করোনা : যুক্তিবাদে উত্তরণ দেখা যাচ্ছে - Newsbazar24
সাহিত্য

করোনা : যুক্তিবাদে উত্তরণ দেখা যাচ্ছে

করোনা :  যুক্তিবাদে উত্তরণ দেখা যাচ্ছে

 

করোনা :যুক্তিবাদে উত্তরণ দেখা যাচ্ছে

সুনীলকুমার সরকার

নতুন করে লকডাউন হবে কিনা , তা নিয়ে চলছে জোর জল্পনা অবশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যেই আমরাই নিজেদের মতো করে ভেবে নিচ্ছি যখন দেশব্যাপী লকডাউন চলছিল , মানুষ কম-বেশী বেরোচ্ছিল , এখনকার আনলক পর্বেও নির্দিষ্ট আচরণ বিধি না মেনে জীবন প্রায় স্বাভাবিক ! পুণরায় লকডাউন হলে যে মানুষ মানবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই , বিগত তিনমাসে আমাদের আচরণ-ব্যবহার তা দেখিয়ে দিয়েছে , আর সরকারও যে কঠোরভাবে লকডাউন করবে বা করতে পারবে তার নিদর্শণ বিগত লকডাউন পর্বে দেখা যায় নি ! এখন আমদের কাজ হয়েছে সংক্রমণের সংখ্যা জানা , আমি বিপদে নেই তো নিশ্চিত হওয়া , লকডাউন , আনলক নিয়ে আলোচনা করা , একটু টেনশন টেনশন ভাব করা , কোন দেশের কতজন মারা গেছে তা নিয়ে আলোচনা করা আর মধ্যবিত্ত দিব্য বাজার হাট আর যা যা করার তা করছে ! 'দিন বিখ্যাত এক ফিল্মস্টারের অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে শোকগাথা আর বিশ্লেষণ এখন চীন-ভারত বর্ডার ক্ল্যাশ যখনই দেশে কোনও ইন্টারনাল ক্রাইসিস বা নির্বাচন আসে , কি জানি কীভাবে বর্ডারে একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ব্যাপার চলে আসে !  এদিকে গোকুলে চূড়ান্তভাবে বাড়ছে করোনা !  দেশে এবং আমাদের রাজ্যে সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ক্রমাগত দেশে সংখ্যাটি তিন লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার ছাড়িয়েছে এবং রাজ্যে বারো হাজার মৃত্যুর নিরিখে ভারত এখন বিশ্বে নবম আর সংক্রমণের নিরিখে চতুর্থ আমরা জেনে গেছি করোনা অচিরেই মুক্তি দেবেনা , দীর্ঘদিন সহবাস চলবে সাধারণ মানুষের জন্য , করোনা আচরণবিধি মানা এবং ইমিউনিটি বাড়ানোই হলো করোনা প্রতিরোধের উপায় মানুষ বিজ্ঞানটা মোটামুটি জেনে গেছে , বাড়ির বাইরে গেলে ত্রিস্তরিও মাস্ক পড়তে হবে , ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে , স্যানিটাইজার , ফিজিক্যাল ডিস্ট্যানসিং অন্তত দু মিটার , মাস গ্যাদারিং বন্ধ... 

এলাকায় কারও করোনা রিপোর্ট পজিটিভ হলেই হাসপাতাল কর্তপক্ষ , এম্বুলেন্স , দু ভ্যান পুলিশ তো সাংবাদিক সব হাজির ! বাড়ি ঘিরে ফেলার জোগাড় যেন পাঁচিল টপকে পালাতে না পারে ! যেন উগ্রপন্থী লুকিয়ে আছে চৌকির তলায় , বা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে চার্লস শোভরাজ কি লাদেন কি বিজয় মাল্য , কী গূঢ় অপকর্মই না করে ফেলেছে বাড়ির মানুষ ! আপাত সুস্থ পজিটিভ রুগীকে নিয়ে কোভিড হাসপাতাল আর বাড়ির সবাইকে নিয়ে গিয়ে কোন কোয়ারান্টিন সেন্টার অথবা নিশ্ছিদ্র হোম কোয়ারান্টিন ! বাড়ির সামনে , রাস্তার মোড়ে পুলিস পিকেট প্রতিবেশীরা সেই পথ আর মারাচ্ছে না , এক লহমায় বাড়িটি সমাজ চোখে আর প্রশাসনের আচরণে যেন অছ্যুৎ হয়ে গেল !  

তবে করোনা নিয়ে ছোয়াছুঁয়ির আতঙ্ক থাকলেও বিজ্ঞান সম্মত সাবধানতা অবলম্বনে ঝোঁক বাড়ছে আর আগের মতো করোনা আক্রান্ত পরিবারকে তেমনভাবে একঘরে করছেনা , এটাও সত্যি মানুষ ঠেকে শিখতে শুরু করেছে--- কুসংস্কারি ভাবনা , আচরণ বা  পূজাপাঠ জীবাণুর  প্রতিরোধ বা প্রতিষেধকে কাজে লাগেনা     

