করোনা : নাগরিক পরিযায়ী কেন ! - Newsbazar24
সাহিত্য

করোনা : নাগরিক পরিযায়ী কেন !

করোনা : নাগরিক পরিযায়ী কেন !

করোনা : নাগরিক পরিযায়ী কেন !

সুনীলকুমার সরকার

ভান ভনিতা না করে , সোজা কথা সাফ বলে ফেলা ভালো  ভারতের অর্থনীতি খাদের দিকে এগোচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই , উৎপাদন-বৃদ্ধি দ্রুত কমছিলগোদের ওপর বিষফোঁড়া করোনা-লকডাউন ! এখন  করোনাকে ঢাল করে মুখ রক্ষার চেষ্টা চলবে , মানে করোনা না এলে অর্থনীতি যেন ঘোড়ার মত ছুটতো !

সারা বিশ্বই মন্দার কবলে আছে এবং বিশ্বব্যাপী এই অতিমারির কারণে তা আরও গভীর প্রসারিত হচ্ছে১৮৭০ থেকে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে ১৪টি বড় মন্দা দেখা দিয়েছে১৮৭০ এবং এবারের আগুয়ান মন্দা , এই দুটি অতিমারির কারণেস্বাধীনতার পর মন্দাগুলিকে ভারত মোটামুটি সামলে নিয়েছে কিন্তু পুঁজিবাদী দেশগুলিতে বড় ধ্বস নেমেছেভারতের সংবিধানকারদের স্যালুট জানাতে হয় , তাঁরা অন্তত সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের দেশ গঠন করতে চেয়েছিলেন ! প্রথমদিকে দেশের বেশিটাই ছিল সরকারি ক্ষেত্র(government sector) বাকিটা বেসরকারি ক্ষেত্র(private sector) । সরকারি ক্ষেত্রগুলি মন্দাকে অনেকটাই সামলে নিতে পারেএদিকে নব্বইয়ের দশকে অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর হাত ধরে বিশ্বায়ন , দরজা খুলে দেওয়া , বিদেশি পুঁজি , প্রাইভেট সেক্টর থেকে বেসরকারিকরণের রমরমাদেশ এগোলো প্রায়-পুঁজিবাদের দিকে ,সমানে এগোচ্ছেশ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে  তবে মুনাফা-যন্ত্রে শ্রমিক শ্রেণির যা হওয়ার তাই হচ্ছে !

দেশ রাজ্যের সরকারগুলি কোটি কোটি অদক্ষ এবং স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকদের নিয়ে তেমন কোন ভাবনাচিন্তাই করেনিএই বিপুল মূল্যবান মানব সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো , রাজ্যে কাজ নেই তো অন্য রাজ্যে নিয়ে গিয়ে কাজে লাগানো , খানিক প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত ভাবে তৈরি করা আর সর্বোপরি এই নিরন্ন ক্ষুধার্থ মানুষগুলির মুখে দু'মুঠো ভাত তুলে দেবার জন্য তেমন কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা দেখা যায়নিনা খেতে পেয়ে পেয়ে নাঙ্গা কুকুর বেড়ালের মতো গ্রাম-ভারত নিজেরাই একটু একটু করে পথ খুঁজেছেপেটের জ্বালা চোখ-মুখ খুলে দেয় , ভুখা পেট কাজের লোককে ঠিক কাজ খুঁজে দেয়নিজেরাই নেটওয়ার্ক তৈরি করে ফেলেনিজের জেলা বা রাজ্যে কাজ নেই , তো চলো ভিন রাজ্যে ! সম্পূর্ণ নিজেদের উদ্যোগেই শ্রমিকশ্রেণী ভিনরাজ্যে যাওয়া শুরু করেরাজ্যগুলো জানেই না কত জন শ্রমিক ভিন রাজ্যে যাচ্ছে বা কেন্দ্রও জানেনা , দেশে কী পরিমাণ শ্রমিক আন্ত-রাজ্য চলাচল করছে

