সম্পাদকীয়
বন্ধু থেকে ‘শত্রু’? ৫৪ বছরে বাংলাদেশ বদলাল, কিন্তু ভারতের দায়বদ্ধতা কি বদলাবে?
কলমে: শঙ্কর চক্রবর্তী ( সম্পাদক)
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি ছিল না, ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে ভারতের সবচেয়ে বড় নৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার মুখে দাঁড়িয়ে ভারত যে অবস্থান নিয়েছিল, তা কোনও ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নয়—বরং মানবতা, ইতিহাস ও প্রতিবেশীসুলভ দায়িত্বের পরিচয়। সেই বাংলাদেশ আজ ৫৪ বছর পরে ভারতের বিরুদ্ধেই রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছে, কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ করছে, সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতন বাড়ছে। প্রশ্ন উঠছে—ভারতের উদারতার মূল্য কি এভাবেই শোধ হচ্ছে?
ইতিহাস: ভারতের ভূমিকা কোনও ‘দয়া’ নয়, দায়বদ্ধতা ছিল
১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান যে ভাবে রাজনৈতিক, ভাষাগত ও অর্থনৈতিক শোষণের শিকার হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক মহলও স্বীকার করে। ১৯৭১ সালে পরিস্থিতি যখন গণহত্যার রূপ নেয়, তখন প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত সেই বোঝা কাঁধে নেয়—অর্থনৈতিকভাবে বিপুল চাপ সত্ত্বেও।
মুক্তিবাহিনীকে সমর্থন, আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে অবতরণ—এই সিদ্ধান্ত ভারত নিয়েছিল নিজের নিরাপত্তা ও নৈতিক অবস্থান থেকেই। স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব ভারতের নিরাপত্তা বলয়ের সঙ্গেই যুক্ত ছিল। এই ইতিহাস কোনও ‘অনুগ্রহ’ নয়, বরং যৌথ রক্তের স্মৃতি।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কেই বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি দেখেছে, তার পেছনে ভারতের সহযোগিতা অস্বীকার করা যাবে না।
বিদ্যুৎ সরবরাহ, ট্রানজিট সুবিধা, বন্দর ব্যবহার, সীমান্তে সন্ত্রাস দমন—সব ক্ষেত্রেই ভারত সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৫ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে ভারত এমন এক উদাহরণ তৈরি করেছে, যা বিশ্ব কূটনীতিতে বিরল। এক ইঞ্চি জমির জন্যও যুদ্ধ না করে সমস্যা মেটানো—এটাই ভারতের কূটনৈতিক সংস্কৃতি।
২০২৪-এর পর: ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ কেন?
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার দায় ভারতের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক চাপ ও নির্বাচনী অনিশ্চয়তার সহজ লক্ষ্য হিসেবে ভারতকে তুলে ধরা হচ্ছে।
এটি নতুন নয়—ইতিহাস বলছে, অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়লে অনেক দেশই বাইরের শত্রু তৈরি করে।
ভারতকে ‘হস্তক্ষেপকারী শক্তি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা বাস্তবতাবিবর্জিত। কারণ ভারত কখনও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করেনি। বরং বারবার বলেছে—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সে দেশের জনগণ।
বন্ধু থেকে ‘শত্রু’,৫৪ বছরে কতটা বদলেছে বাংলাদেশ ?
সংখ্যালঘু নির্যাতন: ভারতের নীরব থাকা অসম্ভব
বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর ধারাবাহিক হামলা ভারতের কাছে কেবল কূটনৈতিক ইস্যু নয়, নৈতিক দায়িত্বের প্রশ্ন।
মন্দির ভাঙচুর, বাড়িঘরে আগুন, দীপু চন্দ্র দাসের মতো হত্যাকাণ্ড—এই ঘটনাগুলিকে ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
ভারত যদি এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তা কোনও অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ নয়—বরং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী দায়িত্বশীল প্রতিবেশীর ভূমিকা।
চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা: ভারতের উদ্বেগ অমূলক নয়
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যে ভাবে বেইজিং ও ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকছে, তা ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘চিকেন নেক করিডোর’ নিয়ে মন্তব্য ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্নে সরাসরি আঘাত।
ভারত কখনও চায়নি বাংলাদেশ কোনও শক্তির প্রভাব বলয়ে ঢুকে পড়ুক। কারণ বাংলাদেশ অস্থির হলে তার প্রথম প্রভাব পড়বে ভারতেই—শরণার্থী সমস্যা থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা পর্যন্ত।
তাহলে ভারতের করণীয় কী?
ভারতের সামনে আজ আবেগের রাজনীতি নয়, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনীতির পথই একমাত্র বিকল্প।
প্রতিবাদ হবে, কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হবে, কিন্তু দরজা বন্ধ হবে না।
কারণ—
সরকার বদলায়, প্রতিবেশী বদলায় না
উত্তেজনা সাময়িক, ভূগোল স্থায়ী
ইতিহাস অস্বীকার করলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়
শেষ কথা
বন্ধু থেকে শত্রু—এই বয়ান রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। বাংলাদেশ আজ একটি সংক্রমণকাল পার করছে। এই সময়ে ভারতের সংযমই তার শক্তি, ইতিহাসই তার ঢাল।
ভারত কোনও শত্রু তৈরি করতে চায় না। কিন্তু নিজের নিরাপত্তা, সীমান্ত ও নৈতিক দায় থেকে পিছিয়েও যাবে না। এই বার্তাই আজ স্পষ্টভাবে ঢাকা ও বিশ্বমহলে পৌঁছনো দরকার।



