করোনা : ছন্দ নেই , তবুও এসো মা ! - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : ছন্দ নেই , তবুও এসো মা !

করোনা : ছন্দ নেই , তবুও এসো মা !

করোনা : ছন্দ নেই , তবুও এসো মা !

সুনীলকুমার সরকার

না , করোনার ভয়ে নয় মানুষের করোনা-ভয় অনেক কমেছে কমাটা ঠিক না ভুল তা সময় বলবে করোনা আচরণবিধি মানায় শিথিলতা এসেছে মানুষ জেনেছে , বর্তমানে মৃত্যুর  হার ২শতাংশের কম আক্রান্ত হলেও সাধারণ ওষুধেই যেন ভালো হয়ে যাচ্ছে , যাদের অন্য অসুখ গুরুতর , তাদেরই সমস্যাএকটা ক্যাজুয়াল মনোভাব এসেছে স্বাভাবিক ইম্যুনিটির কারণেই হোক বা যেকোনো কারণেই হোক  গ্রামাঞ্চলে সংক্রমণ কম , প্রায় কারও মুখেই মাস্ক নেই ,শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার বালাই বিধি নেই শহরাঞ্চলে কিছুটা কড়াকড়ি , ফলে শহরের মানুষ এবং যারা গ্রাম থেকে কাজে আসছে , মাস্ক পড়ছে অবশ্যই সচেতন ভীতু(?) মানুষ উপযুক্ত আচরণবিধি মেনে চলছে

  সদা ব্যস্ত পোষ্ট অফিস মোড় , ম্যাডক্স স্কয়ার বা চৌপথিগুলি পুজোর সন্ধ্যেগুলোতে গাড়িঘোড়াশূন্য হয়ে যায় , যেন সম্বৎসরের অপেক্ষা মানুষকে আলিঙ্গন করবে বলে, মানুষ হাঁটবে বলে , গল্প-আড্ডা দেবে বলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম থেকে প্রত্যেকেই আনন্দের শেষ বিন্দুটিকেও তুলে নিতে চায়  গ্রাম , গ্রামান্তর , শহরতলি থেকে আসা খানিক সস্তার জামাকাপড় পড়া মানুষের পায়ে পা মেলায় কোটিপতিও সমস্ত স্তরের  মানুষ নেমে আসে এই মিলন মেলায় চেনা-অচেনা মানুষের গায়ে গা ঠেকে অজান্তেই , থাকেনা ছ্যুৎমার্গিতা বা উঁচু-নিচু কিছু দূর গ্রাম থেকে যারা আসতে পারে না তারা গ্রামের চন্ডী মণ্ডপ বা নাট মন্দিরেই বসে বসে দরিদ্র শরীরে নতুন জামা গলিয়ে , দাড়ি কেটে মহিলারা ছাপা কাপড় আর মাথায় তেল সিঁদুর দিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ধুনোর গন্ধে আর হাত জোড় করে নমো করায় আস্তিকতা , ভক্তি বা আধ্যাত্মিকতা কতটা থাকে জানিনা , কিন্তু যেটা থাকে উৎসবের সুরে সুর মেলানোর উদযাপন-ছন্দ এক হওয়ার অঙ্গীকার সারা বছর ধরেই গরীব বড়লোক একটু একটু করে সঞ্চয় করে আর শারদোৎসবের দিকে তাকিয়ে থাকে

উজ্জ্বল ঝকঝকে রোদের সঙ্গে কাশ-শিউলির মন উদাস করা ঢেউয়ে 'পুজো আসছে' গন্ধ থাকে বাঙালির মনে পুজোর আর মাস খানেক বাকি , এবার দুই বাংলার বাঙালী-মনেই মেঘের ঘনঘটা পুজোর সেই ঘ্রাণ এবার যেন নেই ! ওপার বাংলায় শুরু হয়েছে গোষ্ঠী সংক্রমণ ! করোনা কি এবার সোনালী রোদকেও কেড়ে নিল , মাস ধরে এত কালো ঘন মেঘ ! উত্তর থেকে দক্ষিণে খামখেয়ালি বৃষ্টিপনা ! হয়ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও কাশফুল ফুটে থাকবে , কজনই-বা এবার তা দেখার ফুরসৎ পেয়েছে ! একটু একটু করে মন তৈরি হওয়ার সঙ্গে পাড়া-মণ্ডপের সেজে ওঠা , সমস্ত বাজারেই ভিড় তা কাপড়ের হোক , ডাল-ময়দা-গুড় হোক বা ঘড়ি-সোনা' হোক আবহমান মেতে ওঠার আগের যে প্রস্তুতি-পূর্বরাগ তা এবার টের পাওয়া যাচ্ছেনা !

