ক্ষয়িষ্ণু হিজলবন জাতীয় লেক হোক। - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

ক্ষয়িষ্ণু হিজলবন জাতীয় লেক হোক।

ক্ষয়িষ্ণু হিজলবন জাতীয় লেক হোক।

ক্ষয়িষ্ণু হিজলবন জাতীয় লেক হোক

         সুনীল কুমার সরকার

গর্ববোধ হয় , এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হিজলবনটি মালদা জেলার হবিবপুর ব্লকের সিঙ্গাবাদ-তিলাসনে , বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা। বৃহত্তম হিজলবনটি বাংলাদেশের 'হাকালুকি'তে । রবীন্দ্রনাথ , শরৎচন্দ্র বিভূতিভূষণদের লেখায় গ্রামীণ বাংলার চিত্র অঙ্কনে বার বার হিজল , তাল , তমাল , বট , পিটুলি ,পলাশ , মাদার'দের কথা এসেছে । এসেছে জীবনানন্দের কবিতায় , হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানে। জীবনানন্দের 'চলে যাব শুকনো পাতা-ছাওয়া ঘাসে , জামরুল হিজলের বনে...' আমাদের মন শান্ত করে। নির্জন হিজলবন মৌনমুখর , নিচুজমিতে এই বন , বনভূমি জলে ভরলে সবুজে ভরে হিজলের মাথা ,  জলাভূমির জলে হিজলের সবুজ-মাথা ছায়া ফেলে , অপরূপ দৃশ্য ! হিজলগাছ-হিজলবন মানেই এক শান্ত-স্নিগ্ধ গ্রাম বাংলার আপন চিত্র । জলে নিমজ্জিত থাকলেও বেঁচে থাকে , নিচে জল ওপরে গাছ , ঝরে পড়া রঙিন ফুল জলের উপর বিছিয়ে থাকে । হিজলের ফুল খানিক অর্কিড-এর মতো , গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে , ৩০-৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ঝোলা ফুলের লতা । জলে ভাসতে ভাসতে গিয়ে হিজলের বীজ চারিদিকের জলায় চারা তৈরি করে , বন ছড়িয়ে দেয় নিজে নিজেই , বাড়তে থাকে বন । এই জলের বনকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে সোয়াম্পি ফরেস্ট । মালদার বনটি মিষ্টি জলের বাদাবন ।

এই হিজলের কতই না নাম ! জ্বলন্ত , নদীক্রান্ত , কুমিয়া , কর্মক , দীর্ঘপত্রক , সংস্কৃতে নিচুল , ইংরেজিতে ইন্ডিয়ান ওক । হিজলের শিকড় , ডাল ,পাতা , ছাল সবই ভেষজ । মূলত পেটের অসুখে কাজ দেয় । ইতিহাসে দেখা যাচ্ছে , হবিবপুরে একসময় ছিল বিস্তৃত ঘনবন । ১৮১০ সালে সার্ভেয়ার ফ্রান্সিস বুকনন হ্যামিলটনের সমীক্ষায় এখানে বিস্তৃর্ণ জল-জঙ্গলের কথা পাওয়া যায় । ১৮৭৬ সালে ডাবলু ডাবলু হান্টারের বর্ণনায় , টাঙ্গন ও পুনর্ভবা বেসিনে ১৫০ বর্গমাইল কাঁটা জঙ্গলের উল্লেখ আছে ; সেখানে বাঘ , গন্ডার , চিতা থেকে হায়না , বুনোশুয়োর , বুনোমহিষ , বড় হরিণ থেকে চিতল হরিণ সবই ছিল। তখন পশুশিকার বিরোধী কোনও আইন বা কড়াকড়ি ছিলনা , তথ্যে দেখা গেছে লর্ড কার্জন থেকে ডিউক অব এডিনবরা এখানে শিকারে এসেছেন । ১৯১৪ সালসহ পরের জেলা-গেজেটগুলিতে উল্লেখ আছে এই হিজল বনের । ১৯৫৬ এবং ১৯৫৯ সালের দুটি সরকারি আদেশনামায় এই জল-জঙ্গল-বাস্তুতন্ত্র্যকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বনাঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেয় । আজ থেকে ৪০ বছর আগেও এই হিজলবনের আয়তন ছিল ১০ বর্গ কিলোমিটার  , কিন্তু বর্তমানে বিএলআরও-রেকর্ড অনুযায়ী বনের আয়তন ছোট হয়ে দাঁড়িয়েছে ৪০০ হেক্টরের মত । পরিবেশকর্মীরা চিন্তিত ও আতঙ্কিত , আমরা তো সৃষ্টি করিনি তবে ধ্বংসের অধিকার কোথা থেকে পেলাম , কেন আজ ধ্বংসের পথে এই সুপ্রাচীন ও সুপ্রসিদ্ধ হিজলবনটি !

