দোল হোক কিংবা হোলি উৎসবের আনন্দ একটাই ,রঙে একাত্ম হওয়া- পরস্পরকে শুধু রাঙিয়ে তোলার দিন - Newsbazar24
ধর্ম কথা

দোল হোক কিংবা হোলি উৎসবের আনন্দ একটাই ,রঙে একাত্ম হওয়া- পরস্পরকে শুধু রাঙিয়ে তোলার দিন

দোল হোক কিংবা হোলি উৎসবের আনন্দ একটাই ,রঙে একাত্ম হওয়া- পরস্পরকে শুধু রাঙিয়ে তোলার দিন
    বসন্তের আমন্ত্রণে আসছে রঙের উৎসব 

            - মহুয়া চক্রবর্তী

ফাল্গুন মাস মানেই বসন্তের সুর। আর বসন্ত মানেই রঙের উৎসব। ইতিমধ্যে বসন্তের আহ্বানে চারিদিকে পলাশরাণী ফুলের ডালি নিয়ে প্রস্তুত। প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নানা রঙের পসরা সাজিয়ে সাজসাজ রব দোকানে দোকানে। সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে

স্মৃতির মোড়কে উঁকি দিচ্ছে রঙিন মুখের সারি। আর মাত্র হাতেগোনা কয়েকটা ঘণ্টার অপেক্ষা দোল বা হোলি উৎসবে মেতে উঠবে গোটা দেশ। সবাইমিলে একইসুরে বলে উঠবে 'হোলি হ্যায়'

জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রঙের বাহারে পরস্পর পরস্পরকে শুধু রাঙিয়ে তোলার দিন এটি। এবছর ২১ এবং ২২শে মার্চ দোল বা হোলির আনন্দের জোয়ারে ভাসবে আট থেকে আশি সবাই। এই উৎসব আবার বসন্তউৎসব নামেও পরিচিত। রঙের বাহারে রঙিন হয়ে ওঠে রাজপথ থেকে অলিগলি। আবিরের গন্ধে মুখরিত হয় আকাশ বাতাস। এদিন সকাল থেকেই নারীপুরুষ নির্বিশেষে একে অপরকে লাল ,নীল ,হলুদরঙ্গা আবির মাখানোর পাশপাশি চলে নানান তরল রঙ, বেলুন রঙ এবং পিচকারি দিয়ে রঙ উদযাপনের পালা। এর পাশাপাশি শোভা পায় নানা ধরণের টুপি, সানগ্লাস ,মুখোশের হিড়িকে স্টাইল স্টেটমেন্ট।

দোল হোক কিংবা হোলি উৎসবের আনন্দ একটাই ,রঙে একাত্ম হওয়া। অঞ্চল ভেদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন নামে পালিত হয় এই রঙিন উৎসব। বাংলায় দোলযাত্রা, উড়িষ্যায় দোলোৎসব, উত্তর মধ্যভারতে হোলি বা হোরি, গোয়ায় শিমাগা, দক্ষিণ ভারতে কামায়ন নামে সবার কাছে পরিচিত এই উৎসব। হোলি উৎসবটি দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়। পুরাণে দোল বা হোলি উৎসবকে ঘিরে রয়েছে নানান ইতিহাস।

 দোল বা হোলি উৎসবের নেপথ্যে

 দোল হিন্দু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন উৎসব দোল কথাটি এসেছে দোলনা থেকে। পুরাণ অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ-রাধিকার সম্পর্কের মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। রাধা কৃষ্ণের দোললীলা থেকেই দোলের উদ্ভব। ফাল্গুনী পূর্ণিমার এই তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে তার প্রেয়সী রাধারাণী এবং অন্যান্য গোপীদের সঙ্গে আবির বা গুলাল দিয়ে রঙের খেলায় মেতেছিলেন। এই ঘটনা থেকেই দোল উৎসবের সূচনা। ঘটনার মাহাত্ম্য অনুসারে এইদিনে সকালে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধারাণীর বিগ্রহ আবির বা গুলাল দিয়ে স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন গানের মাধ্যমে ভক্তরা শোভাযাত্রা বের করেন এবং পরস্পরকে রঙ মাখিয়ে দেন। ছাড়া কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ নিজের কৃষ্ণবর্ণ ঢাকতে বিভিন্ন রঙ মেখে রাধিকার সামনে হাজির হয়েছিলেন। সেই থেকে উৎসবের শুরু।