না , করোনার ভয়ে টের পাওয়া যাচ্ছে না , তা নয় সামিল হওয়ার মন যে নেই , তাও নয় আনন্দে মাততে গেলে আরও কিছু যে লাগে ! সম্বৎসর বাঙালি অপেক্ষায় থাকে , আর ভারতবাসী তাকিয়ে থাকে, শারদোৎসবে মাতোয়ারা বাঙালির দিকে এবার আবার পঞ্জিকার গণনায় পুজো একমাস পিছিয়ে

 বাঙালির উৎসব তো শুরু হয়ে যায় সেই বিশ্বকর্মা পুজো থেকেই কিন্তু বিশ্বকর্মা পুজোর সেই জৌলুস এবার কোথায় গেল ! গত বছরও জেলার গ্যারেজগুলিতে , রিক্সা-ট্যাক্সি-ট্রাক-ভ্যান স্ট্যান্ডগুলিতে, ছোট ছোট কারখানাতেও বড় করে পুজো হতো , প্যান্ডেল হতো ,হৈ হৈ গান হতো কয়েক বছর আগেও রাজ্যের কলকারখানাগুলিতে বড় প্যান্ডেল , বক্স বাজিয়ে গান , কারখানার শ্রমিকেরা বউ ছেলেমেয়েকে নিয়ে কারখানায় আসতো , নতুন জামা কাপড় পড়ে , দুবেলা পাত পেড়ে খাওয়া দাওয়া ,গল্প-আড্ডা এবার টুনিবাল্ব-টিউবলাইটের  ছড়াছড়ি নেই বাজার লাগোয়া গড়ে ওঠা প্রতিমার বাজার , পালপাড়া বা কুমোরটুলিতে প্রতিমার চাহিদা নেই , মাইক-প্যান্ডেল ব্যবসায়ীদের শুকনো মুখ সাধ করে বাঙালি ঘুড়ি ওড়াতো , এবার আকাশে  ঘুড়ির ভোকাট্টা খেলা জমলো কই , ঘুড়ি-শিল্পী আর ব্যবসায়ীদের কি অবস্থা কে জানে ! বিশ্বকর্মা নিঃশব্দেই বিদায় নিলেন

এতদিনে পুজোয় বেড়াতে যাওয়ার টিকিট বুকিং , হোটেল বুকিং প্রায় শেষ হয়ে যেত বাঙালিকে তো বেড়াতেই হবে , ১৪ দিনের উত্তর ভারত তো ১৫ দিনের দক্ষিণ ভারত , গোয়া না রাজস্থান ! আবার কেউ সিঙ্গাপুর , পাটায়া নিদেনপক্ষে , পুরী-দার্জিলিঙ , দিঘা-ডুয়ার্স ট্যুরিস্ট স্পটে গাড়ি ব্যবসায়ীদের ছুটোছুটি ব্যস্ততা , সেখানের স্টল-ফুটপাতও মাল মজুত করে রাখে , বাঙালি আবার বেড়াতে গিয়ে কেনেও এবার বাঙালির বেড়ানো-ব্যস্ততা নেই , পুজোকে ঘিরে সমস্ত মানুষের হাতে টাকা ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই , সরকারি কর্মচারী সমাজের আর কতটুকুই-বা অংশ ! পুজোর কেনাকাটায় বাজারে ভিড় নেই , ফুচকা-চপওয়ালারা কোনদিন দোকান খোলে , কোনদিন খোলে না , বাজার শেষে সপরিবারে রেস্টুরেন্টে যাওয়া নেই , রাস্তায় রিক্সা-টোটো , অটো-ট্যাক্সির গতি নেই হকার , ফুটপাত ব্যবসায়ীরাও এই সময় সারা বছরের আয়ের একটা বড় অংশ তুলে নেয় রাজমহল রোড , হাতিবাগান , গড়িয়াহাট বা শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটের ফুটপাত ব্যবসায়ীরা পথচলতি মানুষের মুখের দিকে তাকায় , খদ্দের ভেবে এবার 'জনই বা কিনবে পুজোয় চাই নতুন জুতো ! মানুষের হাতে টাকা কই ?

