পৌরানিক ভাবনার অনুষঙ্গে পালিত মালদহের চড়ক বা গাজন উৎসব আজও বর্ণময়। - Newsbazar24
ধর্ম কথা

পৌরানিক ভাবনার অনুষঙ্গে পালিত মালদহের চড়ক বা গাজন উৎসব আজও বর্ণময়।

পৌরানিক ভাবনার অনুষঙ্গে পালিত মালদহের চড়ক বা গাজন উৎসব আজও বর্ণময়।

ডঃ রাধা গোবিন্দ ঘোষ, মালদহের বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক এবং রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার প্রাপ্ত শিক্ষক। 

পৌরানিক ভাবনার অনুষঙ্গে পালিত মালদহের চড়ক বা গাজন উৎসব আজও বর্ণময়

ডঃ রাধা গোবিন্দ ঘোষ                                          (অনুলিখন কার্ত্তিক চন্দ্র পাল)

বাংলা মাসের শেষ দিনটিকে বলা হয়  সংক্রান্তি হিন্দু সংস্কৃতিতে জৈষ্ঠ সংক্রান্তি, শ্রাবন সংক্রান্তি ,পৌষ  সংক্রান্তির মতো চৈত্রসংক্রান্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ পরব পরব কথাটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ পর্ব থেকে পর্ব,  তিথি, নক্ষত্র,  দিন, এবং গ্রহণযোগে  সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে সংক্রমণ  ঘটে এই সংক্রমণকেই   বলে  সংক্রান্তি মালদহ জেলার  মহানন্দা নদীর পূর্ব প্রান্তে পুরাতন মালদহের পাবনা পাড়ায়,  বিমল দাস কলোনিতে, হবিবপুর থানার অন্তর্গত কলাই বাড়িতে , বুলবুলচন্ডীর ডুবাপাড়া এবং শহরের ঘোষপাড়ায ও মহানন্দা পল্লীর মহানন্দা নদীর ধারে ব্যাপক  উৎসাহ উদ্দীপনা এবং কঠোর নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে চড়ক বা গাজন  উৎসব পালিত হয়ে থাকে চরক মূলত শৈব পর্ব চড়ক শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ “চক্র”থেকে ড়কের মূল উদ্দেশ্য বছরের সমাপ্তি  ঘটানো।  চড়ক পূজাই ধর্ম ঠাকুরের গাজন উৎসব  মালদহে  চৈত্রসংক্রান্তিতে যেমন শিবের আরাধনা করা হয় তেমনি বৈশাখ মাসে গম্ভীরাতে   শিব বন্দনা করার রীতি প্রচলিত আছে। ডঃ নীহাররঞ্জন রায়  বলেছেন “ চড়কপূজা আদিম কৌম সমাজের ভুতবাদ   পুর্নজন্ম বাদের বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেক কৌমের মৃত ব্যক্তিদের পুনর্জন্মের কামনায় এই পূজা বাৎসরিক অনুষ্ঠান তাছাড়া বান ফোড়া এবং দৈহিক যন্ত্রণা গ্রহণ  বা রক্তপাত উদ্দেশ্যে যেসব অনুষ্ঠান  চড়ক পূজার সঙ্গে জড়িত তার মূলে সুপ্রাচীন কৌম সমাজের নরবলি প্রথা স্মৃতি বিদ্যমান’।  গ্রাম বাংলার পল্লীতে পল্লীতে চড়ক পূজার অনুষ্ঠান লক্ষিত হয় কোন  কোন গবেষকের মতে তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য লক্ষ করা যায়।  চরক উপলক্ষে গাজন উৎসব পালনের মধ্য মধ্যে পৌরাণিক কাহিনী যুক্ত আছে বান ছিলেন বলির জ্যেষ্ঠপুত্র বানের কন্যা উষা স্বপ্নে কৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধ কে দেখে তার প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে অবশেষে প্রিয় সখি চিত্রলেখার সহায়তায় অনিরুদ্ধর সাথে  গান্ধর্ব বিবাহে আবদ্ধ হয় শমিতপুরে রাজা বান  একথা জানতে পেরে ক্রোধে অন্ধ হয়ে অনিরুদ্ধের প্রাণনাশের হুকুম দেন যুদ্ধবন্দী অনিরুদ্ধের প্রাণনাশের উদ্যত হয়েছেন জানতে পেরে শ্রী কৃষ্ণ, বলরাম এবং প্রদ্যুন্ম  কে সঙ্গে করে সোমিতপুরে উপস্থিত  হলে  উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ হয় মৃত্যুর