ধর্ম কথা

হিন্দু পুরাণে তর্পণ বলতে কি বোঝায় ? পুত্র ছাড়া কি মুক্তি লাভ সম্ভব ?

হিন্দু পুরাণে তর্পণ বলতে কি বোঝায় ? পুত্র ছাড়া কি মুক্তি লাভ সম্ভব ?

হিন্দু পুরাণে তর্পণ বলতে কি বোঝায় ? পুত্র ছাড়া কি মুক্তি লাভ সম্ভব ?

 

কমলেশ দ্বিবেদি, উজ্জয়ন, মধ্যপ্রদেশ

দোর গোরায় মহালয়ার দিন। আর এদিন থেকেই অফিশিয়ালি ভাবে পুজোর দিন গোনার শুরু হয়। তারপর কখন যেন চতুর্থী চলে গিয়ে পঞ্চমী, ষষ্ঠী এসে গিয়ে বিজয়া দশমীও এসে পড়ে, সে খেয়ালই আমরা রাখি না। মহালয়ার দিন থেকে পুজো গোনা শুরু হলেও এই দিনটার একটা আলাদা বাড়তি তাৎপর্য আছে। মহালয়াকে বলা হয় পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনা। এই দিনে আমরা পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে থাকি, তাঁদের জলদান করি ও তাঁদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকি।

হিন্দু পুরাণে তর্পণ বলতে কি বোঝায় ?

হিন্দু পুরাণে থেকে আমরা জানতে পারি যে জীবিত ব্যক্তির তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই পিতৃলোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি স্থান যার অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন স্বয়ং যম। এই মৃত্যুর দেবতা যমই কার্যত মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য বা পৃথিবী থেকে তাঁর মৃত্যুর পর পিতৃলোকে নিয়ে যান। আর তারপর বংশের পরবর্তী প্রজন্মের কারুর যখন মৃত্যু হয়, তখন সেই ব্যক্তি পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গিয়ে ঈশ্বর বা পরমাত্মায় মিশে যান। অন্যান্য নানা হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থ অনুযায়ী পিতৃপক্ষের সূচনা তখনই হয় যখন সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করে

হিন্দুরা বিশ্বাস করে থাকেন, পিতৃপক্ষের এই সূচনায় তাঁদের পূর্বপুরুষরা পিতৃলোক ত্যাগ করে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের গৃহে গিয়ে সেখানে অবস্থান করেন। পরে যখন সূর্য আবার যথাসময়ে বৃশ্চিকরাশিতে প্রবেশ করে তখন তাঁরা আবার পিতৃলোকে পুনর্গমন করেন। আর পূর্বপুরুষরা যেহেতু তাঁদের গৃহে অবস্থান করেন তাই তর্পণের উদ্দেশ্যে এইসময় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হিন্দুরা।

রামায়ণে তর্পণ   

হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী   খালি মহালয়ার দিন নয় । যে কোনো শুভ কাজ করতে গেলেই প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়, তাঁদের প্রণাম জানিয়ে কাজটি শুরু করতে হয়। রামচন্দ্র যখন লঙ্কা বিজয়ের আগে দেবীকে অকালবোধনে মর্ত্যে আনেন, তখনও তিনি পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন।

এই দিনে প্রয়াত আত্মারা মর্ত্যে আসেন। প্রয়াত আত্মাদের এই মর্ত্যে আগমনকে বলা হয় মহালয়, সেই থেকেই কিন্তু এসেছে মহালয়া কথাটি। মহালয়া আবার পিতৃপক্ষের শেষ দিনও বটে!

মহাভারতে তর্পণ  

তর্পণ সম্পর্কে মহাভারতে আমরা একটি কাহিনী  পেয়ে থাকি । দাতা কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গেলে তাঁকে সোনা ও মূল্যবান ধনরত্ন খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। যথারীতি কর্ণ অবাক হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন দেবরাজ জানান যে কর্ণ তাঁর সারাজীবনে অনেক দানকর্ম করলেও প্রার্থিত ব্যক্তিকে শুধুমাত্র মূল্যবান ধনরত্নই দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে কখনও খাবার দেননি।

জীবদ্দশায় পিতৃপুরুষের প্রতি অবহেলা দেখানোর জন্য তাঁকে সোনা ও ধনরত্ন খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়েছে। কর্ণ তখন তাঁর অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করে নিলে তাঁকে ষোলো দিনের জন্য আবার পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে খাদ্য ও জল দান করার অনুমতি দেন ইন্দ্র। আর সেই থেকে এই ষোল দিনের পর্ব নাকি পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। কোনো কোনো জায়গায় এখানে দেবরাজ ইন্দ্রের স্থানে মৃত্যু দেবতা যমকেও আমরা দেখি।

আর গরুড় পুরাণে আছে পুত্র ছাড়া মুক্তি নেই। তাই তর্পণের মাধ্যমে পুত্রের পিতা ও পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা অন্ন ও জলই কার্যত পূর্বপুরুষের মুক্তির উপায় বা মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তাই হিন্দুধর্মে মহালয়ার দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে যে তর্পণ করা হয়, তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, যাদের পুত্র সন্তান নেই বা সন্তান নেই, তারা কি তবে মুক্তি লাভ করবে না ? এই প্রশ্নের উত্তর যখন তর্পণ করা হয় তখন খালি পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে  নয় মন্ত্রর মধ্যেই আছে ‘’ সর্ব মঙ্গল মঙ্গলে শিবে সর্বার্থ সাধিকে. শরন্যে ত্রম্ব্যকে গৌরি নারায়ণিনমোহস্থুতে...’’ সকল জানা অজানা আত্মদেরও জল দেওয়া হয়। এতেই তাদের মুক্তি লাভ হয়ে যায়।

 -ফাইলচিত্র

Shankar Chakraborty

aappublication@gmail.com

Editor of AAP publicaltions

Post your comments about this news