ধর্ম কথা

কেন কুমারী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যমত শ্রেষ্ট পূজা যা দূর্গা পূজার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত ?

কেন কুমারী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যমত শ্রেষ্ট পূজা যা দূর্গা পূজার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত ?

কেন কুমারী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যমত শ্রেষ্ট পূজা যা দূর্গা পূজার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত ?

উদয় শংঙ্কর চক্রবর্তীঃ  কুমারী পূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যমত শ্রেষ্ট পূজা যা দূর্গা পূজার অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত। কুমারী পূজা সম্পর্কে ভক্তদের জানার সুযোগ খুব কম। অনেকেই জানে না কুমারী পূজা কী এবং কী তার রহস্য। সাধারণত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে কুমারী পূজা করে থাকে। প্রথমে দূর্গা পূজায় কুমারী পূজার নিয়ম বহাল থাকলেও পরবর্তীতে এ পূজার প্রচলন একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী বিবেকানন্দ এর পুনঃপ্রচলন করেন বেলুর মঠে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যাকে মহাশক্তিরূপে পূজা করেছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দ যাকে মা ভগবতীর জীবন্ত বিগ্রহ মনে করতেন তিনি পরম পূজানীয়া শ্রী শ্রী মা সারদা দেবী।
কুমারী পূজা সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে বেশ কৌতূহল দেখা যায়। বালিকা প্রতিমায় মহামায়ার পূজা ঈশ্বরের মাতৃভাবে আরাধনার ফলিতরূপ বলা যায় অগ্নি এবং তার দাহিকাশক্তি যেমন অভিন্ন সে রকম ঈশ্বর এবং তার শক্তি অভিন্ন ঈশ্বর করুণাময় সর্বশক্তিমান এবং তাঁর শক্তি সর্ব শক্তিময়ী । শ্রীরামকৃষ্ণ এই শক্তিকে মা বলতেন, আর সকলে এই সত্তাকে ঈশ্বর বলে থাকে।

নারী জগদ্ধাত্রীর অংশ বিশেষ সমগ্র বিশ্বে-তিনি মহামায়ারূপে প্রকাশিতা। প্রত্যেক নারীকে মাতৃভাবে ভাবনা মহামায়ার শ্রেষ্ট উপাসনা এবং নারী মর্যাদার সর্বোচ্চ বিধান। এখানে মানুষে ঈশ্বর বোধ আরোপিত। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন- কুমারী পূজা করে কেন ? “সবস্ত্রী লোক ভগবর্তীর এক একটি রূপ শুদ্ধাতœা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশইনিই আমাদের মা।
ঈশ্বরের অনন্তভাব মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনাও তাঁর বৈচিত্রময় আরাধনার একটি রূপ মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনার পরাকাষ্ঠা তখনই যখন সকল নারীতে মাতৃভাব উপলব্ধি হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাষান্তরে ঈশ্বরের স্থিরতা ও দুরবর্তী অবস্থান যেন স্থির চুম্বক ও দূরবর্তী ছুচের কম্পমান অবস্থা তার শক্তি সর্বভূতে ক্রিয়াশীল এই শক্তি মাতৃরূপে আবির্ভূতা অগ্নি ও দাহিকা শক্তির অভিন্নতার মতো তাই তিনি বলেছেন- মাতৃভাব সাধনার শেষ কথাশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বলেছেন-মাতৃভাব বড় শুদ্ধভাব। কুমারীর মধ্যে দৈবীভাবের প্রকাশ দেখা বা তাকে জননীরূপে পূজা করা সেই শুদ্ধ সত্ত্ব ভাবেই এক সামর্থ প্রকাশ। দূর্গা পূজায় কুমারী পূজার অনুষ্ঠান তারই শাস্ত্রীয় ও বাস্তবায়িত রূপ।
স্বামী বিকেকান্দ শিকাগোয় বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যোগদান উপলক্ষে আমেরিকায় গিয়ে সেখানকার নারী স্বাধীনতা দেখে মুগ্ধ হয়। নারী-পুরুপ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মহান সব কর্মকান্ডে অংশ নিচ্ছে এ যেন কোন দেশের পক্ষে এক অকল্পনীয় দৃশ্য এই দেখে স্বামীজী সংকল্প করলেন দেশে ফিরে মাতৃজাতিকে স্ব-মহিমায় প্রতিষ্ঠার কাজে আরও বস্তুনিষ্ঠ ভাবে ব্রতী হতে হবে। রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠার পরে তিনি এই ব্রত পালনে উদ্যোগী হন। তারই ফলশ্রুতি হচ্ছে কুমারী পূজার পুনঃপ্রচলন আজকের কুমারী ভবিষ্যতের জননী তাই তারা আমাদের নমস্য. শ্রদ্ধার পাত্রী এটাই কুমারী পূজার প্রতিপাদ্য কুমারী পূজা পূণ্যজন্ম করে স্বর্গ প্রাপ্তির লক্ষ্যে আরাধনা নয়; বরং নারীর মার্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে পৃথিবীকে স্বর্গরাজ্যে পরিণত করার প্রয়াস।

