করোনা : ক্ষুধার চেয়ে করোনা'ই ভালো - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : ক্ষুধার চেয়ে করোনা'ই ভালো

করোনা : ক্ষুধার  চেয়ে করোনা'ই ভালো

 

করোনা : ক্ষুধার  চেয়ে করোনা'ই ভালো

সুনীলকুমার সরকার

নিরন্ন মানুষের হেঁটে চলা দেশের মানুষ দেখেছে । বোঁচকা-থলে নিয়ে কোটি কোটি মানুষের মিছিল , ঘরমুখী মিছিল । ফোস্কা পড়া পায়ে হাঁটতে হাঁটতে কিছু শ্রমিক মরলো আর মরতে মরতে বাকিরা বাড়ি এলো , বাড়ি গেল । হাজারো কিলোমিটার  হাঁটা  ক্ষুধার্থ মানুষগুলির নির্যাতন , মানুষের দ্বারা মানুষের নির্যাতন , দেশের মানুষ দেখল । দেশের মধ্যেই ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া এই শ্রমিকদের 'পরিযায়ী শ্রমিক' তকমা এঁটে দিয়েছে সরকার , প্রশাসন , সংবাদ মাধ্যম । এই 'পরিযায়ী'দের জন্য ,  নিজেদের গাঁয়ে ফিরে স্থানীয় এলাকাতেই কাজ পাওয়ার প্যাকেজও ঘোষণা করেছে সরকার ।

কষ্টকর বাড়ি ফেরার পথে তাঁরা ভেবেছিল , আর ভিনরাজ্যের নরকে যাবে না , মরবে বাঁচবে নিজের গাঁয়েই থাকবে ! বাড়ি ফিরে হপ্তা দু'একের মধ্যেই বুঝে গেছিল , এখানে তাঁদের ভাত জুটবে না । গাঁয়ের ভাই-বন্ধু-পরিজন শ্রমিকেরা সহানুভূতি দেখালেও আড়ালে চোখ কুঁচকে ছিল , তাহলে এবার এখানকার কাজে ভাগ বসাবে এরা !

করোনা এখনও তীব্র । এখন দেশে সংক্রমন সাড়ে পাঁচ লক্ষের  কাছাকাছি , মৃত সাড়ে ষোল হাজার আর  দৈনিক সংক্রমণ কুড়ি হাজার । জুলাই-এ কমতে পারে , বাজারের খবর এরকমই । কমলেও কি এখানে কাজ পাওয়া যাবে ! বিশেষজ্ঞরা বলছে , করোনাকে সঙ্গে নিয়েই ভবিষ্যতে বাঁচতে হবে , করোনা নিত্যসঙ্গী হয়েই থাকবে । কিন্তু ভয় কি আর পেটের জ্বালা মানে , খিদে কি আর বারণ শোনে , পেটকে কি বোঝানো যায় ? গুরুগ্রাম , দিল্লি , মুম্বাই থেকে ফিরে আসা মালদার কিছু শ্রমিক আবার রওনা  দিয়েছে , রওনা দিয়েছে সেই পুরোনো জায়গাতেই , কাজের খোঁজে ভিনরাজ্যে ,  'করোনা স্পেশাল' এর ফিরতি ট্রেনেই । ভিনরাজ্য থেকে উত্তরপ্রদেশে ফেরা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কিছু অংশ আবার ফিরে যাচ্ছে কাজের খোঁজে । গোরক্ষপুর স্টেশন থেকে মুম্বাই , গুজরাট , কলকাতার ট্রেন ছাড়ে । শ্রমিকেরা জড়ো হচ্ছে স্টেশনে---লক্ষ্য , স্পেশ্যাল ট্রেন অথবা যে ট্রেন পাবে সেই ট্রেনই ! ফিরে যাবে সেই রাজ্যগুলিতেই , ভাতের খোঁজে । একই অবস্থা রায়গঞ্জে ফিরে আসা শ্রমিকদের । লকডাউন উঠলে আনলক-১'এর শুরুর দিকে কিছু শ্রমিক পরিবারসহ রওনা দিতে শুরু করে , ভিনরাজ্যে নিশ্চিত কাজের জায়গাতেই ! আর এখন তো যাচ্ছেই । পরিবারসহ । মহিলারা নিজেদের অস্থায়ী সংসারের রান্নাসহ গৃহস্থালি করবে । নিজেদের পরিবারের খাওয়াসহ সংসার-খরচ কমবে । আধবেলা শ্রমিকের কাজও করবে , জুটবে কিছু মজুরীও । ছোটরা সাইটে কাজ করা মজুরদের জল খাওয়ানোর কাজ করে । শিশু শ্রমিক । মজুরী অনেকটাই কম । সবাই মিলে কাজ ক'রে , আয় ক'রে , পুষিয়ে যায় , খানিক সঞ্চয়ও । তো , গাড়ি চলছে না বা সব ট্রেন চালু হয়নি তো কী হয়েছে , মোটরগাড়ি ভাড়া করেই রওনা দেয় , কোনো স্টেশনে  ট্রেন পেলেই উঠে পড়বে , সঙ্গে চাল- ডাল-হাঁড়ি-পাতিল তো আছেই ! যে ফার্ম বা কোম্পানিতে কাজ করত সেগুলি সব খোলেওনি , যদি অন্য সংস্থায় কাজ মেলে , সেই আশায় রওনা দেওয়া । পেটের দায় শিখিয়ে দিয়েছে-- দাঁতে দাঁত চেপে , চোখে চোখ রেখেই লড়তে হবে করোনার সঙ্গে ! বাঁচার লড়াইয়ে নতুন করে ঘুরে যে  দাঁড়াতেই হবে, এবং দাঁড়াতে হবে নিজেদেরকেই ! পেটের জ্বালায় লড়তে লড়তে একদিন তো মরণ হবেই , হোক না সে করোনা'তেই !

ঘোষণা তো হয়েছিল । নিজের এলাকাতেই সুনিশ্চিত কাজ , অন্ততঃ তিনমাস একশো দিনের কাজ , কার্ড না থাকলেও বিনে পয়সায় রেশন। ভিনরাজ্যে আবার কাজে গেলে সাবসিডাইজড বাড়ি ভাড়া , বাড়িগুলি তৈরি হবে পিপিই মডেলে । কার্ড যে রাজ্যেরই হোক  রেশন পাবে সবখান থেকেই , ওযান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড । ছন্দ মেলানো কথা ! ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের ৬৭ কোটি শ্রমিক উপকৃত হবে এই প্যাকেজে । হাজার হাজার কোটি টাকার এই প্যাকেজ । শ্রমিকরা বোঝে না , জানেনা , তাঁদের মাথার ওপর দিয়েই যায় , 'টা শূন্য বসালে তবে হাজার হাজার কোটি হয় !

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

                 ------------------------------

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news