে। বর্ষায় ভাঙন ভয়ংকর আকার নেয়। ইতিমধ্যে বহু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট নদীতে তলিয়ে গেছে। কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, স্কুল—সবই এখন বিপদের মুখে।”
আবু কালাম আজাদও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন,
“শুধু রাতেই নয়, দিনের আলোতেও চলছে নদী খনন। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও উঁচু চর—নদীর নাব্যতা আর একরকম নেই। এই ভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা ঘটবে।”
চন্দ্রপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের গোয়ালপাড়া, বাহারাবাদ, খানপুর, হোসেনপুর, থারাইস, তেলাগাছি-সহ একাধিক গ্রামের মানুষ এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বর্ষা এলেই বুক কেঁপে ওঠে—এই বুঝি আবার একটুখানি জমি নদীগর্ভে মিলিয়ে গেল।
রাজস্ব ক্ষতি, পরিবেশের বিপদ
স্থানীয়দের মতে, শয়ে শয়ে ট্র্যাক্টরে বালি পাচার হওয়ায় সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি লাগামছাড়া খননের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এইভাবে নদীর তলদেশ খুঁড়ে ফেলা হলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ ভাঙন ও বন্যার ঝুঁকি বাড়বে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে চাঁচলের মহকুমা শাসক ঋত্বিক হাজরা বলেন,
“সরকারিভাবে যাঁরা বালি উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছেন, শুধুমাত্র তাঁরাই কাজ করতে পারবেন। অবৈধ খনন কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। বেআইনি কাজ করলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—যখন প্রকাশ্যে নদীর বুক থেকে বালি তোলা হচ্ছে, তখন নজরদারি কোথায়?
মহানন্দা শুধু একটি নদী নয়, হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার ভরসা। সেই নদীর শরীর যদি প্রতিদিন একটু একটু করে কেটে নেওয়া হয়, তার ফল একদিন ভয়াবহ হয়ে উঠতেই পারে। নদীভাঙনের আতঙ্কে থাকা মানুষের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন—কবে বন্ধ হবে এই অবৈধ দৌরাত্ম্য?





