পাঠকের কলম

সরকারের উদাসীনতায় ভারতে জল সংকট

সরকারের উদাসীনতায় ভারতে জল সংকট

জল সঙ্কটের কারণ একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে। 

 

কিভাবে হবে এর সমাধান?

নরম পানীয় কেনা এক্ষুণি বন্ধ করা উচিত। 

 

এই তীব্র গরমে এক বালতি জলে স্নান করে জল বাঁচানোর করুণ আর্জি এবং সেই সংক্রান্ত ভাইরাল ফেসবুক পোস্টটি, তা কোনোভাবেই এড়িয়ে না গিয়ে শেয়ার করার কথা দেখে এই লেখাটি লিখতে বসা। যারা ভাবছেন এভাবে জল বাঁচিয়ে রাখতে পারলে আগামীদিনের নিষ্ঠুর সত্যকে একটু হলেও দূরে ঠেলে দেওয়া যাবে, তাদের বলছি আপনারা নেহাতই মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। 

 

সেন্ট্রাল গ্রাউন্ড ওয়াটার বোর্ডের রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতিবছর যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করা হয়, তার মাত্র ৮% আমরা ব্যবহার করি গৃহস্থালীর জন্য। ৮৯% ব্যবহার করি কৃষিকাজে এবং ৩% ইন্ডাস্ট্রিতে। মাত্র ৮% পেতেই কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। চেন্নাই, দিল্লির পরেই কলকাতার খবর আছে নাকি।

 

এরপরে কতগুলো প্রশ্ন আসে স্বাভাবিকভাবে। ভারতবর্ষ প্রতিবছর যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করে, তা চীন ও আমেরিকার সম্মিলিতভাবে উত্তোলিত জলের থেকেও বেশি। তারপরেও কৃষিতে এত জলের সমস্যা কেন? কৃষকদের শয়ে শয়ে মৃত্যু কেন?? নীতি আয়োগের ডেটা অনুযায়ী এতো ভয়ানক ক্রাইসিস আগে কখনো হয়নি। হটাৎ এখন? কিভাবে? কেন?

 

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিগুলো কিভাবে কত পরিমাণ জল ব্যবহার করে তার তথ্য সংগ্রহ করছিলাম। দেখা গেল, পেপসি, কোকাকোলা জাতীয় পানীয়, স্পঞ্জ আয়রন (যার প্রোডাকশন এই দেশে নাকি ব্যানড), বিভিন্ন স্টিল কোম্পানিগুলোতে সবচেয়ে বেশি জল ব্যবহার করা হয়। 

 

কোকাকোলা কোম্পানির সারাবছরের জল ব্যবহারের হিসেব করতে গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। উপরিতল থেকে দেখলে দেখা যাবে প্রতি লিটার কোকাকোলা প্রস্তুত করতে প্রায় ৯ লিটার জলের প্রয়োজন (২০০০ সালের তথ্য)। কোকাকোলার দাবী অনুযায়ী বর্তমানে তারা এই সংখ্যাকে ১.৪৬ লিটারে নামিয়ে এসেছে। কিন্তু, এই হিসাবটি শুধুমাত্র কোকাকোলার বটলিং প্ল্যান্টের জন্য খাটবে।

 

পানীয়টির প্রোডাক্ট লাইফ সাইকেল এনালাইসিস করলে অবশ্য ভয়ানক তথ্যটি উন্মোচিত হবে। প্রতি লিটার কোকাকোলায় যে পরিমাণ চিনি ব্যবহার করা হয়, তা উৎপাদন করার জন্য প্রায় ৪৫০ লিটার জলের প্রয়োজন।। এখানে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ন তথ্য বিবেচনা করার প্রয়োজন।

 

ভারতবর্ষে প্রতিবছর উৎপাদিত চিনির সিংহভাগ কেনে কোকাকোলা। চিনি ক্রয় করার এই লিস্টে তৃতীয় স্থানে রয়েছে পেপসিকো। যেসব ফসলের ক্ষেত্রে জলের ব্যবহার অনেকবেশি, যেমন ধান বা আখ, সরকার সেসব ফসল, চাষীদের ফলাতে উৎসাহ দেয় এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) দেওয়ার মাধ্যমে।। সরকার নিশ্চিত করেছে চিনির উৎপাদন। যেখানে অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে এই সুবিধা দিতে তারা অপারগ। অর্থাৎ, সচেতন ভাবে দেখলেই বোঝা যাবে একটা মারাত্মক চক্র রান করছে। এই ভিসিয়াস সার্কেল কি নেহাতই একটা কোইনসিডেন্স?? কার জন্য উৎপাদন? কার জন্য এই তীব্র জলসঙ্কট?? উত্তর অবশ্যই ভাবেই কিছু নির্দিষ্ট বিলিওনেয়ার মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জন্যই।

