‘’ নীল আকাশের সোনা আলোর রোদ’’ । চলুন ঘুরে আসি কোচবিহারের সাগরদিঘি থেকে - Newsbazar24
ভ্রমণ

‘’ নীল আকাশের সোনা আলোর রোদ’’ । চলুন ঘুরে আসি কোচবিহারের সাগরদিঘি থেকে

‘’ নীল আকাশের সোনা আলোর রোদ’’ । চলুন ঘুরে আসি কোচবিহারের সাগরদিঘি থেকে

‘’ নীল আকাশের সোনা আলোর রোদ’’ । চলুন ঘুরে আসি কোচবিহারের সাগরদিঘি থেকে।

 

--নির্মাল্য বিশ্বাস

                                 ( news bazar24)

জীবন কী? জীবন মানে তো ছোটগল্প। জীবন খুঁজতেই কখনো এক জীবন থেকে অন্য জীবনের দিকে যাত্রা। খুঁজতে খুঁজতেই এ জীবন কখনো কখনো ছোটগল্পের চরিত্রের মতো জীবন্ত হয়ে যায়।

শান্ত পাড়া গাঁর নিস্তব্ধ দিঘির পাড়ে বসেছেন কখনো? দেখেছেন কী শিশিরের জলে  ভেজা পিয়ালের পাতায় গুঁড়ি গুঁড়ি রোদ? কিংবা ভোরের কপাট খুলে হলুদ সবুজ পাতা বেয়ে টুপ টুপিয়ে পড়া আলোর কণা? তাহলে একবার ঘুরে আসুন কোচবিহারের সাগরদিঘি থেকে। দিঘির পারে এখানে ঘুঘু পাখির অবিশ্রান্ত কুজনে ঘুম ভাঙে শহরের। দিঘির পাড় ঘেঁষা দোকানে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ে চুমুক দিয়ে প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেলছেন তখন ভবঘুরে পথিক। নরম রোদ মেখে জোড়ায় জোড়ায় কুবুপাখি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দুলেদুলে চলে। আলসেমি করে রাজহাঁসের দল ঘাড় গুঁজে মেখে নেয় নীল আকাশের সোনা আলোর রোদ।

সাগরের মতো এ দিঘির বিশালতা তাই এ দিঘির নাম সাগরদিঘি। নীল আকাশ ঢেকে দেওয়া সবুজের প্যাস্টাল ছায়া ফেলে দিঘির জলে। অতীতের পাতা উল্টে এ পথেই হারিয়ে গেছে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ কিংবা কালদর্পি রাজার গজসেনার রণ হুঙ্কার। রাজা মহারাজের যুগ কবেই মলাটবন্দি হয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়। শুধু ইতিউতি ছড়িয়ে আছে তার স্মৃতি চিহ্ন, আস্ফালন।

একলা ধুলো রাস্তার পথ ধরে দিঘির পাড় বরাবর হাঁটতে হাঁটতে দেখে নেওয়া যায় ঐতিহাসিক ভাস্কর্য। সবুজ মখমলের মতো ঘাসে ঢাকা ছোট্ট এক পাঁচিল ঘেরা উদ্যানে ধ্যানমগ্ন ভাস্কর্য মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন  নিশ্চুপ মহারাজ-  নৃপেন্দ্র নারায়ণ। চারপাশে রংবাহারি গাঁদা আর থোকা থোকা মরশুমি ফুলের নিভৃত আলাপচারিতায় মলয় স্নিগ্ধতা।

পায়ে পায়ে দেখে আসা যায় সুপ্রাচীন মদনমোহন মন্দির। আটচালার এই মন্দিরে মহারাজ নৃপেন্দ্র নারায়ণ রুপোর সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অষ্টধাতুর বিগ্রহ মূর্তি।

