করোনা : ভ্যাকসিন কতদূর ? - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : ভ্যাকসিন কতদূর ?

করোনা : ভ্যাকসিন কতদূর ?

করোনা : ভ্যাকসিন কতদূর ?

সুনীলকুমার সরকার

স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বের সাধারণ মানুষ জানতে চাইছে , আর কতদিন ! মাস ছয়েক ধরে চলছে মৃত্যু মিছিলএক দুঃসহ অবস্থা ! জীবনযাপন স্তব্ধরেল , বিমান ,ব্যবসা বাণিজ্য থেকে স্কুল , কলেজ ,  অফিস , আদালত থেকে সাধারণ মানুষের রুটিরুজিচালু শুধু জরুরী পরিষেবাকতদিন চলবে এই বিশ্ব-বন্ধ !  দেশে দেশে সরকার যখন যেমন যা বলছে , মানুষ তাই করছেঅধৈর্য মানুষ পথে নামছে , কখনও প্রতিষেধক এর দাবি নিয়ে , কখনও খাদ্যের দাবিতে , কখনও বাঁধন-মুক্তির দাবিতেওষুধ আবিষ্কার আমি আপনি ব্যক্তি মানুষ করতে পারিনা , তার জন্য আছে রাষ্ট্র , রাষ্ট্রের বিজ্ঞান-গবেষণাগার , বিজ্ঞানীরা

 বিশ্বে পোনে কোটি মানুষ আক্রান্ত ! আমাদের দেশে  ১৪ লক্ষ , দৈনিক সংক্রমণ ৫০ হাজার মানুষ  আতঙ্ক নিয়ে মানুষের দিন গোনা ! অসংগঠিত ক্ষেত্রের মানুষের রসদ ফুরোচ্ছে , ফুরিয়েছেনিদান চলছে ,  সংক্রমণ আটকাতে দেশে দেশে লকডাউন , মানুষ গৃহবন্দী ! ভুখা মানুষ ভাবতে শুরু করেছে--- হোক করোনা , পেট তো ভরাতে হবে !

রাষ্ট্র সংঘের সম্প্রতি একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে , গত এক দশকে বিশ্বে ক্ষুধা অপুষ্টি দূরীকরণে যতটা সাফল্য এসেছে , এই কোভিড সংক্রমণ আবার তা পিছিয়ে দিচ্ছে , হাত ছাড়া হতে চলেছে অর্জিত সাফল্যবর্তমানে বিশ্বে ৬৯ কোটি মানুষের পেট ভরে না , এর মধ্যে এশিয়ায় বাস করে ৩৮ কোটি , আফ্রিকায় ২৫ কোটিপৃথিবীতে বর্তমান জনসংখ্যা ৭৮০ কোটিএদিকে সারা বিশ্বে যা খাদ্যশস্য উৎপন্ন হয় তা দিয়ে ১০০০ কোটি মানুষের পেট ভরানো যায়তবুও সব মানুষ খেতে পায় না ! কেন ? পায় না  কারণ , এই গরীবগুলোর হাতে পয়সা নেই , তারা খাবার কিনতে পারে নাএই গরীবগুলোর পোশাকি নাম বিপিএলদিনে যে ব্যক্তির আয় . ডলার বা তার বেশি তাকে এপিএল ধরা হয় , ভারতীয় মুদ্রায় যাদের  মাসিক আয় মোটামুটি ৪৫০০ টাকা বা তার বেশি তারা এপিএল এই টাকা দিয়ে যে একজনের মাসের খাওয়া , পোশাক , চিকিৎসা বা তার ছোট ছেলেমেয়ের ভরণপোষণ হতে পারে না , তা বোঝার জন্য অর্থনীতি পড়তে হয় না

 এই করোনা-কালে ইউনিসেফ ভারতীয় শিশুদের ভয়ংকর দুরাবস্থার কথা জানিয়েছেভারতের প্রাথমিক মাধ্যমিক স্কুলগুলিতে পড়ে প্রায় ২৫ কোটি শিশু , অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রে  কোটিকরোনা লকডাউনের জেরে এই শিশুগুলির পুষ্টিতে প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছেজন হফকিন্স স্কুলের সম্প্রতি সমীক্ষা জানিয়েছে---শিশুগুলির খাওয়া প্রতিষেধক বন্ধ , আগামী  মাসে তিন লক্ষ শিশু মারা যেতে পারেস্কুলে লেখাপড়া বন্ধ , এই পরিস্থিতির ফলে আগামীতে ড্রপ আউটের সংখ্যা বাড়বে , বাড়তে পারে বাল্যবিবাহকোটি কোটি কাজ হারানো মানুষ নাস্তানাবুদ হচ্ছে তার পরিবারের দুরাবস্থা সামাল দিতে ! এই লকডাউনে বাড়িতে থাকা শিশুদের ওপর মারধোর-অত্যাচার বেড়েছে , বেড়েছে শিশু নিগ্রহ-যৌন হেনস্থা , বেড়েছে মানসিক চাপসম্প্রতি চাইল্ড লাইনের ফোনে শিশুদের প্রতি অত্যাচারজনিত  অভিযোগ আসা ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে

এই শিশুদের জন্য , না খেতে পাওয়া মানুষের জন্য , সাধারণ মানুষের জন্য ভ্যাকসিন এখনই দরকার নইলে এই মানুষগুলি আর থাকবে না , ধরিত্রীতে ! WHO মতে , বিশ্বের গরীব মানুষের জন্য ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ ! অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীরা অনেকটাই এগিয়ে , রাশিয়া এগিয়ে চলেছে , একটু আড়ালে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ায় গবেষণার কাজ নাকি প্রায় শেষ ! মাল্টিন্যাশনাল ফার্মা কোম্পানিগুলি পাল্লা দিয়ে কাজে নেমেছে , কে আগে আবিষ্কার করতে পারে , বাজার ধরতে হবে তো ! ভারতবর্ষে এইমস-এর মতো বারোটি সংস্থা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে , আগস্টেই নাকি প্রাথমিক ওষুধ আসতে চলেছে ! ভালো খবরদেশের সাধারণ মানুষের টাকায় গবেষণা চলছে , মানুষ জানতে চাইছে , সাধারণ-গরীব মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকব তো , গরীব মানুষ বিনামূল্যে ভ্যাকসিন পাবে তো  ! দেশের ৭০ শতাংশ না খেতে পাওয়া মানুষ মরে গেলে যে অন্তহীন একাকীত্ব ! ওদিকে শোষণ যন্ত্রই বা চালু থাকবে কী করে !

সংক্রমণের প্রথম দিকে দেশের কুসংস্কারিরা পরিকল্পিতভাবে কাজে নেমেছিল , বাঁচতে চাওয়া মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে , ভরসা বিজ্ঞানেই রেখেছেতবে সেই ফাজলামি এখনও চলছেতাই , কেউ নাকে সর্ষের তেল দিয়ে  ঘুমোতে বলছে, কেউ আবার বলছে---অযোধ্যায় রামমন্দির তৈরি হলেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে ভাইরাসটি !  মানুষ জেনে গেছে বিজ্ঞান ছাড়া গতি নেই , তাই কৌতুক-তাচ্ছিল্য'ভরে বলছে --- সকালে আমি গোমূত্র পান করি , দুপুরে করোনিল খাই , সন্ধ্যায় একশো বার জপ করি 'গো করোনা গো' , রাতে আমি ভাবিজির পাঁপড় খেতে শুরু করেছিতাই আমার আর ভ্যাকসিনের দরকার নেই !

ওদিকে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেক প্রশ্ন আছেপ্রশ্ন আছে , ভ্যাকসিনের আবিষ্কার কার্যকারিতা নিয়ে    --- ভ্যাকসিন কতটা universal হবে , পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা , ভ্যাকসিনটি  কতদিন কার্যকরী থাকবে , একমাস , 'মাস , এক বছর না লাইফ টাইম ! ভ্যাকসিনটি তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সাধারণ ইম্মুনিটির বারোটা বাজিয়ে দেবে না তো , ইত্যাদি ইত্যাদি ! বর্তমানে সংক্রমণ হার বেশী , মৃত্যু হার ধীরে ধীরে কমছেএভাবেই সোসাইটি তে herd immunity তৈরি হচ্ছে । herd immunity হলো সমাজে মানুষের দলগত  স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকরোনার সঙ্গে থাকতে থাকতেই এই প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বেসৃষ্টির আদি থেকে মানব সমাজকে কোন ভ্যাকসিন বাঁচায়নি , বাঁচিয়েছে এই তৈরি হওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা দেশের খেটে খাওয়া গরীব হা ভাতে মানুষের যা প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে , ইউরোপ আমেরিকার তথাকথিত সুসভ্য মানুষের তা নেইভারতবর্ষের গরীবগুর্ব মানুষ নিজেদের এই সক্ষমতা জানে , জেনেছে বাপ-দাদাদের কাছ থেকে , পরম্পরায়তাই করোনা জুজু না দেখে , মধ্য উচ্চ বিত্তের ' ভয় পাচ্ছি ভয় পাচ্ছি ' রকমের বিলাসিতায় না ভুগে ভাতের খোঁজেই ছুটছে তারা !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

 

 

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news