করোনা : নিঃশব্দে বন চুরি যাচ্ছে - Newsbazar24
সাহিত্য

করোনা : নিঃশব্দে বন চুরি যাচ্ছে

করোনা : নিঃশব্দে বন চুরি যাচ্ছে

 

করোনা : নিঃশব্দে বন চুরি যাচ্ছে

সুনীলকুমার সরকার

   দেশে এবং আমাদের রাজ্যে সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে , প্রত্যেক দিনই আগের দিনের রেকর্ড ভাঙছে আনলক-এর নামে লকডাউন প্রায় উঠেই গেছে ! বাজারে , বাসে বা আর সব জায়গায় , সাধারণত যেখানে বেশি ভিড় থাকে , এখন প্রায় স্বাভাবিকের মতোই  ভিড় প্রশাসন  কাজকর্ম স্বাভাবিক রেখে অর্থনীতিকে সচল রাখতে চাইছে , সাধারণ মানুষও সাড়া দিচ্ছেন , অনেক অসুবিধার মধ্যেও আয় কমে যাওয়ায় সমস্ত স্তরের মানুষই কমবেশি  ক্ষতিগ্রস্ত , গরিব মানুষের জীবনে অকল্পনীয় দুর্দশা।  সংক্রমণের নিরিখে আমাদের দেশ বিশ্বে চতুর্থ খারাপ খবর গোষ্ঠী সংক্রমণ শুরু হয়েছে কি হয়নি তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক স্বাভাবিকভাবেই সরকার প্রশাসন বলছে হয়নি আর ডাক্তার-বিজ্ঞানীদের মত ,  শুরু হয়ে গেছে ! দিনে এগারো হাজার , বারো হাজার সংক্রমণ এবং তা  বাড়ছে উত্তরোত্তর দেশের মানুষ টিভি আর খবরের কাগজ দেখে শিউরে উঠছে ! দেশে সংক্রমণ সোয়া তিন লক্ষের দিকে , রাজ্যে ছাড়িয়েছে দশ হাজার  

   উন্নয়নের কিছু বাইপ্রোডাক্ট থাকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি   এবং ফলত শিল্পায়নের জন্য আর মুনাফার লোভে প্রচুর বনাঞ্চল ধংস হয়েছে , ধরিত্রীর আতঙ্কিত হয়েছে বনবাসীরা , টনক নড়েছে বিজ্ঞানীদের , কিছু পাগল মানুষ পরিবেশ রক্ষায় মেতেছে শুধু গাছ লাগিয়েই পৃথিবীটাকে অনেক শান্ত-সুন্দর আর বাসযোগ্য করে তোলা যেতে পারে ! কেউ তো তাকে বলেনি কিন্তু জার্মানির ফেলিক্স ফিন্কবাইনার ছেলেবেলা থেকেই গাছ পাগল বড় হয়ে তিনি আর তার সংগঠন 'প্ল্যান্ট ফর দা প্ল্যানেট' রাষ্ট্রপুঞ্জের সহায়তায় প্রায় ১৪ বিলিয়ন গাছ লাগিয়ে ফেললেন পৃথিবীর বুকে ভারতে 'ফরেস্ট ম্যান অফ ইন্ডিয়া'  বলা হয় আসামের যাদব মলাই পায়েং -কে। এই মাটির মানুষটি গাছ-জঙ্গলের মধ্যেই জীবনের মানে খোঁজে। ১৯৮০ থেকে ব্রহ্মপুত্রের মাজুলি দ্বীপে একা তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে এক বিরাট জঙ্গল তৈরি করেছেন এখন তার নামেই বনটির নাম 'মলাই ফরেস্ট' বিদ্যাধরন নামে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর কেরলে রাস্তার ধারে বিগত চল্লিশ বছর ধরে নিজ হাতে এক লক্ষ গাছ লাগিয়ে ফেলেছেন কেরলেরই এক অটো রিক্সাচালক শ্যামকুমার তেইশ হাজার গাছ লাগিয়েছেন আর তামিলনাড়ুর বাস কন্ডাক্টর যোগানাথন রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এক লক্ষ গাছ তৈরি করেছেন ইতিমধ্যেই বিকানীরের 'গভর্নমেন্ট দুঙ্গার কলেজ'-এর অধ্যাপক শ্যামসুন্দর স্থানীয় মানুষকে সাথে নিয়ে ২০০৬ থেকে আজ প্রায় আট লক্ষ ফলের গাছ লাগিয়ে এক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন এই পাগলগুলোর জন্যই তুমি এখনও এত সুন্দর , পৃথিবী ; তোমার বুকে মাথা রাখা যায় !  

     এখন রাজনীতি করার সময় নয় , পাশে থেকে সহযোগিতা করার সময় , কেন্দ্র রাজ্য জানিয়ে দিয়েছে জানিয়ে দিয়েছে--- আপনারা বাড়িতে থাকুন , সাবধানে থাকুন , সুস্থ থাকুন , করোনা আচরণবিধি মেনে চলুন। আমরা আছি করোনার সাথে লড়াইয়ে। মিছিল , মিটিং , সভা , সমিতি ,  সমাবেশ বন্ধ প্রতিবাদ বন্ধ , প্রশ্ন বন্ধ ! সাধারণ মানুষও সংক্রমণ-আতঙ্ক আর জীবন জীবিকার ভাবনায় ত্রস্ত-ব্যস্ত আশার বাণী ঘোষিত হয়েছে , এই দুর্যোগকেই সুযোগে পরিণত করতে হবে !  