মহান সাধক শ্রীরামকৃষ্ণ নারীকে  মাতৃ শক্তি রূপে পূজা করে ছিলেন। আহবান করেছিলেন বিদ্যা শক্তিকে জগতের কল্যানের জন্য। তারই পথ ধরে স্বামী বিবেকান্দ কুমারী পূজার প্রবর্তন করেন স্বামী বিবেকান্দ আজীবন ছিলেন নারীর মর্যাদা আর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার।
স্বামীজীর ভাষায়-
শত শত যুগ ধরে মানসিক, নৈতিক ও দৈহিক অত্যাচারের কথা যাহাতে ভগবানের প্রতিমা স্বরূপ মানুষকে ভারবাহী গর্দভে এবং ভগবতীয়র প্রতিমা-স্বরূপা নারীকে সন্তান ধারণ করবার দাসী স্বরূপা, অধম, হেয়, অপবিত্রতার ফলে আমরা পশু, দাস উদ্যমহীন দরিদ্র। বাংলাসহ তদান্তীন্তন ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে ঘরে বাইরে নারীর অমর্যাদা তার হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলে ছিল।

 

কুমারী পূজা হচ্ছে ধর্মীয় সৌরভে নারী জাতির মর্যাদা সমুন্নত করার সামাজিক আন্দোলন। স্বামীজীর এই কর্মটি তার গুরু ভক্তির নিদর্শন স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ যে তাকে জিতেন্দ্রিয় বলে অবিহিত করেছিলেন।
স্বামী বিবেকানন্দের মাতৃ বন্দনা বা পূজার সর্বশ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত বোধ করি শ্রী মা সারদা দেবীকে শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্খ জননীরূপে অধিষ্ঠিতা করে তাঁকে জগজ্জননী জ্ঞানে জ্যান্ত দূর্গাবলে বন্দনা করা। মা-ঠাকুরণ কি বস্তু বুঝতে পারনি এখানো কেহই পায় না ক্রমে পারবে শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না। আমাদের দেশ সকলের অধম কেন ? শক্তির অবমাননা সেখানে বলে মা-ঠাকুরানী ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছেন। তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী, মৈত্রয়ী জগতে জন্মাবে ক্রমে সব বুঝবে। স্বামীজী শ্রীমাকে কেন্দ্র করে ভারতে স্ত্রী শিক্ষা আন্দোলনের কথাই বলতে চেয়েছেন। পরবর্তীকালে ভগিনী নিবেদিতার মাধ্যমে যার সার্থক সূচনা।

 

