করোনা : উৎসবের পরে বড় ঢেউ ! - Newsbazar24
বিশেষ প্রতিবেদন

করোনা : উৎসবের পরে বড় ঢেউ !

করোনা : উৎসবের পরে বড় ঢেউ !

 

 করোনা : উৎসবের পরে বড় ঢেউ !

সুনীলকুমার সরকার

দুর্গাপূজা নিয়ে কোন তাপ উত্তাপ নেই সরলা'দের । কোনও বারই থাকেনা। পাঁচগ্রাম থেকে সোজা হেঁটে গেলে বলাশপুরে সম্পন্ন পৌন্ড্রদের গ্রাম। চন্ডী মণ্ডপের সঙ্গে সামনের দিকে সামিয়ানা খাটিয়ে বড় উৎসব-প্যান্ডেল তৈরি হয় । তুঁতজমির  তদারকির কাজ ক'দিন বন্ধ রেখে মোড়লরা পুজোয় মাতে।গ্রামের পর মাঠের ওপাশে দশ ঘর মাল'দের বাস । পুজোর দিনগুলিতেও মাল'রা তুঁত নিরানির কাজে যায় , পূজার পর মোড়লদের বাড়ি থেকে মজুরি নিয়ে আসে। মজুরী না পেলে খাবে কী ! পাঁচ দিনের পূজায় সরলা'রা একদিন মাঠ ফেরত চন্ডীমণ্ডপ ঘুরে আসে । ঝুড়ি , খুরপি , নিরান-পাসনি নিয়েই , হলুদ বরণ দুগ্গা দেখে আসে , খুরপি-পাসনি হাতেই একবার কপালে হাত ঠেকায়। দুগ্গার গায়ের রঙের সঙ্গে এদের গায়ের রঙের মিল নেই , সেজন্যই হয়ত কপালে হাত ঠেকায় ! এই কদিন এদের বাচ্চাগুলো মণ্ডপের সামনে খেলে , আদুর গায়েই। পূজার পরে হপ্তা নিতে গেলে , মোড়ল-বউ দাওয়ায় বসিয়ে থালা ভর্তি মুড়ি ও মুড়ির মোয়া দেয়। খেতে খেতেই ঘরে চলতে থাকা টিভির দিকে চোখ যায়। টিভির ছবিগুলো বলাশপুরের ছবির সঙ্গে মিল খায় না । সরলারা জানে এই ছবিগুলো টাউন বাজারের। এ ছবি কোনও ছাপ ফেলেনা , এদের জীবনে। এরা জানে , টিভির কাঁচের বাইরে এদেশের মধ্যে অনেকগুলো দেশ আছে ---গরীব মানুষের দেশ , না খেতে পাওয়াদের দেশ, ন্যাংটো-শরীর বাচ্চাদের দেশ , মাল-লেট-হাড়ি'দের দেশ , চিকিৎসা না পাওয়াদের দেশ । আর টিভিতে আছে উৎসবের দেশ ,করোনা ভয়ে কাঁপা বড়লোকদের দেশ , ফিল্মি জগতে গাঁজা খাওয়াদের দেশ ! সরলারা ভাবে , এত হৈচৈ-এর যে কী আছে , শীতলা পূজাতে এদের গাঁ-ঘরের পুরুষেরাও তো হাঁড়িয়া খায় , মহুয়া খায় ! আবার হাট থেকে চাল , ডাল , আলুও তো কিনে আনে!

শুধু টিভি স্ক্রিনের বাইরের ধূসর-ফ্যাকাসে দেশ-জগতের  কথা ভেবে খানিক আহা উহু , রোমান্টিকতা আনলে চলবে ! কে না চায় , বছরের গ্লানি মুছে উৎসব-আনন্দে মাততে ! ইতিমধ্যেই বাঙালি ভাবতে শুরু করেছে , নিউ নর্মালে কী কী প্রোটেকশন নিয়ে উৎসবের পুরো আনন্দ তুলে নেওয়া যায়! শুধু একটা নির্দিষ্ট জুতোর দোকানের ভিড়ের ছবি ভাইরাল হলেই হলো ! হাজারো না ভাইরাল হওয়া ছবি নিত্য তৈরি হচ্ছে পথে , ঘাটে ,বাজার, মল ,ফুটপাথে , পরিবহনে! শুধু ম্যাচিং মাস্ক কেনার জন্যেই এ বাজার থেকে সে বাজার ! কেনাকাটা তো সেরে নিই , পুজোর সময় মণ্ডপে মাস্ক পড়ে একটু সোশ্যাল ডিস্টানসিং করে নিলেই হবে ! এদিকে কিছুটা অনারম্বর বিশ্বকর্মা পূজা ও মহালয়া উদযাপন হলেও , উদযাপনের পর থেকেই সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে  বাড়তে শুরু করেছে রাজ্যে । এখন প্রতিদিন আগের দিনের রেকর্ড ভাঙছে , ভাঙছে মৃত্যতে , কোমর্বিডিটি মৃত্যতেও ! ভিড়-ভাট্টার এই 'পুজোর বাজার'। এই কোভিড লড়াইয়ে কেরালা বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছিল। সেই কেরালায় সম্প্রতি ওনাম উৎসবের পর সংক্রমণ বাড়ছে দ্রুত গতিতে , মৃত্যুও । সরকারি নির্দেশ থাকলেও উৎসব প্রিয় মানুষ মেতে উঠেছিল। অপরদিকে মুম্বাইয়ে গণেশ চতুর্থীর আগে মানুষের কেনাকাটার বহর দেখে চমকে উঠেছিল দেশের মানুষ। প্রশাসনের টনক নড়ে। প্রশাসনের নির্দেশে মন্দিরে মন্দিরে ভিড় না করে অনলাইনে পুজোর ব্যবস্থা হয় । সেখানে সংক্রমণ এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে।