আমরা যারা গ্রামের ইস্কুলে মাস্টারি করি , মাঝে মাঝে দেখি টেন-ইলেভেন'এর  গুটিকয় ছাত্রের দীর্ঘ অনুপস্থিতি , ফর্ম-পূরণ বা পরীক্ষার আগে হঠাৎ উদয় ! জানা যায় এরা বাবা-কাকা বা প্রতিবেশীর সাথে 'টাওয়ারে খাটতে' যায়বাপ-কাকা'রা ভিনরাজ্য থেকে নিজের গ্রামে বছরে বার দুয়েক আসেখাটতে যায় দিল্লি  হরিয়ানা , গুজরাট , ব্যাঙ্গালোর , চেন্নাই , মুম্বাই , কেরালা... , যায় আরব আমীরসাহীতেও

২৫শে মার্চ রাত আটটায় চার ঘন্টার নোটিশে দেশব্যাপী লকডাউনআড়াই মাস ধরে দেশবাসী দেখল , এখনো দেখছে---এই ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের নিয়ে কী চলছে ! চার ঘন্টার বদলে অন্ততঃ চারদিনের নোটিসে ঘোষণা হলেও ফিরতে পারতো , কাজের জায়গাতেই রেখে দিয়ে রাষ্ট্র খাওয়াতে পারত , লকডাউনের পর পরই ওদের ফেরাতে পারত , টালবাহানা না করে রাজ্যগুলি ফেরানোর উদ্যোগ নিতে পারত , থুতু-জীবাণুনাশক না ছিটিয়ে একটু মানবিক হতে পারত , বাড়ি ফেরার টানে ট্রেন লাইন ধরে হাঁটতে হত না আর মরতে হত না , চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাজপথ ধরে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পথে ঢলে পড়তে হতো না , 'শ্রমিক স্পেশ্যাল' যখন চলতে শুরু করল সংক্রমণ তখন তীব্র , বাড়ি ফিরে প্রতিবেশীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হত না..। এই প্রশ্নগুলি এখনও ঘটমান বর্তমানপরিশেষে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরল , এখনও ফিরছেমাস তিনেক কাজ নেই , হাতে পয়সা নেই , গাঁয়ে কাজ নেই , রেশন নেইআছে আতঙ্ক , ছোয়াছুঁয়ি আর সন্দেহ ! বাড়ির লোকের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে পারছেনা , ভাইরাস থেকে বাঁচতে গেলে পুষ্টিকর খাবার লাগেশ্রমিকরা জানে , কোন খাবার খেলে শক্তি বাড়ে , প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়েএটা জানার জন্য শ্রমিকদের পুষ্টি বিজ্ঞান পড়ার দরকার হয় নাওড়িশা , আসাম পশ্চিমবঙ্গ , ঝাড়খন্ডে কাজ করা সব শ্রমিক এখনও নিজেদের গ্রামে ফিরতে পারেনিআগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের ফেরানোর নির্দেশ দিয়ে কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকে ভর্ৎসনা করেছে সুপ্রিমকোর্টঘরে ফেরা শ্রমিকদের কপালে ভাঁজ , হাতের স্মার্টফোনে আভাস পাচ্ছে করোনাকে ভর করেই মন্দা তীব্রতর হবে , কাজ পাওয়া যাবে না২০২০-২১ অর্থ বর্ষে দেশের জিডিপি উৎপাদন নেগেটিভ হবে , রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানিয়ে দিয়েছে আবার কি ফিরে যাবে ভিন রাজ্যে , কেউ কেউ তো এসে আবার ফিরেও গেল ! নিজের রাজ্যে থেকে গেলে , এখানে দশ জনের কাজে কুড়ি জনের ভাগ বসানো ! দেখা দিচ্ছে ছদ্মবেশী বেকারত্ব(disguised unemployment) আয় কমলে ক্রয় ক্ষমতা কমবে ফলে চাহিদা কমবে , চাহিদা কমে গেলে উৎপাদন কমবে উৎপাদন কম হলে শ্রমিকের প্রয়োজন চাহিদা কমবে , শ্রমিক বেকার থাকবে ! দারিদ্রের দুষ্ট চক্রের মধ্যে শ্রমিক আর অর্থনীতি পাক খেতে  থাকবে শ্রমিকদের চিন্তার শেষ নেই ! সাধে কি অর্থনীতিবিদরা বলছেন , গরীব মানুষের হাতে সরাসরি নগদ অর্থ পৌঁছাতে ! এদিকে সংক্রমণ বাড়ছে , ক্রমাগত বাড়ছে , মারাত্মকভাবে বাড়ছে ! বিশ্বে সংক্রমণ প্রায় পঁচাত্তর লক্ষ , ভারতে পৌনে তিন লক্ষ ছাড়িয়েছে এরই মধ্যে ছিটেফোঁটা ত্রাণও উড়ছে আর উড়ছে আকাশে শকুনের দল এই শকুনের দৃষ্টি ওই ক্ষুদ্র ত্রাণের দিকে---এই শকুনেরাই সামনের নির্বাচন-যজ্ঞে কাঠ ছড়াবে , ঘি ঢালবে !