বিশ্বকর্মার দিনেই মহালয়া হয়ে গেল পঞ্জিকা মেনেইকিন্তু রাতভর পিকনিকের ধুম ছিলনা ভোরবেলা বাঙালি শুনলো , জাগো দূর্গা দূর্গতিনাশিনি.... কিন্তু দূর্গতি যে চেপে বসছে ! এতদিনে বড় বড় প্যান্ডেলগুলির কাছ থেকে  চন্দননগরের আলোর ব্যবসায়ীদের হাতে বরাতের টাকা পৌঁছে যায় পুজোর জাঁকজমকের জন্য স্পনসর কোথায় ? পুজোকমিটির স্যুভেনির তৈরির মিটিং হয়ে যায় , ছাপানোর জন্য 'আমার পুজো' বা চারটে কবিতাও না হয় জুটে যাবে কিন্তু বিজ্ঞাপন দেবার ব্যবসায়ী কোথায় ? ছোট বড় ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ খরচ করছে না , মানুষ কেনাকাটা করছে না মানুষের ভাবনা ---টাকা শেষ হয়ে গেলে খাবে কী !

এভাবেই আসবে ধনং দেহী , লক্ষীপুজো অলক্ষীর এই সময়ে সবই তো বন্ধ , টাকা কোথায় ! আসবে দীপাবলি কে প্রদীপ কিনবে , কিনবে টুনি বাল্ব ! ফুলঝুরি আর বাজি পোড়াবে , টাকা কোথায় ! আকাশে উঠে হাজার তারা হয়ে যাওয়া বাজিগুলি ফাটবে কী ভাবে ! ফুলঝুরি আর বাজি-পাড়া থেকে খবর আসছে , তাদের হাতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল নেই

পরিসংখ্যান বলছে , যাদের চাকরি ছিল তাদের মধ্যে ৩৬ শতাংশের চাকরি চলে গেছে , যারা চাকরিতে আছে তাদের ৪৩ শতাংশের মাইনে কমেছে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী যাদের বয়স ৫৫ বছর হয়েছে , যে কোন সময় স্বেচ্ছাবসর নিতে হতে পারে ব্যাঙ্কগুলি বেসরকারিকরণের পথে , কর্মী সংকোচন রেলে দেড় লক্ষ শূন্যপদ , তবুও ছাঁটাই , ৫০ শতাংশ পদের বিলোপ চাইছে , অংশতঃ বেসরকারিকরণ হয়েই গেছে ! আর রাজ্যে রাজ্যে ঘোষণা হয়েছে---চাকরী মানে , চাকরীর নিশ্চয়তা ভুলে যান !  ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া কতজন শ্রমিক আর সাধারণ মানুষের কাজ চলে গেছে তা সরকার জানেনা সংখ্যাটা এতই বড় যে , তা কাউন্ট করার দায় কেউ নিতে চাইছে না , না কেন্দ্র না রাজ্য !

 কয়েক বছরে ধরে দেশে প্রায় ছয় কোটি ক্ষুদ্র ,কুটির  শিল্প রুগ্ন হয়েছে , কোটি কোটি শ্রমিকের জীবন-জীবিকা মৃত্যুর মুখে এই শিল্পগুলি কর্মসংস্থান দেয় দেশের ৪৩ শতাংশ আর জিডিপি দেয় ৩০ শতাংশ উৎপাদন কমেই চলেছে ,চলেছে অর্থনীতিতে পতন চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকের শেষে জিডিপি বৃদ্ধি (মাইনাস )২৪ শতাংশ অর্থাৎ অধোগতি ! দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক শেষ হবে   ৩০শে সেপ্টেম্বর  , উৎপাদন বৃদ্ধির কোন লক্ষণ নেই ! রিজার্ভ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন'এর মতে---এই পতন চলছিলই , করোনা শুধু ত্বরান্বিত করেছে মাত্র ভুল শুধরে এখনই সদর্থক পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে রুগ্ন শিল্পগুলিকে প্রয়োজনীয় অর্থ এখনই তুলে দেওয়া দরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দাবি তুলেছে ,  কর্মহীন গরীব মানুষের হাতে মাসে মাসে ৭৫০০ টাকা তুলে দেওয়া হোক কিন্তু টাকা দেবে কে ? কেন্দ্র রাজ্য উভয় সরকারই নাকি ধার করে চলছে !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

                            -----------------------

 

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news