ইউরোপে আনলক পর্ব শুরু হতেই সংক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়েছে । দেশে দেশে নতুন করে লকডাউন ঘোষণা হচ্ছে। ফ্রান্সের পাঁচটি শহরে নতুন করে ক্যাফে , বার , রেস্তোরাঁ বন্ধ করা হয়েছে। ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সমস্ত পাবলিক ফেস্টিভ্যাল বন্ধ রেখেছে জার্মানি। আনলক পর্বে তুরস্কে বিয়ের হিড়িক উঠেছিল , বিয়ের অনুষ্ঠানগুলি থেকে সংক্রমণেরও হিড়িক! টেষ্ট ,ট্রেস এবং আইসোলেসনের মধ্যদিয়ে সংক্রমণ রোধ করে বিশ্বের কাছে মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া , কিন্তু চার্চ আর জুম্বা ড্যান্স খুলে দেওয়ায় সংক্রমণের বড় ঢেউ শুরু হয়েছে সে দেশে। স্পেন ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াই বাতিল করেছে । বার্সিলোনায় বিচ পার্টি , স্ট্রিট পার্টি , নাইট ক্লাব নতুন করে বন্ধ করা হয়েছে। আমেরিকায় এবার বারোয়ারি দুর্গোৎসব হচ্ছেনা , একদিকে শোক অপরদিকে সংক্রমণের ভয় !

এই আর্থিক আকালের সময়ে বাজারের ভিড় আর  কেনাকাটা অর্থনীতিতে কিছুটা গতি হয়ত দেবে কিন্তু কাজ কেড়ে নেওয়া লকডাউনে গরীব মানুষ সর্বশান্ত ! আছে শ্রমিকের মৃত্যু ও আত্মহত্যা !  অর্থনীতিতে সার্বিক অধোগতি ক্রমবর্ধমান। বেশিরভাগ ক্লাব ও সর্বজনীনগুলি ঠিক করেই নিয়েছিল এই আর্থিক সংকটে দুর্গোৎসব নমো নমো করেই সাড়বে , মানুষের হাতে পয়সা নেই ! কিছু পুজো কমিটি ঠিক করেই রেখেছে, মণ্ডপে পুরোহিত মাইকে মন্ত্র উচ্চারণ করবে এবং সাধারণ মানুষ বাড়িতে থেকেই পুজো-অঞ্জলি দেবে। সাধারণ মানুষ বেশ মেনেই নিয়েছে , যেমন রাজ্যের মানুষই মহরম-ঈদ এবং পয়লা বৈশাখ ঘরে বসেই পালন করেছে । উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

কিন্তু উৎসব প্রিয় রাজ্যে দুর্গোৎসব ম্যারম্যারে হবে , এটা যেন ঠিক মেনে নেওয়া যায়না ! অর্থের অভাবে উৎসব হবে না ! রাজ্যের ৩৭ হাজার ক্লাব ৫০ হাজার করে টাকা পাচ্ছে ! এই আর্থিক সঙ্কটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ যেন না আসে , তবে উৎসবটাও তো করতে হবে ! প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের কাছে চাঁদা নেওয়া হবে না ! শুরু হয়ে গেছে মানুষের মন ও আচরণে সাজো সাজ রব। মধ্যবিত্ত মাস্ক খুলে দিয়ে হামলে পড়েছে বাজারে ! যদিও উৎসব পালনের জন্য আচরণবিধি ঘোষিত হয়েছে । কতটা লাগু আর পালিত হবে , সংশয় রয়েছে। আর দশ দিন পরেই শুরু হচ্ছে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব! কী হতে যাচ্ছে , কে জানে! ইতিমধ্যেই রাজ্যে সংক্রমণ ৩ লক্ষ'র দিকে , মৃত্যু ৬ হাজারের দিকে। দেশে সংক্রমণ ৭১  লক্ষ আর মৃত্যু ১ লক্ষ ছাড়িয়েছে । বিশ্বে সংক্রমণ পৌনে ৪ কোটি আর মৃত্যু ১১ লক্ষের কাছাকাছি।  এদিকে শারদোৎসবের গায়ে গায়েই দশেরা , দিওয়ালি , নবরাত্রি। জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জনতার মাঝে উৎসবে সামিল হলে , মানুষ তাঁদের কাছে , ক্ষমতার কাছে যাবেই। উৎসবমুখর মানুষ ভিড়ে সামিল হবেই। যেন  সংক্রমণও থাকবে আর উৎসবও চলবে ! ডাক্তার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সিঁদুরে মেঘ দেখছেন । তাঁরা বার বার প্রশাসনকে সতর্ক করছেন। তাঁদের মতে , যেভাবে চলছে উৎসবের পরেই সংক্রমণে সুনামি আসতে চলেছে! এসব দেখে , জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জর্জ সিমেল-এর কথাই মনে আসছে---উৎসব হলো মানুষের জীবনযন্ত্রনা ভুলিয়ে দেবার কার্যকরী হাতিয়ার , Festival is playform of politics !

সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই তথ্য , রাষ্ট্রের ভূমিকা আর আতঙ্কের কথা মাল পাড়ার সরলারা জানেনা। তারা দেখে এসেছে , গ্রামের পুরুষেরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই সাপের কামড়ে মারা যায় , দেশি মদে বিষ ক্রিয়ায় মারা যায় , কখনও পেট ফুলে ঘুমের ঘোরেই মারা যায়। পুরুষরা মরে গেলে পুরো সংসারের ঘানি এসে পড়ে বউ-ঝিদের ওপর মা কাকীদের দেখে এটাই শিখেছে। সংসার এভাবেই চলে!

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

                            -----------------------

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news