করোনা : রামমন্দিরের ভিতপূজা - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : রামমন্দিরের ভিতপূজা

করোনা : রামমন্দিরের ভিতপূজা

 

করোনা : রামমন্দিরের ভিতপূজা

সুনীলকুমার সরকার

কমিউনিষ্ট ম্যানুফেস্টো না পড়লেও গরীবগুর্ব নিরক্ষর মানুষেরা সমাজতন্ত্রটা বোঝেন বোঝেন ,  গরীব মানুষের জন্য সত্যিকারের প্রকল্পগুলিই হলো সমাজতান্ত্রিক উদ্যোগ এই ভালো কাজগুলি সরকারই করে এসেছে আর এও জানেন , কারখানার মালিকরা বেশী খাটিয়ে কম মজুরী দেয় , শোষণ-মুনাফাই তাদের লক্ষ্য

 পশ্চিমী শিক্ষায় শিক্ষিত , উদার চিন্তায় দীক্ষিত নেহেরু সরকারী উদ্যোগে একের পর এক শিল্প স্থাপন শুরু করেন শুরু করেন  , গরীব মানুষের আর্থিক বুনিয়াদ তৈরির জন্য একের পর এক সরকারি প্রকল্প লক্ষ্য ভাঙাচোরা অর্থনীতির পুনর্গঠন সংবিধানে ঘোষিত পথেই  সমাজতান্ত্রিক ধাঁচেই দেশ গড়ে তুলছিলেন সংবিধানে মিশ্র অর্থনীতির কথা বলা হলেও সরকার সরকারি ক্ষেত্রের গুরুত্বই  ছিল বেশি আজকের  আম্বানি-আদানিদের মতো দাপট দেখতে পারেনি তখন বেসরকারি উদ্যোক্তারা পরবর্তীতে খনি , ব্যাংকসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জাতীয়করণের মাধ্যমে কর্মচারীদের সুরক্ষা জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয় অন্যদিকে স্বাধীনতার পর নতুন করে গড়ে তোলা সোমনাথ মন্দিরের দারোদ্ঘাটন হয় ১২ই নভেম্বর , ১৯৪৭ অনুষ্ঠানে নেহেরু যাননি এবং তিনি কিছু রাষ্ট্রনেতাকে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রকে , রাষ্টের সরকারকে মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা থেকে বিরত থাকতে বলেন মুখ্যমন্ত্রীদের একটি চিঠিতে লিখেছিলেন , এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোন যোগ নেই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এই মানুষটি আদর্শ   মানসিকতায় ছিলেন প্রকৃত অর্থেই সেকুলার আর গান্ধীজি বলেছিলেন , সরকার যেন সোমনাথ মন্দির পুনর্নিমাণেরর কোনরকম ব্যয়ভার বহন না করে জাতীয়তাবাদী ধারণা তখনও ছিল কিন্তু উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রশ্রয় পায়নি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বজায় ছিল

 আজকের রামমন্দির নির্মাণে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশ , কোনও ট্রাস্টের মাধ্যমে কাজটি করতে হবে দেখা গেল , ৫ই আগস্ট ভুমিপূজার পুরো দায়িত্বই উত্তরপ্রদেশ সরকার নিল , গেলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী ! জনগণের টাকায় ২২কেজি রুপোর ইঁট মাটির তলায় পুঁতে দেওয়া হলো , মূল্যবান ধাতুর অপচয় ! মানুষের সমাগম , সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকেই যায় ! লকডাউন চলছে , কোন বিরোধিতা নয় বাধা এলেই 'দেশ খাতরে মে হ্যায় , হিন্দু খাতরে মে হ্যায় ' খাকি হাফপ্যান্ট পড়া  উগ্র জাতীয়তাবাদ বাধাগুলিকে হাটিয়ে দেবে !

১৯৯২ সালে নিউ ইকোনোমিক পলিসির মধ্যদিয়ে বেসরকারিকরণের যে  ভ্রূণ জন্মেছিল এখন তা দৈত্যে পরিণত কয়েক বছর ধরে সরকারি সংস্থাগুলি বেচে দেওয়ার  কারবার দ্রুতগতিতে চলছে আর এখন তো লকডাউন , খোলা মাঠ ! এই অবসরে মানবতাবিরোধী এজেন্ডা দেশকে পেছন দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে হ্যাঁ , অবসরই বটে লকডাউনে পথে নামা বারণ , ফিজিক্যাল ডিস্ট্যানসিং , রাজনীতির সময় নয় , রাজনৈতিক দলগুলিকে বিরোধিতা বাদ দিয়ে সহযোগিতা করতে অনুরোধ করা হয়েছে সবাই ঘরে থাকো , শুধু আমি বা আমরাই রাজপথে বেরোবো এই অবসর এক বাড়তি সুযোগ এনে দিয়েছে ৫০০ সরকারি কয়লাখনিকে আবার সেই বেসরকারিদের হাতে বেচে দাও , ১৫১টি ট্রেনকে ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দাও , ব্যাংকগুলির আবার বেসরকারিকরণ , কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাগুলির কর্মচারীরা আতঙ্কে দিন গুণছে , এই বুঝি কোন মালিক এসে বলবে---আর দরকার নেই ,  এবার তোমরা অবসর নাও ! গরীবগুর্ব মানুষগুলিও আজ বুঝে গেছেন , সেই দিন আর নেই , সরকার হাত গুটাচ্ছে , সরকারি প্রকল্প কমছে , কল্যাণমূলক রাষ্ট্র আর থাকছে না ! সমস্ত কিছুর বেসরকারিকরণ আর এদিকে ধর্মের রাষ্ট্রীয়করণ ! তো প্রাচীনকালের রাজ্যশাসন , রাজা শৈব হলে প্রজাগণ শৈব হবেন , রাজা বৌদ্ধ হলে প্রজাগণকেও হতে হবে বৌদ্ধ !