এর পাশাপাশি বর্ণনা হিসাবে কথিত আছে, খ্রিস্টজন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে পাথরে খোদই করা একটি ভাস্কর্যে এই উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের প্রাচীন আরিয়ান জাতির কাছ থেকে এই উত্সবের সূচনা মনে করা হয়। তা ছাড়া হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ বেদ পুরাণে রঙের উৎসবের উল্লেখ আছে। ৭০০ শতকের দিকে রাজা হর্ষবর্ধনের সময়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা একটি প্রেমের নাটকেও হোলি উত্সবের বর্ণনা পাওয়া যায়। বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, ৫৩১ বছর আগে এই পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভাব হয়েছিলেন। তাই দোলপূর্ণিমার দিনটি গৌর-পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এসময়ে ভক্তসমাগমে চৈতন্যস্মৃতি বিজড়িত নবদ্বীপ, মায়াপুর চত্তর হয়ে ওঠে রঙিন। হোলি শব্দটি এসেছে হোলক থেকে, হোলক মানে হোলিকা, যার অর্থ হল ডাইনি। রাগ, ক্লেশ অভিমান ভুল ত্রুটিকে দূরে সরিয়ে অশুভকে ধ্বংস করে শুভকে স্বাগত জানানোর নামই হোলি

হোলিকা দহন / ন্যাড়া পোড়া / চাঁচর

'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল' 'পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে বলো হরি বোল'

রঙ উৎসবের আগের দিনে সারা দেশ জুড়ে এক রীতি প্রচলন আছে। যুগ যুগ ধরে হোলিকা দহন-এর মধ্যে দিয়ে রঙের উৎসবকে স্বাগত জানানোর পর্ব চলে। গাছের শুকনো ডাল, পাতা, খড়, কাঠ ,বাঁশ, নানান দাহ্য বস্তু ইত্যাদি দিয়ে একটি উঁচু স্তম্ভ বানিয়ে তাতে হোলিকার প্রতীকী কুশপুত্তলিকায় অগ্নিসংযোগ করে হোলিকা দহন করা হয়। পূর্ণিমার আলোয় সন্ধ্যারাণীর পাহারায় বাংলায় এই একই রীতির সাথে চিৎকার করে বলে ওঠা 'আজ আমাদের ন্যাড়া পোড়া কাল আমাদের দোল,পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে বলো হরি বোল ' আগুনের তিব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে এই উচ্চারিত ধ্বনি। যেন এক উৎসবের বৈচিত্র্য। কখনো হোলিকা দহন, কোথাও ন্যাড়া পোড়ানো, কেউ বা বলেন চাঁচর, আবার কারোর কাছে বুড়ির ঘর পোড়ানো। তবে নামের রকমফের থাকলেও আসলে এটি এক বহ্নি উৎসব। হোলিকা দহন- রয়েছে ইতিহাসের ছোঁয়া।

অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির উত্থানের ইতিহাস।

স্কন্দপুরাণ অনুসারে, দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার আশীর্বাদে অপরাজেয় থাকার বর পেয়েছিলেন।তাই তিনি দেবতার বদলে নিজের পুজোয় বাধ্য করতেন সবাইকে। কিন্তু হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ ছিল বিষ্ণুর ভক্ত। পিতার আদেশ অমান্য করে বিষ্ণুর আরাধনায় মগ্ন থাকত সে। এই দেখে ছেলের উপর ক্ষিপ্ত হন দৈত্যরাজ ।অতঃপর প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য আগমন হয় দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকার কারণ তার ছিল এক মন্ত্রপূত শাল, যা তাকে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করত। সেইমত জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে হোলিকা বিষ্ণুভক্ত প্রহ্লাদকে নিজের কোলে বসিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু আগুন জ্বলে উঠতেই বিষ্ণুর কৃপায় সেই শাল উড়ে গিয়ে ঢেকে ফেলে প্রহ্লাদকে। অগ্নিদগ্ধ হয় হোলিকা। এই দহনের আগুন হল অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রতীক। কাহিনী অনুসারে প্রতিবছর হোলিকা দহনের মাধ্যমে মনের হিংসা,বিদ্বেষকে সরিয়ে ফেলে পরের দিন আনন্দে রঙের খেলায় মেতে ওঠে সবাই। এইভাবে উদযাপিত হয় হোলি উৎসব।

'ওরে গৃহবাসী খোল্ ,দ্বার খোল্ ,লাগল যে দোল '

রঙের উৎসবের কথা আসবে আর শান্তিনিকেতনের কথা হবে না তা কি কখনো হয় ! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাণকেন্দ্র শান্তিনিকেতন। বসন্তের ছোঁয়ায় এখানে রঙিন উৎসব বসন্তোৎসব নামে পরিচিত।