আগে বান কৃষ্ণের কাছে  লাভ করলেন যে  যেহেতু ন্তজ কন্যা  ঊষা কৃষ্ণের বংশধরদের জননী হবেন সেহেতু বছরের একটি দিন অন্তজরা  সকলে পুণ্য হবেনসেদিন থেকেই গাজন উৎসব শুরু চৈত্র সংক্রান্তিতে মহাদেবের প্রীতি সাধনের জন্য বান বন্ধুবান্ধবসহ শিব ভক্তিসুচল নৃত্যগীতাদিতে  মত্ত হয়ে স্বীয় গাত্র হতে রুধির  প্রদান করে শিবের সন্তুষ্টি বিধান করেন চৈত্রসংক্রান্তিতে গণ্ডদেশ বিদ্ব করা, পৃষ্ঠদেশে লৌহ শলাকা  দিয়ে বৃদ্ধ করে গাত্র রুধিরাক্ত  করার মধ্যে বানরাজ কর্তৃক চরিত  অনুষ্ঠানের একটি সশ্রদ্ধ  অনুসৃতি। একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় চড়ক পূজা এবং মেলা চৈত্র মাসের শেষ দিনে হয় বলে একে চৈত্রসংক্রান্তি মেলা বলা হয় গাজন উৎসব এর তাৎপর্য গভীর হিন্দু শাস্ত্রে শিবকে সূর্য শক্তির এবং পার্বতীকে  ধারিত্রি প্রতীক বলা হয়েছে গাজন উৎসবে  সূর্যের সঙ্গে ধারিত্রি বিবাহ সম্পন্ন হয় সৌর শক্তির প্রভাবেই  ধরনী উর্বর এবং শস্য শ্যামলা হয় এই চড়ক পূজার নানা  নিয়মবিধি  গাছ জাগানো অন্যতম একটি  বিধি।  গাছের কান্ড জলাশয়ে ডুবিয়ে রেখে সংক্রান্তির পূর্ণ দিনে  ঢাকঢোল বাজিয়ে শুকনো জায়গায় তুলে তেল সিন্দুর মাখিয়ে মাটিতে খাড়া করে পুঁতে দেওয়া হয় গাজন শুরু হয় এই থেকেই অধিবাস ,আসন, ধূপ। হাজরা পূজা, হাজরা চালান, সং সাজা,  পিঠে বড়শি  ফোড়ানো প্রভৃতি নানা ইতিকর্তব্যতা  বিশেষভাবে লক্ষণীয় চৈত্রসংক্রান্তিতে ভক্তদের নানা শারীরিক কষ্ট ভোগ করতে দেখা যায়।  কাটার উপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটা, জিহ্বা কিংবা  ঠোটের ভিতর দিয়ে লোহার চিকন শিক প্রবেশ করানো, চড়ক গাছের শীর্ষে  আড়াআড়িভাবে স্থাপিত  একটি দীর্ঘ পাশের দুই প্রান্তে পিঠে বড়শি গেথে  দাঁড়িপাল্লার মতো ভারসাম্য  বজায় রেখে  দীর্ঘক্ষণ  ঘুরপাক খাওয়া বাস্তবিকই বিস্ময় উদ্রেক  করে চড়ক উপলক্ষে মালদহের বিভিন্ন থানায় ষ্টক ,বোলান, সুবল, মিলন,  শ্মশান, লবকুশ যুদ্ব,নৌকা বিলাস  প্রভৃতি গান গাইবার রীতি এখনো প্রচলিত আছে বিষয়বস্তুর বৈচিত্রে গানগুলি অপরূপ ব্যাঞ্জনায় সমৃদ্ধ চড়ক মালদহের হালদার,মালো, জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে পরম শ্রদ্ধায় পালিত হয়ে  থাকে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়  কিংবা বৈশ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে চড়ক পূজা পালনের রীতি পরিলক্ষিত হয় না সংক্রান্তির পরেই নববর্ষের সূচনা নববর্ষের পুন্য  প্রভাতে সমাজের তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষদের সযত্ন অপেক্ষার অবসান হোক,  দেবাদিদেব মহাদেবের আশীর্বাদে উপেক্ষিত অন্তজ্যদের দল  সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক এই কল্যাণী  ইচ্ছাই হয়তো মূর্ত হয়ে ওঠে চড়ক পূজার অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে  প্রসঙ্গে স্মরণীয় মালদহ জেলার মত নদীয়া জেলার শান্তিপুর জলেশ্বর শিবের গাজন  হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় শটগান উৎসব বর্ধমান জেলার কাটোয়া থানার অন্তর্গত সিঙ্গি গ্রামের শিবের গাজন পুরুলিয়া জেলার গ্রামের গাজন উপলক্ষে মেলা খুবই আকর্ষণীয়

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news