করোনা : থাবা বুনিয়াদি ও প্রগতিশীল শিক্ষায় - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : থাবা বুনিয়াদি ও প্রগতিশীল শিক্ষায়

করোনা : থাবা বুনিয়াদি ও প্রগতিশীল শিক্ষায়

 

করোনা : থাবা বুনিয়াদি ও প্রগতিশীল শিক্ষায়

সুনীলকুমার সরকার

জীবনানন্দ তাঁর 'সুচেতনা' কবিতায় লিখেছেন---

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন / মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে ।  

জল , আলো , বাতাস থেকে শিক্ষা , সমাজ , অর্থনীতি থেকে যুদ্ধ , আগ্রাসন , দেশ দখল---সবই এই পৃথিবী থেকে পৃথিবীতেই । ভালো-মন্দ , ধংস-সৃষ্টি ! একেক জন একেক ভাবে ঋণী ! ঋণ তো পরিশোধ দিতে হয় !

এই গভীর অসুখের সময়ও দেশে দেশে রাষ্ট্রনায়কেরা সভ্যতার অগ্রগতি-বিরুদ্ধ কারসাজিতে উদ্ধত ! তুরস্ক , সে দেশের পাঠ্যসূচিতে ডারউইনের তত্ত্ব পড়াবে না , কারণ ধর্মের বই-এ এ তত্ত্ব লেখা নেই । ওদিকে আমেরিকা , চীন , ভারত যুদ্ধের জিগির তুলে মানুষ কে মাতাতে চাইছে । যুদ্ধ-লড়াই পৃথিবীর আদিমতম অসুখ , যুদ্ধ থেকে কোন ইতিবাচক ফল উঠে আসে না । রাষ্ট্রগুলির এইসব কাজে দেশের জনগণ খুশি নন। কিন্তু বলতে পারচ্ছেন না । কারণ 'ভয়' !  নাগরিককে ভয় পাওয়াও তাহলে নাগরিক চুপ থাকবে ! এদিকে স্বল্প শিক্ষিত মানুষকে মিথ্যা প্রলোভন ও ধর্মীয় ভাবাবেগে আচ্ছন্ন করে রাখো ! লক্ষ্য ---রাজনৈতিক সমর্থন আদায় । নেশাগ্রস্থ জনগণ জয়ধ্বনি দিচ্ছে ।

বিভিন্ন দেশের রাজনীতিকদের দেখে বোঝা যায় না , তাঁরা পৃথিবীর ঋণ মেটাচ্ছে বা তা পরিশোধে খুব একটা আগ্রহী । কোথাও কোথাও মানবতা বিরোধী এজেন্ডা দেশকে পিছিয়ে দিতে চাইছে । আজকের গভীর অসুখে , একদিকে মানুষ আতঙ্ক-সন্ত্রস্ত , অপরদিকে সভা-সমাবেশ-মিটিং-মিছিল বন্ধ । প্রতিবাদহীন এক খোলা মাঠ ! সরকার চটজলদি সিদ্ধান্ত নিচ্ছে ,  যেন সময়োচিত আশু সমাধান ! সহানুভূতির মোড়কে সিদ্ধান্তগুলি নিচ্ছে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি ও লক্ষ্য পূরণের লক্ষ্যে। তবে তা সাধারণ মানুষের সমষ্টি উন্নয়নে ও সর্বাঙ্গীন অগ্রগতিতে কাজে লাগবে কেন ? অগ্রগতি স্তব্ধ হয়ে সমাজ পেছন দিকে এগিয়ে যাচ্ছে না তো !  

অতিমারির কারণে আমাদের দেশে পড়ুয়াদের চাপ কমানোর জন্য সিবিএসই ৩০ শতাংশ সিলেবাস কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে । কোন অধ্যায় বা টপিকগুলি বাদ দেওয়া হয়েছে , দেখে নেওয়া যাক । নবম শ্রেণি থেকে বাদ গণতান্ত্রিক অধিকার , খাদ্য নিরাপত্তা । দশম শ্রেণি থেকে ছাঁটা হয়েছে---গণতন্ত্র ও বৈচিত্র্য , লিঙ্গ-চেতনা , গণ আন্দোলন , ধর্ম ও জাতিভেদ , গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ'এর মতো অধ্যায়গুলি। একাদশ শ্রেণী থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো , নাগরিকত্ব , ধর্মনিরপেক্ষতা , জাতীয়তাবাদ , স্থানীয় প্রশাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলি । দ্বাদশ শ্রেণির---পরিকল্পিত উন্নয়ন , যোজনা কমিশন , পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা , প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক , বিদেশ নীতি , প্রাকৃতিক সম্পদের সম্যক ব্যবহার , সামাজিক ও নয়া সামাজিক আন্দোলন প্রভৃতি বিষয়গুলি বাদ দেওয়া হয়েছে ।