      সুযোগ তো এসেই গেছে ! কাজের অভাবে বনবস্তিবাসীরা ক্ষুদার জ্বালায় ছিন্নভিন্ন , পেটের জ্বালায় হতাশা আর বিভ্রান্তি নিয়ে প্রিয় জঙ্গলকে আর আগলে রাখতে পারছে কই ! বনরক্ষীর সংখ্যা কমেছে , নিয়োগ কম , আক্রান্তও হচ্ছে জঙ্গল এখন কাঠমাফিয়াদের মুক্তাঞ্চল ! ডুয়ার্সে সংকোশ কুমারগ্রাম বিট অঞ্চলের মূল্যবান  সেগুন শাল গাছ নির্বিচারে কেটে নেওয়া হচ্ছে , কুমারগ্রাম-ভুটান কালিখোলা রাস্তার বহু গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে , বলার কেউ নেই অতীতে বনবাসীদের নিয়ে গঠিত বনরক্ষা কমিটির আর কোন অস্তিত্ব নেই এই কাজের জন্য বনবাসীদের বেশ কিছুদিনের কর্মসংস্থানও হতো মানুষগুলি বাঁচার রসদও পেত ! এখন বন চুরি যাচ্ছে , সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে এই কাঠমাফিয়ারা আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত এই করোনা আবহে হিমালয়ের কুমায়ুন রেঞ্জে শত শত হেক্টর জঙ্গল পুড়ে ছাই , আগুন এখনও জ্বলছে রাস্তা তৈরির জন্য হাজার হাজার ঝাঁকড়া গাছ কাটা হয়েছে রাস্তাকে সোজা রাখার জন্য  পথে যে গাছগুলি পড়ছে , কেটে ফেলা হচ্ছে ! প্রসঙ্গত , কাশ্মীরে গাছকে বাঁচানোর জন্যে রাস্তাকেই ঘুরিয়ে দেওয়া হয় , এটাই ওখানকার প্রথা বহু প্রাচীন প্রজাতির গাছ এই কুমায়ুনে , বহু পাখি জীবজন্তু নিয়ে অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ আশ্চর্যের বিষয় , ১৯৭৪ সালে সুন্দরলাল বহুগুনার নেতৃত্বে এই উত্তরাখণ্ডের যশীমঠ থেকেই বনবাসীরা গাছকে জড়িয়ে ধরে 'চিপকো আন্দোলন' শুরু করেছিলেন ! প্রসঙ্গত , এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবস (৫ই জুন)-এর মূল স্লোগানটি , জীববৈচিত্র্য কে রক্ষা করো ! বিশ্বাস করতে হবে , এই দাবানল নিছকই প্রাকৃতিক ? আজকের আধুনিক প্রযুক্তি আর উন্নত ব্যবস্থায় দাবানলকে নেভানো যায় না ! নাকি , আমাজন পুড়ে যাওয়ার গল্প এখানেও পৃথিবীর 'ফুসফুস' এই আমাজন , সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন সরবরাহকারী জঙ্গল , রেইন ফরেস্ট ! ২০১৯ আমাজনের গভীর জঙ্গলে আগুন লাগার অন্যতম কারণ বন ধ্বংস এই বন ধ্বংস এমনি এমনি হয়নি দীর্ঘদিন ধরে মুনাফাখোর বহুজাতিকরা এই অঞ্চলে কৃষিজমির সম্প্রসারণ আর পশুপালনের জন্য চারণভূমি তৈরির চেষ্টায় আছে সারা বিশ্বে প্রোটিন সরবরাহ করতে হবে ! কৃষিজ সয়া আর পশুর মাংসের চাহিদা বিপুল , মার্কেট ধরতে হবে ! আগুন না জ্বললে জমি তৈরি হবে কিভাবে !  

     এই  করোনা-কাল বহুজাতিকদের কাছে এক নিরূপদ্রব কাল , নিশ্চিন্তির কাল দেশীয় বহুজাতিক আর সামন্তপ্রভুরা খোলা তরবারি আর লোলুপ আগুন-শিখা নিয়ে কুমায়ুনে হানা দেয়নি তো , আমাজনের মতো ! ভারতবর্ষে লকডাউন শুরু হলো ২৫শে মার্চ এই ২৫শে মার্চের পর থেকে তোলা স্যাটেলাইট চিত্রে সুন্দরবনসহ পৃথিবীর জঙ্গলগুলির মাথায় ছোট ছোট টাক চোখে পড়ছে ম্যানগ্রোভ-এর ঘনত্ব আগের মতো থাকলে ঘূর্ণিঝড় আমফানে এত ক্ষতি হত না সুন্দরবনবাসীদের  

       প্রকৃতি আপন খেয়ালে আমাদের প্রিয় নীল গ্রহটিকে বাসযোগ্য করে গড়েছে , গড়েছে যাতে পৃথিবীর সব সদস্যই স্বচ্ছন্দে শ্বাস নিতে পারে কিছু মানুষ ক্ষুদ্র-ব্যক্তি স্বার্থে বন ধ্বংস করে পৃথিবীর টুঁটি চাপতে চাইছে আর কিছু মানুষ  আঁকড়ে আগলে রাখতে চায়ছে নিরন্তর চাওয়ার লড়াইয়ে একদল জিতলে ধ্বংস-মরুভূমি , আরেক দল জিতলে সুন্দর এক পৃথিবী ! লড়াই জিতবে করা ?

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news