 আশ্চর্যভাবে সারা দেশ দেখলো , কে বা কারা 'পরিযায়ী' তকমা এঁটে দিল আমাদেরই পড়শী এই শ্রমিকদের নামের আগে ! রাষ্ট্র , মিডিয়া , না কোন বুদ্ধিজীবী-ভাষাবিদ ? হয়ত ভেবেছিল , পায়ের তলায় থাকা এই গরীব হা-ভাতে হা-ঘরে ভিখারি-শ্রমিকদের না আছে জাত না আছে কুল ! তা শুনতে বেশ ভালো,  বেশ ভদ্র-ভদ্র , খানিক সম্মান-সম্মান , তাই 'পরিযায়ী' ! হ্যাঁ , শ্রমিকরা জাত কুল চায়না , তারা ভাত চায় তারা জানে , যে নামেই ডাকুক তারা আসলে 'শ্রমিক' মে দিবসের দিনে গর্বে বুক ফুলে ওঠে , দেশের বুনিয়াদ গড়ছে তারাই ! ইস্কুলে পড়া  ভাই-ভাইপো'দের কাছে পরিযায়ী পাখির কথা শুনেছে ! নিজেদের নামের আগে 'পরিযায়ী' কথাটা মোটেও ভালো লাগে না নিজেদের আরও খাটো মনে হয় কিছু বলেনা , নাম এদের লক্ষ্য নয় , লক্ষ্য এদের গরম ভাত ! আর 'পরিযায়ী' বদলে আমন্ত্রিত , ভ্রাম্যমাণ , অতিথি , সম্মানীয় বা বন্ডেড যা কিছুই বলুক এদের কিচ্ছু এসে যায়না ! এদের যে মনে প্রশ্ন জাগে না , তা নয় প্রশ্ন জাগে , রাজস্থান বা দিল্লির আইএএস'রা বাংলায় এলে তাদের কি পরিযায়ী বলে , না কর্ণাটক বা গুজরাটের লোক প্রধানমন্ত্রী হলে তাদেরকে পরিযায়ী বলে ?

সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারায় ভারতীয় নাগরিকদের জন্য কতগুলি সুস্পষ্ট অধিকারের কথা বলা আছে বলা আছে , ভারতীয় ভূখণ্ডে যে কোন নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার অধিকার রয়েছে , বসবাস করার অধিকার রয়েছে , রয়েছে স্বাধীনভাবে পেশা গ্রহণ করার অধিকার সকলেই ভারতীয় নাগরিক

বাধ্য হয়ে ভিন রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকেরা দেশের নাগরিক হয়েও আজ 'পরিযায়ী ' !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news