 একটু খতিয়ে দেখি কতটা কী হারালাম । খুব কমই গবেষণা হয়েছে এই বাদাবন নিয়ে , অতীত ছেড়ে দিলেও এখনো অত্যন্ত সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আছে । এই জলাভূমি-বনাঞ্চলে কয়েক বছর আগে একটি সার্ভেতে দেখা গেছে ২২৪টি প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। বাস্তুতন্ত্র্যের অভিনব বৈচিত্র্য দেখা যায় , ছোট ছোট ইকোসিস্টেম আছে , আকারে ছোট কিন্তু জীববৈচিত্র্যের নিরিখে অতি ব্যাপক। এই বনাঞ্চলে জলাভূমির ইকোসিস্টেম আছে , আধা-জলাভূমির(ইন্টারফেস) ইকোসিস্টেম আছে , আবার স্থলভূমির ইকোসিস্টেমও আছে । বাদাবনের বেশিরভাগ অংশ মাস ছয়েক জলে ডুবে থাকে , শ্বাসমূল নেই তবুও কীভাবে মূলগুলি শ্বাস নেয় , বিষয়টি অনুসন্ধানের ।  সাধারণত বাদাবন পর্ণমোচি হয়না কিন্তু এই হিজলবন পর্ণমোচি , হিজল পর্ণমোচি অথচ জলে ডুবে থাকে---বিষয়টি ইন্টারেস্টিং । সবটা মিলিয়েই এই হিজলবন গবেষণার এক বড় ক্ষেত্র। প্রসঙ্গত এলাকাটি প্রায়-মালভূমি বরিন্দ-এ অবস্থিত হওয়ায় এমনিতেই জল-স্তর নীচে , আর বর্তমানে ব্যাপক হাইব্রিড(ধান) চাষ হওয়ায় জলস্তর অনেকটাই নীচে নেমেছে । স্বাভাবিকভাবেই বাদাবনটি বেশ জলকষ্টে ভুগছে !

এখন গাছের গোড়ায় মাটি নেই , দেখা যায় এলোমেলো গাছ উপড়ে পড়ে আছে , গাছের মাথার ছাতা কাটা , ডাল ছাঁটা , ন্যাংটো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । দেশ-বিদেশের পরিযায়ী পাখিরা আর আসে না । বিশ্বে সার্বিকভাবে জলাভূমি কমে যাওয়ায় জলাভূমিকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য কমে আসছে , এই জীববৈচিত্র্য বাড়িতে সংরক্ষণ সম্ভব নয়। এরই মধ্যে মালদার বাদাবনে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে ! সচেতন স্থানীয় মানুষ বনটি রক্ষায় উদ্যোগী হলেও অসচেতন মানুষই তো বেশি ! মানুষের চোখের সামনে দিনের আলোয় , শুধুমাত্র  উদাসীনতা-অবহেলা-অসচেতনতায় এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম হিজলবন আজ ধুঁকছে ! দূষণ বাড়ছে , অক্সিজেন কমছে , ২০২০-র মার্চ মাস থেকে চলা করোনা-অতিমারি দেখিয়ে দিল , অনিবার্য শ্বাসকষ্টে অক্সিজেনের মূল্য কতটা !