আদিকালে দূর্গা পূজায় কুমারী পূজা প্রচলন থাকলেও অনেকেই এই কুমারী পূজা। সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতেন না । স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম বেলুর মঠে কুমারী পূজার পুনঃ প্রচলন করেন। স্বামীজীর এই কুমারী পূজা করা বিষয়ে কিছু আশ্চর্য কাহিনী জানা যায় তাঁর মানস কন্যা নিবেদিতাসহ আরও কয়েক জনকে নিয়ে কাশ্মীর ঘুরতে গিয়ে তিনি এক মাঝির শিশু কন্যাকে কুমারী পূজা করেন। যা দেখে নিবেদিতাসহ তার অন্যান্য পাশ্চত্য শিষ্যরাও বিস্মিত হন। পরিব্রাজক অবস্থায় বিভিন্ন সময়ে তার আরও কিছু শিশু কন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করার কথা জানা যায় সর্বশেষে বেলুর মঠে প্রথম দূর্গা পূজায় (১৯০১ সালে) নয়জন কুমারীকে পূজা করা এবং তাদের মধ্যে একজনকে নিজেই পূজা করেন। মোট কথা মাতৃ ভাবময় শ্রীরামকৃষ্ণ শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ কোনো উচ্চকোটির মহামানব ছিলেন। এখন কুমারী পূজা সম্পর্কে আমরা সাধারণত জানি যে গিরিরাজ বাহিমালয় কন্যা অসুরদের বিনাশ করতে এসেছিলেন মহিষাসুর নিধন এবং ভক্তদের দুঃখ কষ্ট দূর করতে পৃথিবীতে দূর্গার আগমন। মা দূর্গা শিবকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নিয়ে কৈলাসে ঘর সংসার পেতেছেন। প্রতিবছর শরকালে ছেলে-মেয়ে নিয়ে মা দূর্গা আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে চারদিনের জন্য তাঁকে বাবার ঘরে অর্থা পৃথীবীতে আসতে হয়। ভক্তদের পূজা গ্রহণ করার জন্য এই চার দিনের একদিন তাঁকে কুমারী রূপেও পূজা করা হয়। জলজ্যান্ত একটি কুমারীকে প্রতীক হিসেবে বসিয়ে মা হয়েও তিনি কি করে কুমারী হলেন ? দেবীর কুমারী নাম অতি প্রাচীন। হে দূর্গা তুমি কন্যা ও কুমারী সে জন্য তোমাকে ধ্যান করি । তুমি আমাদের শুভকাজে প্রেরণা দাও তন্ত্রসারে ১ থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত ব্রাক্ষ্মন বালিকাদের কুমারী পুজার জন্য নির্বাচিত করা যেতে পারে । অন্য জাতি কন্যাকেও কুমারী রূপে পূজা করতে বাধা নেই। কুমারী মাত্রই সর্ববিদ্যা স্বরূপা এক-এক বছরের কুমারীদের এক-এক রকম নাম। নাম গুলো নিন্মরুপ ঃ

এক বছরের কন্যাকে বলা হয় সন্ধ্যা
দুবছরের কন্যাকে সরস্বতী
তিন বছরের কন্যা ত্রিধামূতি
চার বছরের কন্যা কালিকা
পাঁচ বছরের কন্যা সুভগা
ছ বছরের কন্যা উমা
সাত বছরের কন্যা মালিনী
আট বছরে কন্যা কুব্জিকা
নয় বছরের কন্যা কাল সন্দর্ভ
দশ বছরের কুমারীকে অপরাজিতা
এগারো বছরের কুমারীকে রুদ্রানী
বারো বছরের কুমারীকে ভৈরবী
তের বছরের কুমারীকে মহালক্ষী
চৌদ্দ বছরের কুমারীকে পীঠ নায়িকা
পনেরো বছরের কুমারীকে ক্ষেত্রজ্ঞ
ষোল বছরের কুমারীকে অম্বিকা

