কোথায় কেমন জমে ওঠে দোল ও হোলির আসর
নিউজ বাজার২৪ ডেস্ক ঃ ফাল্গুনের পূর্ণিমা মানেই রঙের উৎসব। বসন্তের আগমনী বার্তার সঙ্গে দেশজুড়ে শুরু হয় দোল ও হোলির প্রস্তুতি। পশ্চিমবঙ্গে এটি ‘দোলযাত্রা’ নামে পরিচিত, আবার উত্তরভারতে ‘হোলি’ নামেই বেশি প্রচলিত। তবে নাম আলাদা হলেও উৎসবের মর্ম এক—আনন্দ, সম্প্রীতি আর ভালোবাসার রঙে ভেসে ওঠা।
আবির, গুলাল, ফুল, কীর্তন, লোকনৃত্য, শোভাযাত্রা—ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দোল ও হোলি উদযাপনের ধরন একেক জায়গায় একেক রকম। কোথাও এটি কৃষ্ণভক্তির প্রকাশ, কোথাও লোকসংস্কৃতির মেলা, কোথাও আবার রাজকীয় ঐতিহ্যের ধারক। চলুন দেখে নেওয়া যাক দেশের এমন কিছু জায়গা, যেখানে দোল ও হোলি উৎসব বিশেষভাবে আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়।
বৃন্দাবন: ফুলের বৃষ্টিতে হোলির আবাহন
দোলের নাম উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে বৃন্দাবনের কথা। শ্রীকৃষ্ণের লীলাভূমি হিসেবে এই শহর হোলির সময় যেন এক আধ্যাত্মিক রঙমঞ্চে পরিণত হয়। এখানে ‘ফুলওয়ালি হোলি’ বিশেষ জনপ্রিয়। হোলির আগে একাদশীর দিন বিখ্যাত মন্দিরে ভক্তদের উপর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে উদযাপন করা হয়। রঙের বদলে ফুলের বৃষ্টি—এই দৃশ্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন। কীর্তন, আরতি, আবির—সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
বরসানা: লাঠমার হোলির অভিনব রীতি
মথুরা জেলার বরসানা লাঠমার হোলির জন্য বিশ্বজোড়া পরিচিত। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, রাধার জন্মভূমিতে কৃষ্ণ গিয়েছিলেন রঙ খেলতে, আর সেই স্মৃতিতেই নারীরা লাঠি হাতে পুরুষদের মজার ছলে আঘাত করেন। এই লাঠমার হোলি দোলের কয়েকদিন আগেই শুরু হয়। হাজার হাজার দর্শক এই অভিনব ঐতিহ্য উপভোগ করতে বরসানায় ভিড় জমান।
আরও পড়ুন-বসন্তের রঙে ভক্তির আবির: দোল পূর্ণিমার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বাঙালির প্রাণের উৎসব
মথুরা: কৃষ্ণের শহরে রঙের সমুদ্র
শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান মথুরায় হোলি মানেই এক বিরাট আয়োজন। শোভাযাত্রা, নৃত্য-সঙ্গীত, মন্দিরে বিশেষ পূজা—সব মিলিয়ে গোটা শহর উৎসবে মেতে ওঠে। কৃষ্ণ মন্দিরগুলিতে ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে। আবিরের রঙে ঢেকে যায় গলি-মহল্লা, আর ভজন-কীর্তনের সুরে মুখরিত থাকে পরিবেশ।
আগ্রা: তাজের শহরেও রঙের ঢেউ
তাজমহলের শহর আগ্রাতেও হোলির দিনে দেখা যায় উচ্ছ্বাসের চিত্র। স্থানীয় মানুষ সকাল থেকেই রঙ খেলায় মেতে ওঠেন। বিভিন্ন পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক জমায়েত ও বন্ধুবান্ধবের মিলনমেলায় উৎসব উদযাপিত হয়।
পুরুলিয়া: পলাশে মোড়া বসন্ত উৎসব
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় দোল উৎসবের রূপ কিছুটা ভিন্ন। এখানে এটি ‘বসন্ত উৎসব’ নামেও পরিচিত। পলাশে রাঙা প্রকৃতির মাঝে রঙ খেলার পাশাপাশি ছৌ নৃত্য, বাউল গান, লোকগীতি—সব মিলিয়ে লোকসংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। বসন্তের আবহ যেন প্রকৃতির রঙের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।
রাজস্থানের বেওয়ার: কোদামার হোলির ঐতিহ্য
রাজস্থানের বেওয়ার শহরে হোলি মানেই ধুমধাম। ‘কোদামার হোলি’ নামে পরিচিত এই উৎসবের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। হোলির পরের দিন ‘বাদশা মেলা’ বসে, যেখানে দেশজুড়ে মানুষ অংশ নিতে আসেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লোকসংগীত ও রঙের খেলায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শহর।
পঞ্জাব: হোল্লা মহল্লার ঐতিহাসিক উৎসব
পঞ্জাবে হোলির পরদিন পালিত হয় ‘হোল্লা মহল্লা’। এটি শিখ সম্প্রদায়ের এক ঐতিহাসিক উৎসব, যার সূচনা করেছিলেন গুরু গোবিন্দ সিং। তিনদিন ধরে চলে এই অনুষ্ঠান। শিখ যোদ্ধাদের ক্রীড়া প্রদর্শন, শোভাযাত্রা, কীর্তন ও সমবেত ভোজ এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ।
শান্তিনিকেতন: বসন্তের সাংস্কৃতিক উৎসব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে শান্তিনিকেতনে দোল উৎসব পেয়েছে এক নতুন রূপ—‘বসন্ত উৎসব’। হলুদ বা গেরুয়া পোশাকে ছাত্রছাত্রীরা গান, নৃত্য ও আবৃত্তির মাধ্যমে বসন্তকে বরণ করেন। আবির খেলার সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এই উৎসবকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি দিয়েছে। বহু বিদেশিও এই সময়ে শান্তিনিকেতনে ভিড় জমান।
উদয়পুর: রাজকীয় আড়ম্বর
রাজস্থানের উদয়পুরেও হোলি উদযাপিত হয় রাজকীয় আবহে। ঐতিহাসিকভাবে মেওয়ার রাজপরিবারের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই উৎসব আজও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। প্রাসাদ প্রাঙ্গণে বিশেষ অনুষ্ঠান ও রঙ খেলার আয়োজন থাকে।
রঙের উৎসবে মিলনের বার্তা
দেশের প্রতিটি প্রান্তে দোল ও হোলির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোথাও ফুলের বৃষ্টি, কোথাও লাঠির খেলা, কোথাও লোকসংস্কৃতির মেলা—তবে সব জায়গাতেই মূল সুর একটাই, মিলন ও আনন্দ।
রঙের এই উৎসব আজ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এটি সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। জাতি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষ একে অপরকে রঙে রাঙিয়ে শুভেচ্ছা জানান। বসন্তের আগমনে দোল ও হোলি তাই হয়ে ওঠে নতুন আশার, নতুন সূচনার উৎসব। সব মিলিয়ে, দোল বা হোলি কেবল রঙের খেলা নয়—এটি ভারতের বহুবর্ণ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল উদযাপন।





