পুরীর রথযাত্রার ইতিহাস - Newsbazar24
সাহিত্য

পুরীর রথযাত্রার ইতিহাস

পুরীর রথযাত্রার ইতিহাস

 

পুরীর রথযাত্রার ইতিহাস

ডঃ রাধা গোবিন্দ ঘোষ(রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত ও বঙ্গরত্ন প্রাপ্ত প্রাক্তন শিক্ষক)  

ঋতুচক্রে গ্রীষ্মের পর বর্ষার স্থান আষাঢ় বর্ষা ঋতুর অন্তর্গত আষাঢ়ে পুঞ্জীভূত মেঘ কে অবলম্বন করে মহাকবি   কালিদাস অমর মেঘদুত কাব্য রচনা করেছেন আষাঢ়ে জন্মিলে জাতক গুরু  বৎসল, বহুব্যয়ী এবং বহুভাষী হয় শ্রী শ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা এই মাসের অন্যতম প্রধান  ধর্মকৃত্য। রথোৎসবকে কেন্দ্র করে  ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে নানা আনন্দঘন অনুষ্ঠান  এবং মেলা হয়ে থাকে পুরীর রথোৎসব বাস্তবিকই আকর্ষণীয় রথ যাত্রার অপর নাম শ্রী গুন্ডিচা যাত্রা বা ঘোষ যাত্রা আষাঢ়ের শুক্ল দ্বিতীয়া থেকে দশমী পর্যন্ত নয় দিনের এই যাত্রা বিশ্ব প্রসিদ্ধ প্রতিবছর  রথ নতুনভাবে তৈরি করা হয় ভগবান জগন্নাথ দেবের দ্বাদশ  যাত্রার মধ্যে গুন্ডিচা যাত্রা প্রধান গুন্ডিচা মন্দিরেই বিশ্বকর্মা  জগন্নাথ, বলরাম এবং  সুভদ্রার কাষ্ঠ নির্মিত প্রতিমা তৈরি করেন স্কন্দপুরাণে রথযাত্রা সম্বন্ধে খুব সুন্দর আলোচনা আছে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ  জরা ব্যাধের শরাঘাতে দেহত্যাগ করেন তার দেহ সেই বৃক্ষমূলে তিত থাকে পরে সেই দেহাস্থি  রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের  হস্তগত হলে তিনি তাতে জগন্নাথ দেবের মূর্তি নির্মাণের জন্য বিশ্বকর্মা কে নিযুক্ত করেন বিশ্বকর্মা রাজাকে  একটি শর্ত দেন যে মূর্তি নির্মাণকালে যদি কেউ তা দর্শন করে তাহলে তিনি আর মূর্তি তৈরি করবেন না বিশ্বকর্মা দ্বার রুদ্ধ করে মূর্তি নির্মাণ করতে লাগলেন ১৫ দিন অতিক্রান্ত হলে ইন্দ্রদ্যুম্ন মূর্তি দর্শন করার জন্য  ব্যগ্র হয়ে যেই দ্বার উদঘাটন করলেন অমনি বিশ্বকর্মা  অন্তর্হিত হলেন।  মূর্তি নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকল। পরে  ব্রহ্মার আদেশে সেই অবস্থার মূর্তি জগন্নাথদেব নামে পরিচিত। রথযাত্রার সময় জগন্নাথ দেবের থের  সঙ্গে বলরাম এবং সুভদ্রার রথ টানা হয় বলরাম শ্রীকৃষ্ণের বৈমাত্রেয় জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা পিতা বসুদেব মাতা রোহিনী এবং স্ত্রী  রেবতী। কৃষ্ণের সঙ্গে বাল্য ক্রীড়া এবং  গোচারন করতেন। কৃষ্ণের সঙ্গে সান্দীপনি  মুনির কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেন ইনি গদাযুদ্ধে অদ্বিতীয় হল ইনার প্রধান অস্ত্র এজন্য নাম হলধর দুর্যোধন এবংভীম   বলরামের  কাছেই গদাযুদ্ধ শিক্ষা করেন ইনি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কোন পক্ষ অবলম্বন করেননি যদু কুল নির্মূল হলে ইনি যোগ অবলম্বনে প্রাণত্যাগ  করেনসুভদ্রার রোহিণীর গর্ভে জন্ম পিতা বসুদেব অর্জুন দ্বারকায়  উপনীত হয়ে সুভদ্রা কে দেখে মুগ্ধ হন কৃষ্ণ যাদবদের  সঙ্গে পান্ডবদের  সম্পর্ক স্থাপনের  জন্য সুভদ্রার সঙ্গে অর্জুনের বিবাহ দিতে উদ্যত হলে বলরাম তাতে আপত্তি করেন তখন অর্জুন কৃষ্ণের উপদেশ অনুসারে সুভদ্রাকে হরণ করেছিলেন সুভদ্রার গর্ভে অভিমন্যুর জন্ম হয়