শ্রী শ্রী দূর্গাদেবীর মহাষ্টমীর পূজা শেষে কুমারী পূজা হয়ে থাকে।

কুমারী পূজার বিধি সম্পর্কে তন্ত্রে দেবাদিদেব মহাদেব মহাদেবীরকে লক্ষ্য করে বলেছেন- হে সুন্দরী শত কোটি মুখে সহস্্র কোটি জিহবায় কুমারী পুজার ফল ব্যক্ত করতে পারবো না। হে শিবে; কুমারী পুজায় জাতিভেদ নেই, সর্বজাতীয়া কুমারী গণেরই পূজা করা যায়।
কুমারী পূজায় জাতি বিচার করলে নরকে যেতে হয়। তার আর উদ্ধার হয় না। মন্ত্রবান ব্যক্তি অবিচারিত কাজ করলে পাপী হয়ে থাকে। অতএব মহাভক্তি সহকারে দেবীজ্ঞানে কুমারী পুজা করা কর্তব্য কুমারী সর্ববিদ্যা স্বরূপা সন্দেহ নাই। একজন কুমারীকে পূজা করলে সব দেব-দেবীর পূজা করা হয়।
হে দেবী যদি ভাগ্য বশে বেশ্যকুলসমুদ্ভবা কুমারী প্রাপ্ত হওয়া যায় তাহলে সাধক ব্যক্তি তাঁকে স্বর্ণ- রৌপ্যাদি স্বর্বস্ব প্রদানপূর্বক যন্ত সহকারে অর্চনা করবে। এই পূজাতে সাধকের মহাসিদ্ধি লাভ হয় এবং সে সদা শিবতুল্য হয়ে থাকে সন্দেহ নেই।
শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের উপলব্ধি-
তিনি সব হয়েছেন তবে মানুষে তিনি বেশি প্রকাশ শেষে এই বুঝেছি তিনি পূর্ণ আমি তার অংশ তিনি প্রভু আমি তার দাস। আবার এক-একবার ভাবি তিনিই আমি আমিই তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সাধন জগতের বিরাট তথ্যের দ্বার উন্মোচন করছেন। একদিকে পরমাত্মা পরমেশ্বর এবং তার অনন্ত বৈচিত্রময়ী শক্তির খেলা এই জগ প্রপঞ্চ বা প্রকৃতি আছে একদিকে আর একদিকে সেই প্রকৃতির প্রভাবাধীন মানুষ এই উভয়ের মধ্যে ঘাত প্রতিঘাত চলছে। মানুষের চিন্তা ঘড়ির দোলক বা পেন্ডুলামের মতো এই দুয়ের মধ্যে সর্বদা দোলায়িত। পরমেশ্বরের মহিমা প্রকৃতির বুকে নিত্য নতুন রূপে প্রকাশিত মানুষ তাতে ভীত ও বিস্মিত। তার মানুষ অন্তর মুখী হয়ে নিজের ভিতর প্রবেশ করে দেখলো সেই অনন্ত শক্তিমান পরমবক্ষ্ম বা পরবক্ষ্মময়ী তারই ভিতর বিরাজিত জীব ও জড় স্তরের পৃথক বিকল্প আলদা কিছু অস্তিস্ব নেই। তিনিই আধার তিনিই আধেয় স্বামী বিবেকানন্দের উপলব্ধিতে প্রকাশ পেয়েছে। আমি এতো তপস্য করে এই সার বুঝেছি যে, জীব জীবে তিনি অধিষ্ঠান হয়ে আছেন।
তাছাড়া ঈশ্বর ফিশ্বর আর কিছুই নেই। সাধনা লব্ধ এই সুগভার তত্ত্ব হতেই কুমারীকে বিশ্ব মাতৃকার অবস্থান উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। বিশ্ব মাতৃকার এই ভাব প্রবাহে সাধক নিজ অহংকে বিসর্জন দিয়ে মাতৃক্রোড়ে নিজেকে আবিস্কার করেন। অমৃতের সন্তানরূপে।
এই কুমারী পূজার রীতি থেকেই সম্ভবত একদা বাংলাদেশে গৌরীদান প্রথা এসেছিল।
সাধারণত একজন কুমারীকে একাধিকবার কুমারী পূজার জন্য মনোনীত করা হয় না। কুমারী পূজার জন্য মনোনীত বালিকা পরবর্তী সময়ে অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে এ ব্যাপারে কোন বিধি নিষেধ নেই । প্রতি বছর একটি নিদিষ্ট তিথিতে একজন কুমারীকে মাতৃরূপে বন্দনা করার অনুষ্ঠান চালু করে স্বামী বিবেকান্দ মাতৃত্বের যে কমনীয় রূপকে বিকশিত করে তুলেছেন তারই ধারাবাহিকতায় কুমারী পূজা চলতে থাকবে যুগ যুগ ধরে। বস্তুবাদী বিশ্বে মানুষ ভোগ বিলাসিতা প্রাচুর্য তথা ঐশ্বর্য যখন দিশেহারা একমাত্র মাতৃত্ব শক্তির আরধনার মধ্যে দিয়েই জীবনে মুক্তি আসতে পারে এবং সেটি সম্ভব হবে কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে।

# সহায়ক গ্রন্থ :- তারাপদ আচার্শ মহাশয়ের কুমারী পূজা

 

Shankar Chakraborty

aappublication@gmail.com

Editor of AAP publicaltions

Post your comments about this news