কিছুবছর আগে বনদপ্তরের একটি ছোট অফিস ছিল , সেই অফিসটিও উঠে গেছে ! কিন্তু এই বনাঞ্চলকে কোনোভাবেই নষ্ট হতে দেওয়া যায়না। বনাঞ্চলসহ প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জনগণকে যুক্ত করতে পারলে বনাঞ্চল রক্ষার সার্বিক খরচ কমে যায় । এই হিজলবন একটি প্রটেক্টেড ফরেস্ট (প্রটেক্টেড এরিয়া নয়) , এখানে আইনত জনগণের অংশগ্রহণ সম্ভব । স্থানীয় মানুষের সঙ্গে খানিক রিসোর্স শেয়ারিং করতে হয় আর শেয়ারিং না হলে কেয়ারিং কি করে হবে ! নন টিম্বার ফরেস্ট প্রডিউস অর্থাৎ এই জলা-জঙ্গলের মাছ , ঘাস , জ্বালানি প্রভৃতি সংগ্রহের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষকে সুযোগ দিলে স্থানীয় মানুষ বনের সুরক্ষায় এগিয়ে আসবে । স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে ফরেস্ট প্রোটেকশন কমিটি থাকলেও সফল হচ্ছে না , এই প্রক্রিয়ায় সরকারি হস্তক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজন , স্থানীয় ফরেস্ট অফিস আবারও চালু হওয়া দরকার।   অবৈজ্ঞানিকভাবে এই বনাঞ্চলে ইউক্যালিপটাস , আকাশমনির মতো গাছও লাগানো হয়েছে । অন্য প্রজাতির গাছ এখানে লাগানো উচিত নয় , প্রাকৃতিকভাবে যে প্রজাতি জন্মায় তাই লাগাতে হবে , অন্য গাছ নয় , তাহলেই বন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে । পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীরা ও দু'একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা মাঝে মাঝে এলাকায় গিয়ে , স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করে সত্যি। পাশাপাশি নজরদারি রাখা দরকার , এই বাদাবনটি কোনভাবেই এনক্রোচ না হয় । ইকো ট্যুরিজম শুরু হলে একদিকে স্থানীয় মানুষের খানিক আয় বাড়ে অপরদিকে টুরিস্টদের মধ্যে সচেতনতা আসে যা স্থানীয় মানুষকেও আলোকিত করতে পারে। বনাঞ্চলটির প্রচারে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃতি-পর্যবেক্ষণে নিয়ে এলে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একদিকে সচেতনতা বাড়ে আরেকদিকে এই ছাত্রছাত্রীদের কিছু অংশ ভবিষ্যতে বনাঞ্চল সুরক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে , প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে।

অপরদিকে রবীন্দ্র সরোবর ,সাহেববাগ , মিরিকসহ রাজ্যে চারটি ন্যাশনাল ইম্পর্টেন্স লেক আছে । এই চারটি লেকের জলাভূমির আয়তন হিজলবনের জলাভূমির চেয়ে ছোট , অপরদিকে এই বাদাবনের বায়ো ডাইভারসিটি অন্যগুলির তুলনায় অনেক সমৃদ্ধ । বাদাবনটিকে জাতীয় লেক হিসেবে ঘোষণা করলে সরকারি অর্থের যোগান আসবে ফলে জলাভূমিকেন্দ্রিক এই বনটির রক্ষণাবেক্ষণসহ উন্নতি সাধন হবে । এই জলাভূমি ও বনভূমি কার্বন শোষণ করে , নাইট্রোজেনের উপযুক্ত লেভেল বজায় রাখে--- স্বাভাবিকভাবেই জলবায়ু পরিবর্তনের খারাপ প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলিকে কাজে লাগিয়ে এক বছরব্যাপী বায়ো ডাইভারসিটি ,  ইকোসিস্টেমের স্টাডি করে স্টাডি রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে দিলে এই আলোচিত লেকটি জাতীয় লেক হিসেবে ঘোষণা পেতে পারে , বিজ্ঞান মঞ্চ এই দাবীই করে আসছে দীর্ঘদিন ।

                       ----------------------

তথ্যদাতাদের ঋণ স্বীকার করি 

সুনীল কুমার সরকার

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news