ঋতুরাজ বসন্তের শেষ উৎসব বসন্ত উৎসব। পলাশ শিমুলের রাজত্বে কবিগুরুর সময়কাল থেকেই চলে আসছে বসন্তোৎসবের রীতি। একসময় বসন্তের আগমন উপলক্ষ্যে শান্তিনিকেতনের বিদ্যালয়ে একটি ছোটো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে নাচগান, আবৃত্তি নাট্যাভিনয় করা হত। পরবর্তীকালে এই অনুষ্ঠানটি শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব বসন্তোৎসবে পরিণত হয়। দোলের দিন সকালে প্রভাতফেরির মাধ্যমে বিশ্বভারতীর পড়ুয়াদের নৃত্যের তালে তালে শোভাযাত্রা গৌরপ্রাঙ্গণ চত্বর দিয়ে মূল অনুষ্ঠান মঞ্চে পৌঁছায় তাদের পরণে থাকে বাসন্তী শাড়ি, খোঁপায় পলাশফুল, বাসন্তী পাঞ্জাবি। নারীপুরুষ সবারই কণ্ঠে থাকে রবি ঠাকুরের গান 'ওরে গৃহবাসী খোল্ ,দ্বার খোল্ , লাগল যে দোল ' ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে, পরস্পরকে নানা রঙের আবির মাখিয়ে বসন্ত উৎসবে মেতে ওঠে আবালবৃদ্ধবনিতা। সন্ধ্যায় মুক্তমঞ্চে পূর্ণিমার চাঁদের তলায় রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য নাটক পরিবেশিত হয়। নানা রঙের আবিরে ঢেকে যায় শান্তিনিকেতনের পথঘাট৷ প্রতি বছর বসন্তোৎসবের সময় অসংখ্য পর্যটকের জোয়ারে সরগরম হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন প্রাঙ্গন। রঙের বন্ধনে আবিরের স্পর্শ ছড়িয়ে পরে দেশ থেকে দেশান্তরে।

  রঙের একাল সেকাল

রঙ উৎসবের বর্ণনা একই থাকলেও কালের পরিবর্তনে উৎসবের আনন্দে এসেছে বদল। একসময় দোল উৎসবকে কেন্দ্র করে বনেদি বাড়িতে বসত জলসার আসর সেখানে গানবাজনার পাশাপাশি চলত খাওয়া দাওয়ার রেওয়াজ। বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে নানান রকমের মিষ্টি বানিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা ছিল রীতি।

এখন সে সব অতীত। পালা বদলে এই রঙের উৎসবে বিভিন্ন জায়গাতেই ইদানিং দেখা যায়রেন ড্যান্স’-এর হিড়িক। ড্যান্স ফ্লোরে মনের আনন্দে সঙ্গীদের সঙ্গে, কখনো পরিবার বা বন্ধুবান্ধবদের সাথে ভিজে ভিজে নাচের হুল্লোড়ে চলে রঙের বাহার। আনন্দের জোয়ারে নতুন সংযোজন হোলি পার্টি। নাচে গানে ,আমোদ প্রমোদে জমে যায় রঙের উৎসব।

দোল বা হোলির গান

উৎসব মানেই গানের আবরণ। তাই হোলি স্পেশাল গান ছাড়া অসম্পূর্ণই থেকে যায় দোল বা হোলির দিন। হোলির জমজমাটি গান মানেই রঙের বাহারে এক আলাদা জৌলুস। অপর্ণা সেনের ঠোঁটে 'খেলবো হোলি রঙ দেবনা ' কিংবা অমিতাভের গলায় 'রঙ বরসে ভিগে চুনারবালি' হোক অথবা 'ইয়ে জাওয়ানি হ্যায় দিওয়ানী' ফিল্মে রণবীর-দীপিকার ঠোঁটে 'বলম পিচকারি' মত এরকম হোলি স্পেশাল গানের ছন্দে রঙ বাহারের মেজাজ থাকে জমজমাট।

বসন্ত এসেছে দুয়ারে দুয়ারে চারিদিকে বইছে প্রেমের বাতাস। আর প্রেম মানেই ভালোবাসার রঙ। রঙের উৎসবে ভালোবাসা মিশে যায় পরশে পরশে। রঙের দুনিয়ায় নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে আপন রঙে রাঙিয়ে তোলার আনন্দ এককথায় রঙের উৎসব।

নাচে গানে আন্তরিকতায় পরস্পরকে কাছে পাওয়ার আনন্দই হল রঙের উৎসব। আর এই উৎসবকে ঘিরে থাকে ভালোবাসার আদানপ্রদান। তাই বসন্তের আমন্ত্রণে সাড়া দিতে আসছে রঙের উৎসব। আবারো রঙ সাগরে ডুব দিতে অপেক্ষারত দেশবাসী।

 

NewsDesk - 2

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news