আপনার একটু বিরক্ত লাগছে , সেই একই টপিক--- বেসরকারিকরণ আর বেসরকারিকরণ ! আমরা তো জেনেই গেছি , সব বেচে দেবে , সাধারণ-গরীবদের যে কী হবে , সবাই তা জানে , আর কত শুনব ! এদিকে করোনা আতঙ্কে দিন যে কাটে না ! ১৩৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে এখন পর্যন্ত মাত্র .১০ কোটি মানুষের পরীক্ষা হয়েছে , বিশ্বে এই পরীক্ষার হার ভারতে সবচেয়ে কম WHO' বিজ্ঞানী সৌমা স্বামীনাথন  পরীক্ষার  স্বল্প হার দেখে হতাশ !   দেশে সংক্রমণ  একুশ লক্ষ ছাড়িয়েছে , রাজ্যে একলক্ষ ছুঁইছুঁই আপনি দেখছেন , রোগের চিকিৎসা হচ্ছে না , মানুষের মৃত্যু মিছিল , আপনি বাঁচবেন কি না ঠিক নেই ! অযোধ্যায় রাম মন্দির হল , না রাবণ মন্দির , না মাজার-মসজিদ হল , তাতে কিছু এসে যায় না , আপনার !

না , আপনার এসে যায় এই ভীষণ করোনা কালে যখন মানুষকে সংক্রমণ থেকে বাঁচানোটাই মূল কাজ হওয়া উচিৎ , কাজ চলে যাওয়া ৫০ কোটি মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়াটাই মূল কাজ হওয়া উচিৎ , তা সত্বেও রাষ্ট্রের উদ্যোগে যখন রাম মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে তখন নিশ্চয়ই কোন গুরুতর প্রয়োজন আছে অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া অবিবেচকের মত রাষ্ট্র কি এই চূড়ান্ত হেলথ এমার্জেন্সির সময় মন্দির নির্মাণে যায় ? নিজের চূড়ান্ত সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকা সত্বেও , যখন তিনি ভিতপুজোর মন্ত্র উচ্চারণ করেন , সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করেন , বিষম প্রয়োজন তো আছেই !  ধর্মীয় পূজাপাঠের ছোট সমাবেশও যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে  তা জানা সত্বেও ! এই হেলথ  এমার্জেন্সি আর্থিক ইমার্জেন্সিতে পরিণত হওয়া সত্বেও যখন ভিতপূজার আয়োজন হয় তখন বুঝে নিতে হয় , এর গভীর আবশ্যকতা আছে

মুসলমানদের পীঠস্থান মক্কা আছে , খ্রিষ্টানদের আছে জেরুজালেম , হিন্দুদের তো সেরকম কোনও হেড কোয়ার্টার নেই !  একটা ঝাঁ চকচকে কর্পোরেট হেড অফিস থাকবে না ! তবে হিন্দুধর্মাবলম্বীরা বরাবর মেনে এসেছে গাছ , পাথর , নদী , পাহাড় , জল , বাতাসেই ভগবান বিরাজমান প্রকৃতি মানুষেই ভগবান বিরাজমান গঙ্গাতে স্নান করলে যে পুণ্য , সরযূতে স্নান করলেও সেই পুণ্য অপরদিকে , রাম তো কৃত্তিবাস সৃষ্ট মহাকাব্যের চরিত্র , সাহিত্যের একটি আদর্শ চরিত্র সেই রাম তো ঋষি রাজা , ক্ষমতায় লোভ নেই ! প্রশ্ন জাগে , যাঁরা এখন চিকিৎসা পাচ্ছেন না , শ্বাসকষ্টে মৃত্যমুখে তাঁদের কী কাজে আসবে এই ভিতপূজা , ঝাড়খন্ড-পুরুলিয়ার আদিবাসীদের কী কাজে আসবে , ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের কী কাজে আসবে , গরীব হিন্দুদেরই বা কী কাজে... গরীব মানুষেরা তো আর মন্দিরে ঢুকতে পারবেনা , এই মানুষেরা মন্দিরের বাইরে অনেক দূরে শুধুই ভিখিরি হিসেবে দুপাশে সারি দিয়ে বসতে পারবে ! আপামর মুসলমানদের কী লাভ হবে অথবা তাদের জন্য আলাদা মসজিদ হলেই বা কী হবে ? মন্দির-মসজিদে গেলে হয়ত স্বর্গে-বেহেস্তে যাওয়া যেতে পারে কিন্তু জীবিত অবস্থায় তো পেট ভরবে না , জীবনযাপন যে এখনও অনেক দিন , খালি পেটে জীবনযাপন ! ভারতবর্ষে নানা ধর্ম , জাতি , সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে আসছে আজ সরকারি উদ্যোগে একটি নির্দিষ্ট ধর্মসম্প্রদায়ের জন্য মন্দির ! দেশের চিরাচরিত বহুত্ববাদী দর্শন লাঞ্ছিত আবারও ! বলা হয়েছে---রামমন্দির হলে দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে ! বদলে যে যাবে তা বোঝাই যাচ্ছে , যেখানে ভুমিপূজা হলো তার আশেপাশের জমিগুলি কর্পোরেটরা কিনে ফেলেছে পাঁচতারা সাততারা হোটেল হবে , হবে শপিংমল , বাণিজ্যকেন্দ্র , ট্যুরিজম সেন্টার... খুশি কর্পোরেটরা আর অপরদিকে  হিন্দুরা খুশি হলেই তো কেল্লাফতে !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news