ভবিষ্যতের বুনিয়াদ তৈরির  ভিত্তিভূমিই হলো স্কুলজীবন । এই সময় একতাল মাটিকে যেমন আকার দেওয়া হবে সেই পথেই আগামী জীবন এগোবে । এই ব্যাচের  ছাত্রছাত্রীরা ধর্মনিরপেক্ষতা শিখবে না ! সামাজিক আন্দোলন জানবে না ! লিঙ্গ-চেতনার মধ্যদিয়ে উদার সমানাধিকারের দর্শন শিখবে না !  আমাদের সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ বহুত্ববাদী দর্শন , গণতন্ত্রের পাঠ ছাত্রছাত্রীরা পাবে না , শিখবে না ধর্মীয় উদারতা !

যে কোন পাঠক্রমের একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপট থাকে । পাঠক্রমের বিষয়গত পরিকাঠামোকে অক্ষুন্ন রেখে প্রস্তাবিত প্রয়োজনীয় সংক্ষিপ্তকরণের কাজটি করা যেত । এই অবৈজ্ঞানিক সংক্ষিপ্তকরণ পরবর্তী ধাপের পাঠ্যসূচির সঙ্গে মেলবন্ধনে এবং ধারাবাহিককতা রক্ষায়  রীতিমতো অসুবিধার হবে ।  হোঁচট খাবে পড়ুয়ারা ! অপরদিকে , পাঠ্যসূচির মধ্যদিয়ে ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মুক্তমনা , বিজ্ঞান মননশীল , পরিবেশ সচেতন , সঠিক জাতীয়তাবোধ সম্পন্ন ক'রে গড়ে তোলার যে প্রয়াস , তা ব্যাহত হবে । মানুষ জানে , এ অবৈজ্ঞানিক সংক্ষিপ্তকরণ-এর কাজ  বিশেষজ্ঞরা করেন নি ।  পরিকল্পিত রাজনীতি এই করোনাকালে দুষ্কর্মের ফাঁকফোকরগুলি খুঁজে চলেছে , বিশ্বজুড়েই  !

পাঠক্রম ছাড়াও  সমাজ থেকে পড়ুয়ারা শেখে । সমাজের বন্ধন আর ইতিবাচক দিকগুলি ভবিষ্যতের বুনিয়াদ গড়ে দেয় পরম্পরায় । আজ শিক্ষিত বাবা-মা আর বড়দের আচরণে ছোটরা বুঝতে পারছে না , কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল , ন্যায়-অন্যায় বোধ ! শহর , নগর  আবাসনে করোনা রুগী ও তার পরিবারকে  শিক্ষিতরা একঘরে করে দিচ্ছে , করে দিচ্ছে ত্যাজ্য ! চলছে ছ্যুৎমার্গচালিত  নির্যাতন , অত্যাচার , মারধর । নতুন মোড়কে ছোয়াছুঁয়ি ! ফ্রন্টলাইনে কাজ করা ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মী , ব্যাঙ্ককর্মীরাও  বাদ যাচ্ছেন না ! অন্যতম ফ্রন্টলাইনার পুলিশ , নেহাতই পুলিশকে সাধারণ মানুষ ভয় পায়  নইলে পুলিশও শিকার হতো !

প্রগতিশীল ও বিজ্ঞান ভাবনায় জারিত আজকের কিশোর-তরুণরা বড়দের আচরণে খানিক বিভ্রান্ত । এই করোনা লহমায় ছেলেমেয়েদের উদার , প্রগতিশীল , বিজ্ঞানমনস্কতা কি কলুষিতই হতে থাকবে !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news