নবনিতা গাঙ্গুলি (news bazar24) : সেই রাজা-নবাবদের আমল থেকেই বস্ত্রশিল্পের ইতিহাসে বাংলার শাড়ির স্থান যে সবার উপরে , তা বোধহয় আর নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। যুগ পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে মেয়েদের রুচি আর চাহিদার সমন্বয়ে তৈরি হচ্ছে বালুচুরি, বেনারসি, বুটিক থেকে জামদানি থেকে হরেক রঙের শাড়ি। আর সেই দৌড়ে নদীয়ার ফুলিয়াও কম যায় না। বহু বছর ধরেই সব শারীকে টেক্কা দিয়ে আসছে বাংলার এই ফুলিয়া। বাংলার তাঁতের শাড়ির আঁতুরঘর মানেই গঙ্গার ধারের ফুলিয়ার কথা চলে আসে সবার মুখে।
খালি কি তাই বিখ্যাত লেখক কৃত্তিবাস ওঝার জন্মস্থানও এই ফুলিয়া। ফুলিয়ার বয়রা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা রামায়ণের স্রষ্টা কৃত্তিবাস। কৃত্তিবাসের জন্মভিটেতে আজও রয়েছে কৃত্তিবাস স্মৃতি গ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা। তার পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন বটগাছ। যে বৃক্ষের শীতল ছায়ায় বসে কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ অনুবাদ করেছিলেন। সেই মহাকবির জন্মস্থানের তাঁতশিল্পী পদ্মশ্রী পুরুস্কারে সম্মানিত হয়েছেন বীরেন কুমার বসাক।
তার ৫২ বছরের কর্মজীবনে পেয়েছেন একাধিক রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পুরস্কার। খালি কি তাই? জামদানি তাঁতের শাড়ির উপরে নিপুন কাজের সুবাদে পদ্মশ্রী সম্মানিত হয়েছেন বীরেন কুমার বসাক। তবে আগেও তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁত শিল্পের উপরে, এরপর পদ্মশ্রী সম্মান পাওয়াই তার কর্মজীবনের অনেকটাই সাফল্য বলে মনে করছেন তাঁত ব্যবসায়ী বীরেন কুমার বসাক। সূক্ষ্ম সুতোর কাজে ফুটিয়ে তুলেছেন বাংলার তাঁতশিল্পী।
উল্লেখ্য, বইয়ের পাতা থেকে একটা গোটা মহাকাব্য শাড়িতে ফুটিয়ে তোলা আর যাই হোক চারটিখানি কথা নয়! কিন্তু যে বাঙালি শিল্পীর হাতের জাদুতে এমনও সম্ভব হয়েছে। বিরেন বাবু মাত্র আট বছর বয়সেই মাকুড় কেরামতি বুঝে যান। তাই বাবা বঙ্কবিহারী বসাকের সঙ্গে যখন কলকাতায় বাড়ি বাড়ি তাঁত শাড়ি ফেরি করতে আসতেন, তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন এ শহরের নার্ভ সিস্টেম। মহিলাদের রুচি –অরুচি। তিনি বুঝে গেছিলেন
মানুষকে নতুন নতুন ডিজাইন দিলে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবে না। আর এই ভাবেই কাজটা নীরবে শুরু করেছিলেন তিনি। কীভাবে আরও নতুন নকশা তৈরি করা যায় তার জন্য শাড়িতে নানা রকম সুতো দিয়ে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করতেন তিনি। এর জন্য রাজ্যের নানা জায়গায় প্রদর্শনীতে পৌঁছে যেতেন বীরেনবাবু। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতেন নকশাগুলি। আর বাড়িতে ফিরে সেইসমস্ত ভাবনা শাড়িতে তুলতে থাকেন। আর এই ছকভাঙা পথই তাকে বিস্তর রাস্তা খুঁজে দেয়। বীরেনবাবুর নিজেই শাড়ি বানানো শুরু করেন। তাঁর নিজস্ব ভাবনার এইসব শাড়ি নিয়ে আগ্রহ দ্রুত বাড়তে থাকে দুই বাংলার মহিলাদের মধ্যে।
বীরেনবাবু আজ পঁয়ষট্টি বছরের ‘তাঁতযোদ্ধা । এই বয়সেও পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করার কাজটা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি’। এলাকার মেয়েদের বিনা পয়সায় নানা রকম নকশা শেখান বীরেনবাবু। তাঁর কথায়, কাজ এখনও অনেক বাকি। তাঁর দাদা ধীরেন বসাক ও ছেলে অভিনবও এই লড়াইয়ে তার যুদ্ধের সৈনিক। আসলে শান্তিপুর, ফুলিয়া জুড়ে দ্রুত বাড়ছে পাওয়ার লুম।
ইলেকট্রিক মোটর চালিত তাঁতে খুব দ্রুত শাড়ি তৈরি হয়। ফলে এই মেশিনে তৈরি শাড়ির দামও কম। এর পাশাপাশি কিছু দালালদের জন্য ফুলিয়া, শান্তিপুরে এসেও অনেকে কম দামের শাড়ি বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। এতসব বাঁধার পরেও বিরেন বাবু পরিবার মিলে হস্তচালিত তাঁতের পুনরুজ্জীবনে নিজেদের মতো করে চেষ্টা করছেন। চারশো টাকা থেকে শুরু হয় কুড়ি লক্ষ টাকার শাড়ি পাওয়া যায় বীরেনবাবুর তাঁতঘরে। যে শাড়িগুলি প্রতিটিই হাতে বোনা। যে শাড়ি নক্সি কাঁথার মত ভালোবাসায় ছোঁয়া, যে শাড়ি ইতিহাস বহন করে চলে, এক কথায়
হাতের কাজের মধ্যে যে স্নিগ্ধতা, সূক্ষ্মতা রয়েছে তা ভাল জানেন তাঁর বিরেনবাবুর ক্রেতারা । ফুলিয়া, হবিবপুর, শান্তিপুর, করিমপুর মিলিয়ে এই মুহূর্তের এই তাঁত উদ্যোগীর হাত ধরে প্রায় ৫ হাজার তাঁতশিল্পীর কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবেও কয়েকশো মানুষও উপকৃত। প্রতি বছরই প্রজাতন্ত্র দিবসের সময় পদ্মভূষণ–পদ্মবিভূষণ পুরস্কার প্রাপকদের নাম ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি। ২০২১ সালের পদ্মশ্রী সম্মান প্রাপকদের তালিকায় সেই জন্যই উঠে আসে শান্তিপুরের তাঁতশিল্পী বীরেনকুমার বসাকের নাম ।
5
