তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং নান্দনিক সুষমায় রবীন্দ্র দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন দ্যুতিময়ঃ - Newsbazar24
সাহিত্য

তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং নান্দনিক সুষমায় রবীন্দ্র দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন দ্যুতিময়ঃ

তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং নান্দনিক সুষমায়  রবীন্দ্র দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন দ্যুতিময়ঃ

 

ঃতাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং নান্দনিক সুষমায়  রবীন্দ্র দর্শন ও বৌদ্ধ দর্শন দ্যুতিময়ঃ

ডক্টর রাধা গোবিন্দ ঘোষ                                                                                  

                                                                                     অনুলিখনঃ কার্ত্তিক চন্দ্র পাল

 

বুদ্ধ দর্শন এবং রবীন্দ্র দর্শন দুটি দর্শনই সমুদ্র গভীরে তত্ত্বে ভাস্কর।  ব্যক্তিসত্তায়, জীবনমুখী অভিজ্ঞতায়     এবং  জীবনদর্শনে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য যেমন আছে, বৈশাদৃশ্য তেমনি অপ্রচুর নয়। দুজনেরই জন্ম বৈশাখ মাসে। দুজনেই ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। দুইজনেই সপুত্রক পিতা।দুজনেই মহামানব । কিন্তু দুজনেরই   জন্মের কালের বিস্তর ব্যবধান। সাধন ধর্মের অন্তর্গুঢ়  বিশিষ্টতায় বৌদ্ধ দর্শন ব্যাঞ্জিত,  পক্ষান্তরে জীবন ধর্মের নিকষ উপলব্ধিতে রবীন্দ্র দর্শন আলোকিত। মহাজাগতিক কাল চেতনার প্রজাময়  আবেগের  অনুভব এবং নান্দনিকতার উৎসব রবীন্দ্র জীবন সাধনা কে বাস্তবিকই মনোময় করে তুলেছে।  অপরপক্ষে রৌদ্রদগ্ধ তপস্যার আড়ালে মাধুরী মঞ্জুরীর গুঞ্জনধ্বনি এবং স্মৃতিজাগামিয়া দীর্ঘশ্বাস যেন  বিস্ময়কর  ভাবে অশ্রুত বৌদ্ধদর্শনে।  বুদ্ধদেব এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই লোকান্তর প্রজার অধিকারী।দুই দর্শনে  আছে জীবনধর্মের গাঢ়  উপলব্ধিতে  অবগাহ বিস্তার।  অন্তর্গুঢ় উপলব্ধির বিস্মরণহীন চিরায়মানতা  যেন দুই দর্শনকেই  গভীর দার্শনিকতা নন্দিত করেছে।  সূর্য চন্দ্র গ্রহ তারকা সমন্বিত সুন্দর ধরনীতে জন্মগ্রহণ করে দুজনেই যেন নিখিল বিশ্বের অন্তলীন সম্পর্কের ইতিহাস উন্মোচন করতে চেয়েছেন।  রবীন্দ্রনাথ মূলতঃ  কবি।  আবার সংগীতের রচয়িতা হিসেবে জীবন ধর্মের গাঢ় উপলব্ধইতে  তিনি যেভাবে প্রতিভাত, বুদ্ধদেবের জীবনে সে পরিচয় মেলে না।  রবীন্দ্রনাথ গৌতম বুদ্ধ কে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ বলে শ্রদ্ধা  জানিয়েছেন,  কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে স্বীকার করেননি।  বুদ্ধদেব সংসার ত্যাগ করে আলাড়   কালাম এবং রামপুত্র উদ্দক নামে দুজন গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সংসার ত্যাগ   করেননি। রবীন্দ্রনাথ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীত্য সমুৎপাদ, যোগাচার, মহাযান, সহজযান,  কালচক্রযান, মন্ত্রযান ,বোধিসত্ব ধারনা, নির্বাণ তথ্য,  মৈত্রী,  করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা,  ব্রহ্মবিহার মহাশূন্য, জগত, চুরাশি,  চতুরার্যসত্য  মধ্যমপন্থা প্রভৃতি ও স্বরুপ সম্বন্ধে অবহিত ছিলেন।  বুদ্ধদেবের প্রতি তার শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম।  