করোনা : তবে কি গোষ্ঠী সংক্রমণ ! - Newsbazar24
সাহিত্য

করোনা : তবে কি গোষ্ঠী সংক্রমণ !

করোনা : তবে কি গোষ্ঠী সংক্রমণ !

করোনা : তবে কি গোষ্ঠী সংক্রমণ !

সুনীলকুমার সরকার

 করোনা ভীতি-সংক্রমণের প্রথম দিকে ত্রস্ত মানুষ খানিক উদ্ভ্রান্ত । প্রচার মাধ্যম দেখাচ্ছে , উন্নত পরিকাঠামোর দেশগুলিতে মৃত্যু মিছিল । দুর্বল স্বাস্থ্য পরিষেবার ১৩০ কোটির দেশের নাগরিক আমরা ঠিক কী অবস্থায় আছি , সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভাবনা কী ,  কিভাবে এগোবো , কী হবে আমাদের আচরণ , খানিক অভিভাবকহীনতার অনুভূতি... এসব ভাবনা নিয়ে চোখ ফ্যাল ফ্যাল !        এবং তারপর তিনি এলেন । আস্থা ও বিশ্বাসে ভরপুর। এলেন প্রস্তুতি নিয়েই , যেমন আসেন । ধর্মগ্রন্থের কাহিনী ও বাণীসহ । লড়াকু স্থিতধী যোদ্ধা , ভরসা জাগানিয়া ক্যাপ্টেন স্পষ্টভাবে কেটে কেটে বললেন । ২২সে মার্চ জনতা কারফিউ এবং ২৫সে মার্চ থেকে লকডাউন ঘোষণার আগে যা বললেন , মোটামুটি এ রকম ---- মহাভারতের যুদ্ধ চলেছিল ১৮ দিন , অধর্মের পরাজয় হয়েছিল । আপনারা আমাকে ২১ দিন সময় দিন , এই করোনা-যুদ্ধে  জয়ী আমরাই হবো । শিহরিত আমরা , আশ্বস্তও হলাম , ২১ দিনে করোনা-চেন ভেঙে গেলেই ব্যাস , নিশ্চিন্ত ! আমরা সাধারণ মানুষ তাই জানলাম , শিখলাম । তিনিও তাই জেনেছিলেন , শিখেছিলেন । জেনেছিলেন তাঁর স্বাস্থ্য দপ্তর , পরামর্শদাতা এবং তাঁর  নেটওয়ার্ক ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে । এদিকে ইনি সব দায়িত্ব  কাঁধে নিয়ে নিজের হাতে খড়ি দিয়ে গন্ডী কাটলেন , সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং । কনুই দিয়ে হাঁচি-কাশি শেখালেন । ত্রানে হাত ছোঁয়ালেন  , বললেন---নিশ্চিন্তে থাকুন , বাড়িতে থাকুন , সুস্থ থাকুন , ভালো থাকুন । তাঁর সক্রিয়তা , ব্যস্ততা , স্নেহ-আন্তরিকতা আর শরীরী ভাষায় আমরা মুগ্ধ হয়েছি । ভরসা রেখেছি ।

দেশে সংক্রমণ  ও মৃত্যু দ্রুত বাড়ছে  । টেস্ট উপযুক্ত পরিমাণমতো হচ্ছেনা । টেস্ট বাড়লে পজিটিভ কেস আরও বাড়বে। এখন আবার প্রচলিত সিম্পটম ছাড়াই করোনা পজিটিভ হচ্ছে । ফ্রিজের খাবার থেকেও করোনার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। পজিটিভ রেজাল্টের মধ্যে বেশকিছু 'লোকাল কেস' ধরা পড়ছে , এই লোকাল কেসের মধ্যে বিদেশ যোগ বা ভিন রাজ্যের শ্রমিক যোগ নেই । উড়িষ্যাসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এ ধরণের পজিটিভ কেস পাওয়া যাচ্ছে । চীনসহ ভারতেও বাজার হাট থেকেও সংক্রামণ ছড়াচ্ছে । এইমস-এর ডাক্তারসহ বিশেষজ্ঞদের মতে , এটি গোষ্ঠী সংক্রমণের ইঙ্গিত । দেশে বর্তমান দৈনিক সংক্রমণ ১৫৫০০'রও  বেশী ।

ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের  স্বাস্থ্য পরিকাঠামো করোনা-যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারছেনা । নিউইয়র্কের মর্গে কর্মীর অকাল , কলেজ পড়ুয়ারা সেই কাজে যোগ দিয়েছেন । ভারতে এমনিতেই স্বাস্থক্ষেত্রে ব্যয়বরাদ্দ কম , ফলে স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম । করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর সাথে সাথে  ছোয়াছুঁয়িজনিত কুসংস্কারের ফলে কোথাও কোথাও ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের  ওপর শারীরিক ও সামাজিক অত্যাচার নেমে এসেছে । অত্যাচার এবং ভয়ে চাকরি ছেড়েছেন হাজার হাজার নার্স    ফ্রন্ট লাইনে কাজ করতে করতে কয়েক হাজার ডাক্তার-স্বাস্থকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন , স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সাময়িক কোয়ারান্টিনে । কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল সাময়িক বন্ধ হয়েছে । লাগাতার চাপ নিয়ে কাজ করার ফলে ডাক্তার স্বাস্থ্যকর্মীরা অবসাদে ভুগছেন । এই পরিস্থিতিতে ডাক্তারি পড়ুয়া ও নার্সিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের স্বল্পকালীন ট্রেনিং দিয়ে করোনা চিকিৎসায় নিযুক্ত করা হচ্ছে  । রিটায়ার্ড স্বাস্থকর্মীদেরও পুনর্বহাল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে । স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত ব্যাহত ।

আজ ২২শে জুন । জনতা কারফিউ-এর তিন মাস । জনতা কারফিউ-এর দিন , লকডাউন ঘোষণা'র দিন আর আজকের দিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যাটি নিচের টেবিলে দেখে নিই---

তারিখ       ভারত           .বঙ্গ

    আক্রান্ত    মৃত        আক্রান্ত    মৃত

২২/৩ - ৩৬১                       

২৫/ -  ৬১৮         ১৩         ১০         

২২/  -. লক্ষ   ১৩৫০০   ১৪০০০   ৫৬০

ভারতসহ বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশঃ খারাপের দিকে । এদিকে চূড়ান্ত বেকারিতে জর্জরিত আমেরিকাতে কাজ পাওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইন। ভারতে প্রায় পঞ্চাশ কোটি শ্রমিক কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন । করোনা কালে মানুষের ঘরে থাকার সময়েই ৪১টি কয়লা খনিসহ কিছু সরকারি ক্ষেত্র বিক্রির উদ্যোগ চলছে । সামনের দিনগুলি শ্রমিক-কর্মচারীদের চূড়ান্ত দূর্দশারই দিন ! দেশজুড়ে করোনা ত্রাণের  টাকা পকেটে ঢুকছে , আমফান ত্রাণে ঘর মেরামতির টাকা পাকা বাড়িতে ঢুকছে । ওদিকে করোনার মধ্যেই ১৫ই জুন চীন-ভারত সীমান্ত গালোয়ানে সংঘর্ষে ভারতবর্ষের ২০ জন সৈনিক শহীদ হলেন । ভারতবর্ষের সমস্ত রাজনৈতিক দল চীনের বিরুদ্ধে এককাট্টা । শহীদদের কফিনভর্তি মৃতদেহ নিজেদের গ্রামে ফিরলে হাজার হাজার শোকস্তব্ধ মানুষ জড়ো হয়েছেন , মাথা নুইয়েছেন । আবেগ সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং ভুলিয়েছে , ক্রমবর্ধমান সংক্রমন আরও বাড়বে না তো !

তাহলে আমাদের ভরসা দিয়ে রাষ্ট্রের চাওয়া , চাওয়ার পদ্ধতি , তাঁদের আত্মবিশ্বাস , নিশ্চিন্তকরণে কিছু কি ভুল ছিল ! নাকি লক্ষ্য ছিল , শান্তনা ! সুন্দর কথকতা ! আমরা তো বিশ্বাস করে আশ্বস্ত হয়েছিলাম । এখন কী করব ?  হত দরিদ্র মানুষ আর বেচে দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্মীদের না-খেতে পাওয়ার সাক্ষী থাকবো ,  চীন-ভারত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেব , না আগ্রাসী করোনা সংক্রমণের সঙ্গে লড়ব !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

                            -----------------------

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news