বিশ্বব্যপী  আসন্ন মন্দাকে করোনা আরও গভীর খাদে নিয়ে যাচ্ছে , ভারতে অর্থনীতির কোমড় প্রায় ভেঙে দিয়েছে প্রশাসন  কাজকর্ম স্বাভাবিক রেখে অর্থনীতিকে সচল রাখতে চাইছে বাজার  , ইঁট ভাটা , মাটি কাটা , মল , ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান , হোটেল , ট্যুরিজম , সিনেমা-সিরিয়াল শ্যুটিং  সবই খুলছে আয় বাড়ানোর জন্য তবে পুজোআর্চা , ধর্মভাব , ভক্তিভাব , ভগবান , আল্লা , গড ,মন্দির মসজিদ---এসবের তো কোমড় ভাঙেনা ! এখানে তো আয় নেই , অর্থনীতি নেই আছে শুধু ভক্তি ,  পুণ্য ,  পরকাল , স্বর্গ , বেহেস্ত..! তাহলে মন্দির মসজিদ গির্জা গুরুদ্বারা খুলে দেওয়া কেন ? চারধামের মধ্যে এক ধামের প্রধান পুরোহিত বেঁকে বসে , পরিস্কার জানিয়ে দেয় মন্দির খুলবেনা , সংক্রমণের ভয় তারও আছে হাইকোর্টে মামলা রুজু হয়েছে , মন্দির খোলার বিরুদ্ধে অনুমতি দেওয়া হলেও দিল্লি জামে মসজিদের ইমাম জানিয়েছে , এখনই সাধারণের প্রার্থনার জন্য মসজিদ খোলা হচ্ছেনা তাড়াপীঠ কালীমন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে , তারা আরও কয়েকদিন সময় নেবে তবে বেশিরভাগ মন্দিরই  খুলেছে , নির্দিষ্ট আচরণবিধি মেনে , সকালে বিকেলে তিন ঘন্টা করে , স্যানিটাইজিং টানেল দিয়ে ঢুকতে হবে ... খানিক বিজ্ঞানসম্মত ধর্মাচরণ ! কিন্তু ধর্মপ্রাণ মানুষের ঢল মন্দিরে কোথায় , পুজো দেওয়ার হিড়িক-উন্মাদনা কোথায় ? মুসলমানেরা বাড়িতেই নামাজ পড়ছে , সাধারণভাবে মসজিদ খোলেনি খুললেও এখনই মানুষ নামাজ পড়তে যাবে কি ! মক্কা মদিনা তো বন্ধই আছে মন্দিরে চরণামিত্র , চালকলা মাখা বা মসজিদে চড়ানো সিন্নি , পায়েস , বাতাসা বা খুরমা মানুষ খাবে কি , নির্ভয়ে ?   মানুষ সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে করোনা দেখছে , দুঃসহ আতঙ্কের এক যাপন বাঁচতে হবে তো আগে ধর্মাচরণ-পুজো প্রার্থনা , না জীবন ! করোনা দূর্যোগে মানুষ কাজ চেয়েছে , খাবার চেয়েছে , চিকিৎসা চেয়েছে কিন্তু সমবেতভাবে মন্দির-মসজিদ খোলার দাবি করেনি তবু মন্দির-মসজিদ খোলার এত উদ্যোগ কেন ? এমনিতেই গোঁড়ামি , অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের শকুন আকাশে উড়ছে আর এসবের চর্চা মন্দির-মসজিদ-চার্চে যে কম হয় , তা নয়

পূজাপাঠ , ধর্মাচরণ বা প্রার্থনা' বাইরে ধর্মস্থানগুলিও কি তাহলে অর্থসংকটে ভুগছে , সেগুলিকেও কি সজীব করা দরকার ? হ্যাঁ ,  মন্দিরের 'দানপাত্র'-এর মাধ্যমে কিছু বড় মন্দিরে প্রচুর আর্থিক আয় হয় সঙ্গে সোনা গয়নাও ধনী তিরুপতি মন্দিরও অর্থাভাবে কর্মচারী ছাটাই করছে কেন , কে জানে , এত সম্পদ তবুও ! তবে মাঝারী বা ছোট মন্দিরের সেবাইতরা কিন্তু করোনা থেকে বাঁচতেই চায় ! করোনা নিবারণে পূজাপাঠ না করে করোনা-আচরণবিধি মানতেই সচেষ্ট মসজিদে সাধারণত তেমন আয়ের স্রোত নেই , নামাজের পর মানুষ দানপাত্রে পাঁচ টাকা , দশ টাকা দান করে জ্বরজারি হলে মাথায় ফু দিয়ে বা জলে ফু দিয়ে মন্ত্র পড়ে স্বল্প কিছু পয়সা পায় ইমাম-মোয়াজ্জিম'রা এখন ফু' দিচ্ছেনা বা রুগীরাও নিচ্ছেনা ,  ড্রপলেট পড়তে পারে ! বিপুল আয় হয় পিরানা পীর বা আজমীর শরীফের মতো মাজারগুলিতে এই বড় মন্দির-মাজারগুলি কি গোপনে চাইছে , খুলুক ? জানা নেই কিছুদিন  বাড়িতে বসেই আল্লা-ভগবানদের পুজো চলুক না , তাঁরা রাগ করবেন না

তবু কেন খুলতে চাওয়া ? তবে কি সেই প্রাচীন পন্থা , মানুষকে ধর্মের আফিমে...

লেখক পরিচিতি : অর্থনীতি নিয়ে পড়াশুনা সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস ক্যালক্যাটা এবং জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল চেঞ্জ- গবেষক হিসেবে কাজ বিজ্ঞানমনস্কতা-যুক্তিবাদ , পরিবেশ এবং  সামাজিক ইস্যু নিয়ে লেখালেখি করেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ' একজন সায়েন্স এক্টিভিস্ট। বর্তমানে মালদা জেলার শতাব্দী প্রাচীন 'নঘরিয়া হাই স্কুল'এর প্রধান শিক্ষক।

NewsDesk - 3

aappublication@gmail.com

Newsbazar24 Reporter

Post your comments about this news