 

যাইহোক, প্রতিবছর কত লিটার কোক উৎপাদিত হচ্ছে, তার সঙ্গে ৪৫০ গুণ করলেই একটা হিসেব পাওয়া সম্ভব যে কত লিটার জলের ব্যবহার হয় সারাবছরে। কিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট ডেটা না থাকায় আমরা এই পদ্ধতিতে ক্যালকুলেশন করবো না। একটি বিকল্প ইনফরমেশন ব্যবহার করে এই ক্যালকুলেশন করা যাক। 

 

প্রতিটি কোক ম্যানুফেকচারিং প্ল্যান্টে দৈনিক ৫ লক্ষ লিটার জলের প্রয়োজন। সারা ভারতবর্ষ জুড়ে ৫৮টি এরকম প্ল্যান্ট রয়েছে। অর্থাৎ সারাবছরে যে জল ব্যবহার করা হয়, তা হলো প্রায়  ১০,৫৮৫ মিলিয়ন লিটার জল। এবার যদি ধরে নেওয়া যায় শেষ ২০ বছর ধরে (যদিও কোকাকোলার শুরু এই দেশে ১৯৯৩ সালে) এই পরিমাণে জলের ব্যবহার, তাহলে তা দাঁড়াচ্ছে ২১১.৭ মিলিয়ন কিউবিক মিটার।। এই সংখ্যা নির্দেশ করছে যে শেষ কুড়ি বছরে শুধুমাত্র কোকাকোলা যে পরিমাণ জল ব্যবহার করেছে, তা অন্ততঃপক্ষে আগামী একবছর ধরে সারা ভারতবর্ষের তেষ্টা মেটাতে সক্ষম ছিল।

 

এখানেই সমস্যা শেষ নয়। অপরিমিতভাবে জল ব্যবহারের পাশাপাশি এই কোম্পানিগুলির যে বিপুল পরিমান বর্জ্যপদার্থ তৈরি হয়, তা প্ল্যান্টের এলাকার ৩ কিলোমিটার ব্যাসার্ধে সকল জলের উৎসকে দূষিত করছে। যা পানীয়যোগ্য নয়, কৃষিকাজে এর ব্যবহার সম্ভব নয়। অর্থাৎ স্লো ডেথই একমাত্র ভবিতব্য। বর্জ্য পদার্থের মধ্যে লেড (অধিক পরিমাণে লেড শিশুদের জন্য বিপজ্জনক, এনিমিয়া এবং নানান রকমের মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে) এবং ক্যাডমিয়ামের  (ক্যাডমিয়াম কার্সিনোজেনিক, কিডনি ফেলিউরের কারণ) উপস্থিতি মাত্রাতিরিক্ত ভাবে বেশি। কেরালার পালাক্কাড জেলায়, তামিলনাড়ুর থিরুনেভেলি জেলা, উত্তরপ্রদেশের মেহদিগঞ্জ জেলা, মহারাষ্ট্রের থানে এই সমস্যায় জর্জরিত। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে এই সমস্ত অঞ্চল থেকে কোকাকোলা তার সমস্ত প্রোডাকশন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। তবুও যে সমস্যা তারা ফেলে রেখে গেছে, তার কম সমাধান নেই। 

 

অর্থাৎ বিপুল জলের অপচয় এবং নিকটবর্তী অন্যান্য জলের উৎসকে দূষিত করার মাধ্যমে যে জটিল সমস্যা তৈরি করেছে এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলি, তা কি শুধুমাত্র দৈনন্দিন জলের ব্যবহার কমিয়ে রোখা সম্ভব?? স্পঞ্জ আয়রনের কারখানা এবং স্টিল কোম্পানীগুলির ক্ষেত্রেও একইরকম সমস্যা বর্তমান। ভেবে দেখুন, এই সকল সমস্যা মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় কি শুধুমাত্র নিজেদের জন্য বরাদ্দ জলের প্রয়োজন কমিয়ে মেটানো সম্ভব?? নাকি এসবের মধ্যে দিয়ে আমরা আসলে কর্পোরেট স্বার্থকেই পুষ্ট করছি?? যদি মনে হয় যে হ্যাঁ, তাহলে নিজেদের দোষ দেবেন না। তার চেয়ে বরং প্রশ্ন করুন তাদের যাদের জন্য এই তীব্র সংকট, যাদের জন্য আগামী দিনে জলের অভাবে মৃত্যু একটা নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।

       - শবরী চ্যাটার্জী, সিঙ্গতলা, মালদা

Shankar Chakraborty

aappublication@gmail.com

Editor of AAP publicaltions

Post your comments about this news