করোনা : বাঙালি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ! - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : বাঙালি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে !

করোনা : বাঙালি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে !

করোনা : বাঙালি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে !

সুনীলকুমার সরকার

এই বাঙালিই লকডাউনের সময় প্রত্যেক দিন বাজারের থলে নিয়ে দেদার বাজার করেছে , ভিড় এড়ায়নি , ভেঙেছে করোনা আচরণবিধিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে----ইতিহাসে লেখা থাকবে , শুধু বাজার করেই একটি জাতি লুপ্ত হয়ে গেছে ! শারদোৎসবের আগে থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল , জীবন আগে না উৎসব ? আশঙ্কা ছিল এবং আছেও , উৎসবের ভিড় সংক্রমণে সুনামি নিয়ে আসবে ! চিকিৎসকদের সংগঠন থেকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সরকারের কাছে সাবধানবাণী আর্জি জানিয়েছে , সংক্রমণ প্রতিরোধে উৎসবের মাত্রা একদম কমিয়ে আনার প্রশাসন মুখে বলেছে--- সাবধানে থাকুন , ভালো থাকুন , সুস্থ থাকুন ; পুজো প্যান্ডেলে দর্শনার্থীদের জন্য নির্দেশনামা জারিও করেছে

এদিকে সরকার রাজ্যের ক্লাবগুলিকে ৫০ হাজার করে দিয়েছে , উৎসব যাপন করার জন্যে টাকা নিতে দেরী করলে থানা থেকে গম্ভীর গলায় ফোন---এখনও টাকা নিয়ে গেলেন না তো ! ক্লাবগুলি টাকা নিয়ে এসেছে বিগত দিনের রেকর্ড ছাপিয়ে জেলার পুজোগুলোরও উদ্বোধনের হিড়িক ! জারি থেকেছে 'সেরার সেরা' থেকে বিশ্ব বাংলা পুরস্কার পরোক্ষে উৎসবে অতি উৎসাহের ইঙ্গিত এখন বস্তিবাসী থেকে সব্জীওয়ালি সবাই জানে ভিড়- গেলে , ভিড় বাড়ালে সংক্রমণ বাড়ে এও জেনেছে , উৎসব শেষে সংক্রমণ তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা উৎসব আয়োজনের আতিশয্যে সিঁদুরে মেঘ দেখে মানুষ ভাবগতিক fভালো ঠেকে না ! আড়ম্বরহীন পুজো-উৎসবের জন্য বাধ্য হয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ দেশের কিছু উৎসবমুখর রাজ্যে সংক্রমণের বাড়বাড়ন্তের নিরিখে আদালতের সেই ঐতিহাসিক রায়! উৎসবের প্রাকমুহূর্তে আদালত পরিস্কার জানিয়ে দেয়----প্যান্ডেল হবে জনশূন্য , সামনে ঝোলাতে হবে নো এন্ট্রি , সিঁদুর খেলা বন্ধ আর সরকারের দেওয়া ৫০ হাজার টাকা অন্য কাজে নয় , কোভিড সচেতনতার কাজে লাগাতে হবে , বিলি করতে হবে স্যানিটাইজার , মাস্ক

হাই কোর্ট-এর রায় ! অভূতপূর্ব ভাবে মানুষ স্বাগত জানিয়েছে , কুর্নিশ জানিয়েছে সাধারণ মানুষের আস্থা অনেক বেড়ে গিয়েছে মহামান্য আদালতের ওপর ,জনস্বার্থে এই প্রতিষ্ঠানটি কতটা যে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারে তা প্রমাণিত ! বিগত কয়েক বছরের অভ্যাসমতো বিরোধিতা যে আসেনিতা নয় বিগত কয়েক বছরে যেন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে , হাই কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করা , রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আপিল অথবা রায়কে মান্যতা না দেওয়ার চেষ্টা বা মানসিকতার প্রকাশ-প্রদর্শন আদালত বিচারকদের প্রতি বিরূপ মন্তব্যও ! এগুলির সবটাই কিছু রাজনৈতিক দল , নেতা এবং এমনকি সরকারি ব্যক্তিদের মুখেও এবারেও দেখা গেছে , রায় ঘোষিত হওয়ার পর পুজো কমিটিগুলির সংগঠন আইনজীবীদের একটা অংশ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায় , উদ্দেশ্য একটাই , উৎসব জাঁকজমক করার লক্ষ্যে বিধিনিষেধে কিছুটা ছাড় হাই কোর্ট শোনেনি , মূল রায়ে অবিচল থেকে মামুলি দু'একটি পয়েন্টে শিথিল হয়েছে যেমন অনুরোধ করলে , একটু সাড়া দিতে হয় , আরকি ! সাধারণ মানুষ বলেছে , জয় হো !

কিছু উৎসবপ্রিয় মানুষ মিডিয়া যে সমালোচনা করেনি তা নয় বলেছে--- ফুচকা , ভেলপুরী মোগলাই হয়ে মানুষের ঢল নো এন্ট্রি ব্যারিকেডে গিয়ে থামবে , সে ঢল আবার যাবে অন্য প্যান্ডেলের নো এন্ট্রিতে , সংক্রমণ তো রে রে করে বাড়বে ,শুধু প্যান্ডেলের ভেতরেই ১০ মিটারের করোনা আচরণবিধি ! এও কি ঘুরতি পথে সেই উৎসব-সমাগমের আবাহন , অথবা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়-সমর্থন আর উৎসাহ ?