তার প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেছিলেন “বৌধিদ্রু মত্তলে তব সেদিনের মহাজাগরণ  আবার সার্থক হোক,  মুক্ত হোক মোহ আবরণ,  বিস্মৃতির  রাত্রি শেষে এ জগতে তোমারে স্মরণ নবপ্রাতে উঠুক কুসুমি”(“পরিশেষ” বুদ্ধের প্রতি)। রবীন্দ্রনাথের কবিতা এবং নাটকে বৌদ্ব শ্রস্নগের উল্লেখ খুজে পাওয়া দুস্কর নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘শ্রেষ্ঠভিক্ষা’, ‘পূজারিণী’,’পরিশোধ”,’অভিসার’, ‘মূল্যপ্রাপ্তি’, ‘সামান্য ক্ষতি’ প্রভৃতি কবিতা এবং  রাজা, অচলায়তন, নটীর পূজা, চণ্ডালিকা, শ্যামাও  মালিনী প্রভৃতির নাটক নাটিকায় বৌদ্ধ প্রসঙ্গ আছে।  ‘মালিনী’ নাটকের উপাদান মহাবস্তু অবদান থেকে গৃহীত।  বুদ্ধদেবের প্রেম এবং করুণার বাণী মালিনীতেও রুপ লাভ করেছে।  বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ধর্মদর্শের  এর মূল পার্থক্য  নির্বাণ তত্ত্বে।  বুদ্ধদেব মুক্তির কথা বলেছেন কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সংসার থেকে মুক্তি চান নি। তিনি বলেছেন  “বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয় অসংখ্য বন্ধন মাঝে মহানন্দময় লভিব মুক্তির স্বাদ”।  রবীন্দ্রনাথ প্রেমের বন্ধন এর কথা বলেছেন। প্রেমেই আছে পূর্ণতা।  বুদ্ধদেব বলেছেন জগত দুঃখময়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন জগত আনন্দময়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন দুঃখ-সুখের বিপরীত কিন্তু আনন্দের বিপরীত নয়। বরং  আনন্দের পরিপূরক।  বুদ্ধদেব বলেছিলেন মানুষ দৈবাধীন হীন  পদার্থ নয়।  রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মানব ধর্মে বিশ্বাসী, মৈত্রী ধর্মের উপাসক । আষাঢ়ী পূর্ণিমা বুদ্ধদেব ধর্মচক্র প্রবর্তন করেন। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথও  ধর্মচক্র প্রবর্তন করেছিলেন। সুত্তুমিপাতে বুদ্ধদেব বলেছেন, “ সর্বে সত্তা সুখিতা হন্তু, অবেরা হন্তু, অব্যাগজঝা হন্তু, সুখী অত্তানাং পরিহরন্তু”।(সমস্ত প্রাণী সুখী হোক, শত্রুহীন হোক অহিংসিত হোক,   সুখী আত্মা হয়ে কালহরণ করুক )। বুদ্ধদেব যেখানে ত্রিতাপ দুঃখের হাত থেকে নিষ্কৃতি দানের কথা বলেছেন,  সেখানে রবীন্দ্রনাথ দুঃখের বীজকে  বিধ্বস্ত করে আনন্দময় চেতনাকে সঞ্জীবিত করে তোলার কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে  জীবনের মতই ভালোবেসেছেন। “প্রভাত সঙ্গীতে” তিনি বলেছেন  “জীবন   তোমার এত ভালবাসি বলে হয়েছে প্রত্যয় মৃত্যুরে এমনই ভালবাসি নিশ্চয়”। বৌদ্ধ ধর্ম চীন, কোরিয়া, জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব সিংহল, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আফগানিস্তানে বিস্তার লাভ করে।  পক্ষান্তরে সারা বিশ্বজুড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কবি খ্যাতি বিস্তৃত। দুঃখ মানব জীবনের অনিবার্য দুর্ভাগ্য।  জগতে দুঃখ অবশ্যম্ভাবী। রবীন্দ্রনাথের গানে  নানাভাবে এই দুঃখের প্রসঙ্গ এসেছে।  যেমন ১)দুঃখ যে তোর নয় চিরন্তন (পূজা ৩১২),২) আছে দুঃখ আছে মৃত্যু(পূজা ২৪৮)  ৩)দুঃখের তিমিরে যদি(পূজা১৯৩), ৪)  দুঃখের বেশে এসেছে বলে(পূজা ২৩৩) ৫) সহসা দারুন  দুঃখতাপে(পূজা ৫৭২) ৬) দুঃখ দিয়েছো,  দিয়েছো  ক্ষতি নাই(পূজা ২৩২) প্রভৃতি।   বুদ্ধদেব বলেছেন “সব্বং অমিচ্চং/ “সব্বং দুখং/ “সব্বং অনন্তং(সমযুক্ত নিকায়,১৪)। বুদ্ধদেব বলেছেন দুঃখ আসে তৃষ্ণা থেকে। তাই তৃষ্ণা'র মূলে কুঠারাঘাত করতে হবে। বুদ্ধদেব ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জীবনের বৃহত্তম অংশে ঈশ্বর বিশ্বাসী ছিলেন।

গ্রন্থ ঋণঃ (১) পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্র সংখ্যা-১৪০৩  (২)ধর্মময়  ভারত- ডঃ প্রীতি মাধব রায়।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news