রথের বিভিন্ন অংশ রথ নির্মাতাকে বলে কর রথচালককে  বলে  যুক রথের চাকা কে বলে রথাঙ্গ। রথস্থ  যোদ্ধাকে বলে  রথিক। শরীর রক্ষার জন্য রথের মধ্যে গুপ্তস্থান কে বলে রথ গুপ্তি।  রথের চাকা কে বলে  রথচরন।  পুরীতে যে  রথযাত্রা উৎসব হয় তাতে থাকে তিনটি রথ।  একটি জগন্নাথ, একটি বলরাম এবং আরেকটি সুভদ্রা

জগন্নাথের রথের নাম নন্দিঘোষ। রথের সারথির নাম দারুকা। এই রথের উচ্চতা ৪৪ ফুট ২ ইঞ্চি। রথে  থাকে ১৬ টি চাকা। চাকার পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। ঘোড়ার রং সাদা। চারটি ঘোড়ার নাম শঙ্খ, বলাহক, শ্বেতা এবং হরিদশ্ব।  বলরামের রথ থাকে সবার আগে। মাঝে থাকে সুভদ্রার রথ। সবশেষে থাকে জগন্নাথের  রথ।সুভদ্রার রথের নাম দেবদলন। রথের উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। এতে থাকে বারোটি চাকা চাকার পরিধি ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি।  এতে থাকে রথের রং কালো এবং লাল। রথের ঘোড়া লাল রঙের চারটি  ঘোড়ার নাম রোচিকা, মোচিকা, জিতা এবং অপরাজিতা। সুভদ্রার সারথির নাম অর্জুন। বলভদ্রের রথের  নাম তালধ্বজ। উচ্চতা ৪৩ ফুট ৩ ইঞ্চি। চাকা ১৪টি। পরিধি ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি। ঘোড়া কালো রঙের। চারটি ঘোড়ার নাম ত্রিব্রা,  ঘোরা। দীর্ঘশর্মা  এবং স্বর্ণাভা।   বলভদ্রের রথের সারথির নাম মাতলি। জগন্নাথের রথের রশির নাম শঙ্কচূড়। সুভদ্রার রথের রশির নাম স্বর্ণচূড় নাগিনী। বলরামের রথের রশির নাম বাসুকিনাগ। জগন্নাথের রথের পতাকার নাম ত্রৈলোক্য মোহিনী। সুভদ্রা রথের পতাকার নাম নদাম্বিকা এবং বলরামের রথের  পতাকার নাম উন্নয়নী। প্রত্যেকের পার্শ্ব দেবতা নয় জন।  

পুরীর মন্দিরের বাস্তুকলায় বৌদ্ধ প্রভাব আছে। সাধারণত শিব-পার্বতী রাধা-কৃষ্ণ কিংবা বিষ্ণু -লক্ষীর চিত্রাঙ্কনে পুরুষ এবং প্রকৃতির রূপ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু পুরীর রথযাত্রায় ভ্রাতা এবং ভগিনীর চিত্র দেখা যায়। জগন্নাথ, বলরাম এবং  সুভদ্রা মূর্তি আসলে বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের স্বরূপ। বৌদ্ধরা ধর্মকে স্ত্রী সংজ্ঞায়   চিহ্নিত করেন। পুরীর মন্দির গাত্রে হিন্দু দেবদেবীর  নানা চিত্র অঙ্কিত। রাহু, হনুমা্‌ন,কালিয়া-দমন গরুড়-  বাহন নারায়ন নৃসিংহ-লক্ষ্মী গোবর্দ্বন লীলা রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য বামন, বরাহ এবং নৃসিংহ মূর্তি ভক্তজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কোনও কোনও পন্ডিত মনে করেন যে রথযাত্রায় জগন্নাথ এবং বলরামের সঙ্গে সুভদ্রার যাত্রা আসলে সুভদ্রার নগর ভ্রমণের বাসনার  ইচ্ছাপূরণের প্রতীক। রথযাত্রায় রাজা পালকিতে আসেন এবং সোনার ঝাড়ু দিয়ে তিনটি রথ পরিষ্কার করেন। তারপর রথযাত্রা শুরু হয়। হাজার হাজার ভক্ত রথ টেনে সন্ধ্যার সময় গুন্ডিচায়  নিয়ে যায়। প্রতিবছরই নতুন রথ তৈরি করা হয়। বসন্ত পঞ্চমীর দিনে কাঠ সংগ্রহ শুরু হয়। আর অক্ষয় তৃতীয়া থেকে রথের নির্মাণ কার্য শুরু হয়। স্কন্দপুরাণে উৎকল খন্ডে বলা হয়েছে যে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন কে ভগবান বলেছিলেন যে তার জন্মস্থান তার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এজন্য বৎসরে একবার উনি জন্মস্থানে নিশ্চয়ই যাবেন।  হিন্দু সংস্কৃতিতে বলা হয়েছে যে রথ চলাকালীন জগন্নাথ দেবের দর্শন অত্যন্ত পুন্যফলদায়ক।‘ মহাবেদাং  ব্রজন্তং তং রথস্থং  পুরুষোত্তম বল ভদ্রং  সুভদ্রাং  চ দৃষ্ঠা  মুক্তির্ন  চান্যথা”(স্কন্দপুরান)।

 

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news