 বাঙালি কিন্তু ফিরছে , উৎসবমুখী করে তোলাকে পাত্তা দেয়নি নীরদবাবুর 'আত্মঘাতী বাঙালী' বহুদিন পর সঠিক পদক্ষেপে এগোচ্ছে , দুর্নাম ঘুচোচ্ছে ! বাঙালি হাই কোর্ট-এর রায়কে মান্যতা দিয়েছে , বিজ্ঞান সংগঠনগুলির প্রচারে সাড়া দিয়েছে নিজের ভালোটা বুঝেছে সারা বছরের অপেক্ষায় থাকা বাঙালি , শ্রেষ্ঠ উৎসবে সামিল হতে আগ্রহী বাঙালি বিগত বছরগুলির তুলনায় অনেক কম পথে নেমেছে , ভিড় এড়িয়েছে সান্ত্বনা নিয়েছে , আগামী বছর আসবে আবার ! সপ্তমী অষ্টমীতে অন্যান্য বছরের তুলনায় এক চতুথাংশ মানুষ পথে নেমেছে , ভির-মুক্তি ঘটানোর চেষ্টা করেছেনবমীতে মানুষের ঢল থাকলেও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম কলকাতাসহ জেলা শহরগুলিতে প্রায় সব মানুষের মুখে মাস্ক ভিড়ের মধ্যেও শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছে যে যার মতো নবমীর রাতে শহরতলি থেকে কলকাতায় এবং গ্রাম-গঞ্জ থেকে জেলা শহরে মানুষ এসেছে , নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি ভাড়া করেইপ্রত্যেক বছরের মতোই , তবে সংখ্যায় অনেক কম আর মুখে অবশ্যই মাস্ক প্রসঙ্গত , গঞ্জ এলাকায় শহরাঞ্চলের তুলনায় কম মানুষ মাস্ক পড়ছে আর গ্রামে আরও কম ( চিত্র অবশ্য পুজোর আগে থেকেই ) এবারে লোক সমাগম মিটারে ধরা পড়ছেনা , সন্ধ্যে টায় সুরুচি সংঘে কত লক্ষ , রাত টায় শিলিগুড়ির সেন্ট্রাল কলোনি'তে কত আর রাত ১১টায় শ্রীভূমি'তেই-বা কত লক্ষ ! বাঙালি এবার নিজের ভালোটা বুঝেছে , সংক্রমণ থেকে বাঁচতেই হবে ! সংক্রমণের কথা মাথায় রেখেই মণ্ডপ , প্রতিমা , প্যান্ডেল , আলোকসজ্জায় অনাড়ম্বর-ছোঁয়া থিমের ভাবনা কমেছে , ফিরছে চালির প্রতিমা আর ডাকের সাজে ক্লাব-সদস্যরাও খানিক ঘুরে দাঁড়িয়েছে , হাই কোর্ট-এর রায়কে মান্যতা দিয়ে , না চাইতেই পাওয়া সরকারি টাকাকে অন্য কাজে ব্যবহার না করে করোনা-কাজেই লাগিয়েছে ক্লাবগুলো ভালো-মন্দ , সাদা-কালো বুঝে উচিত-অনুচিতে ফিরছে !

উৎসবের পাতলা ভিড়েও পথ চলতি মানুষ পাশের মানুষকে মাস্ক পড়তে বলছে , প্রতিরোধ গড়ে তুলছে , তোমার ভালোয় সবার ভালো আছে ডেমন্স্ট্রেসন এফেক্ট , সবাই পড়লে আমিই-বা না পড়ে থাকি কি করে ! সংক্রমণের ভয় , মৃত্যভয় এবং সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতা ! কাঁহাত্বক বাঙালি নিজের নিন্দা শুনবে , এমনিতেই অনেক অবনমন ঘটেছে ! সাধারণ শিক্ষিত মানুষ পজিটিভ রেসপন্স করছে উৎসবমুখীতায় বুঁদ হয়ে থাকা থেকে বাঙালি ফিরছে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে নিজের ঐতিহ্যের প্রতি বাঙালি স্মরণ করে , আন্দামানের সেলুলার জেলে যে নামগুলি জ্বল জ্বল করে তার প্রায় সবটাই বাঙালি পরবর্তী সামাজিক গণ আন্দোলনগুলির মধ্যদিয়ে অনেক কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছে , পথ দেখিয়েছে বাঙালিই

ভিড়ের সঙ্গে সংক্রমণ সমানুপাতিক শ্রেষ্ঠ উৎসবের মাঝেও বাঙালি আত্ম-প্রণোদিত জাতি হিসেবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা উদ্যোগ করেছে নিজের স্বার্থে , দেশের স্বার্থে , মানবতার স্বার্থে উৎসব এখনো বাকি , বাঙালিও লড়ছে আর     উৎসব শেষে সংক্রমণের বাড়বাড়ন্তকে নিয়ন্ত্রণে আনবে , আশঙ্কাকে তুড়ি মেরেই ! এবার  আবার বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানো শুরু হলো !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

 

                            -----------------------

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news