আরো কিছু পথ এভাবেই হেঁটে নেওয়া যেতে পারে পরিব্রাজকের বেশে। অদূরে লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের আদলে মহারাজ নৃপেন্দ্র নারায়ণ নির্মিত রাজপ্রাসাদে ব্রিটিশ আর্কিটেক্টের ছোঁয়া। নিভৃত রৌদ্রচ্ছায়ায় সবুজ লনে গোলাপের গন্ধসুবাস। একপাশে টলটলে দিঘিজলে প্রেমিকার চোখের মতো মায়াময় স্তব্ধতা।

রাজবাড়ীর ভিতরে আকাশচুম্বী বেলোয়াড়ি ঝাড় রাজদর্পের স্মৃতিটুকু জ্বালিয়ে রেখেছে। কাঠের ঘোরালো সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতেই সাবেকি আসবাবে ঠাসা শয়নকক্ষ, ড্রেসিং রুম, ড্রইং রুম, বিলিয়ার্ড হল, বৈঠকখানা। সবকিছুর মধ্যেই নবাবী আভিজাত্যের ছাপ।

রাজবাড়ীর পাশেই যে ফাঁকা মাঠ সেটা রাজবাড়ী উদ্যান। বসন্ত উৎসবের এই সময়টা ওখানে মেলা বসে। লিটিল ম্যাগাজিন মেলার সাথে সাহিত্য কার্নিভালের রং মিলন্তি। বহু দূর দূরান্ত  থেকে মানুষ এখানে আসেন  রূপকথার নৌকো চড়ে। আমার মতো আরো অনেকেই আসেন সওদাগরের বেশে। নিছক বই কিংবা পত্রিকা সওদা নয়, মানুষের সাথে মানুষের মিলনোৎসব। নাচ, গান, আবির খেলার মধ্যে দিয়ে সাহিত্য আর সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষদের দুদিন একসাথে বেঁধে বেঁধে থাকা। রাজবাড়ী উদ্যানের পিছনে যদি তাকানো যায় দেখা যাবে সেদিকে সবুজ ছাড়া আর কোনও রং নেই কিংবা সব রং এসে মিশে গেছে সবুজে। তারই মাঝে জায়গাটাকে আরো মোহময় করে তোলার জন্য এক ঝুলন্ত সেতুকে কেউ যেন দু'ধারে সুতো দিয়ে বেঁধে দিয়েছে।

এই ট্যুরের বাকি অংশের কাহিনিটা যেমন চমকপ্রদ তেমনি হাড়হিম করা। কোচবিহার শহর ছেড়ে আমরা অটো করে যাত্রা করলাম বাণেশ্বর। 12 কিলোমিটার রাস্তা, আধ ঘণ্টার মতো সময় লাগে পৌঁছতে। শ্বেত শুভ্র মন্দির। গর্ভগৃহে শিবের মূর্তি। মন্দিরের পাশেই শান বাঁধানো পুকুর পাড়। কৃষ্ণের মোহনবাঁশির গল্প শুনেছিলাম। সে সুরের মাদকতায় ছুটে আসত গোপীনিরা। আজ দেখলাম মোহন বাণীর মাহাত্ম্য। আসছি সেকথায়। তার আগে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে পুকুর পাড়ে নামছি। দেখলাম পাশেই ঘাস জমি দিয়ে একটা বিশাল সাপ গুটিগুটি এগিয়ে আসছে। খুব কম করে হলেও ফুট ছয়েক তো হবেই।আমি তো সাপের সাথে সেল্ফি নেবো বলে কাছে যেতেই সে মুখ ঘুরিয়ে ঝোপের ভিতর ঢুকে গেলো। ভয় পেল কী? আচ্ছা আমাকে দেখে ভয় পাবার মতো কী আছে বলুন তো? ভীতুর ডিম একটা। মনে হয় আমার সাথে সেল্ফি তোলাতেই ওর যত আপত্তি। সাপের শাপ শাপান্ত করে ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। শুনেছি এই পুকুরের জলে শয়ে শয়ে কচ্ছপ আছে। মোহন মোহন করে ডাকলেই তারা মুখ তুলে এগিয়ে আসে। ডাকলাম মোহন। কোনো সাড়া শব্দ নেই। আরো জোরে ডাকলাম মোহন। কোথায় কী? তারপর গলা ফাটিয়ে  ডাকতেই জল থেকে মাথা তুলে তাকাল। পুটপুট করে দেখছে। বোঝার চেষ্টা করছে কোথা থেকে আসছে আওয়াজটা। আবার ডাকতেই কাছে এগিয়ে এলো। হাত বাড়াতেই কাছে, আরো কাছে। না কোনো রূপকথার গল্প নয়। নিজের চোখে দেখা এ আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। সময় কম, অনেক কিছুই দেখার বাকি থেকে গেল। তাই ছোট গল্পের মতো এই ভ্রমণ কাহিনীর উপসংহার টেনে বলতেই হচ্ছে-

'অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে

 শেষ হয়ে হইল না শেষ।'

 

কয়েকটি প্রয়োজনীয় তথ্য:

1) দু'দিনের ছুটিতেই কোচবিহার ঘুরে আসা যায়। সেক্ষেত্রে শুক্রবার সন্ধ্যার ট্রেনে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস ধরে নিউ কোচবিহার স্টেশন নামতে হবে। নিউ কোচবিহার যাবার অনেক ট্রেন আছে তবে এই ট্রেনটাই সবথেকে ভালো। শিয়ালদহ থেকে সন্ধ্যে 7:30টায় ছাড়ে আর নিউ কোচবিহার পৌঁছায় সকাল 9:30টায়। এই ট্রেনে টিকিট না পেলে পদাতিক, গরিব রথ, তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস সহ একাধিক ট্রেন আছে।

2) স্টেশন থেকে বেরিয়েই অটো নিয়ে কোচবিহার জেলা পরিষদের অতিথি নিবাসে। অটো ভাড়া কুড়ি টাকা। সময় লাগে আধ ঘন্টার মতন। এটা একদম সাগরদিঘির পাশেই। নাহলে আরো একটু এগিয়ে লিচুতলা মার্কেট কমপ্লেক্সের জেলা পরিষদের অতিথিশালায় থাকতে পারেন। আগে থেকে বুকিং করার কোনো দরকার নেই। ঘর খালিই থাকে। ঘর ভাড়া দিন প্রতি তিনশো টাকা। এটাচড বাথ আছে। এছাড়া বিলাসবহুল হোটেলও অনেক আছে। খাবারের হোটেলও আশেপাশে প্রচুর আছে।

2) সকালে হোটেলে একটু ফ্রেশ হয়েই টোটো ভাড়া করে দেখে নেওয়া যেতে পারে সাগরদিঘি, মদনমোহন মন্দির। খুব কাছেই এই দুটো। খুব সহজেই পায়ে হেঁটে ঘোরা যায়।

3) দুপুরে লাঞ্চ করে একটু বিশ্রাম নিয়েই দেখা যেতে পারে কোচবিহার রাজবাড়ী। এটাও খুব কাছে। লিচুতলা থেকে পায়ে হেঁটে 10 মিনিট। সাগরদিঘি থেকে আরো কাছে। তবে হাঁটতে না চাইলে টোটো তো আছেই।

4) পরদিন অর্থাৎ রবিবার স্নান টান সেরে জলখাবার খেয়ে সকাল নটার মধ্যে বেরিয়ে অটো করে ঘুরে আসা যায় বাণেশ্বর।  অটোতে যেতে আধ ঘন্টার মতো সময় লাগে। ভাড়া পনের টাকা। এক ঘন্টা ওখানে ঘুরে 11টার মধ্যে হোটেলে ফিরেই স্টেশনের দিকে যাত্রা করতে হবে। নিউ কোচবিহার থেকে শিয়ালদহ যাবার ট্রেন তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস। ছাড়ে দুপুর 12:10 মিনিটে। সোমবার শিয়ালদহ পৌঁছবে ভোর পাঁচটায়। তবে এই ট্রেন যে দু - তিন ঘন্টা লেট করবে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না

NewsDesk - 2

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news