সম্পাদকীয়
news bazar24: মালদা জেলা এক সময় গঙ্গা, ফুলহার, মহানন্দা ও কালিন্দীর মতো নদীর আশীর্বাদে সমৃদ্ধ ছিল। এই নদীগুলিই জেলার কৃষি, মৎস্যচাষ, পানীয় জল এবং পরিবেশের প্রাণস্রোত ছিল। কিন্তু আজ সেই নদীগুলির জল জীবনের প্রতীক নয় — তা হয়ে উঠেছে দূষণ, দুর্গন্ধ ও বিপদের উৎস।
গত এক দশকে মালদার নদীগুলির জলমান ভয়াবহভাবে নেমে গেছে। ফুলহার ও মহানন্দা নদীর জলে এখন ভাসছে আবর্জনা, প্লাস্টিক, পয়ঃবর্জ্য ও রাসায়নিক বর্জ্য। নদীর ধারে গড়ে ওঠা অবৈধ বসতি, ছোট ছোট কলকারখানা ও পৌরসভার নর্দমা সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। ফলে এক সময়ের স্বচ্ছ নদীগুলি আজ কালো, পচা ও বিষাক্ত।
রাজ্যের হাজার হাজার স্কুলে ভর্তির সংখ্যা শূন্য, কেন্দ্রের রিপোর্ট নস্যাৎ ব্রাত্যর
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় মালদা শহরের মহানন্দা নদীতে। প্রতিদিন হাজারো লিটার অপরিশোধিত নিকাশি জল কোনো বর্জ্য শোধনাগার ছাড়াই নদীতে ফেলা হয়। এতে নদীর জলের জৈবিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নদীর পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা, প্লাস্টিক ও পশু বর্জ্য এই পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করছে।
এখন শুধু নদীর জল নয়, ঘাটগুলোর অবস্থাও করুণ। ইংরেজবাজার শহরের গয়েশপুর কালীবাড়ি ঘাট, গয়েশপুর ঘাট, নিউ গয়েশপুর রক্ষাকালি ঘাট, বাঁশবাড়ি গোসাই ঘাট, ফুলবাড়ি ঘাট, সদর ঘাট এবং মিশন ঘাট — এক সময় মানুষের নিত্যদিনের ব্যবহারের জায়গা ছিল। সকালবেলা স্নান, পূজা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান — সবই এই ঘাটগুলিতে হতো।
কিন্তু আজ এই ঘাটগুলি নোংরা জল, দুর্গন্ধ ও জঙ্গলে ভরা। অনেক জায়গায় ঘাটের সিঁড়ি পর্যন্ত দেখা যায় না, আগাছায় ঢাকা।
এখন কেবল ছট পুজোর সময় কয়েকটি ঘাট অস্থায়ীভাবে পরিস্কার করা হয় — তাও জনগণ করছে, না প্রশাসন করছে, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। উৎসবের পর ঘাটগুলির চেহারা আবার আগের মতোই নোংরা ও উপেক্ষিত হয়ে পড়ে।
আরও বড় সমস্যা হলো, পৌরসভার প্রায় সব ড্রেন নদীর মুখে গিয়ে পড়ছে। ফলে শহরের সমস্ত নোংরা জল, রাসায়নিক ও পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। নদীর কোনো সংস্কার হয় না, বছরের পর বছর নদীর বক্ষ পরিষ্কার করা হয় না। বরং সেতু নির্মাণের সময় নদীর বুক বেঁধে ফেলে কাজ হয়, পরে ঠিকাদাররা নদীর তলদেশ পরিস্কার না করেই চলে যায়।
সেচ দফতরের কর্তাদের উদাসীনতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাই এই সংকটের মূল। পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করেছেন, কিন্তু নদী সংরক্ষণ প্রকল্প কেবল কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ। “নদী পরিষ্কার অভিযান” হয় ক্যামেরার সামনে, মাঠে নয়।
আরও দুঃখজনক হলো — বিজেপির সাংসদ, বিধায়ক এবং পৌরসভার বিরোধী দলনেতা — সকলেই এই বিষয়ে নীরব। কোনো অজানা কারণে তাঁরা মুখ খুলছেন না। রাজনৈতিক দলগুলো নদীর মৃত্যুকে ভোটের ইস্যু বানাতেও আগ্রহী নয়।
ভারতের হয়ে ইতিহাস গড়লেন সবজি বিক্রেতার ছেলে মালদহের পলাশ মন্ডল
ফলত, নদী যেমন দূষিত হচ্ছে, তেমনি শহর হারাচ্ছে তার জলজ জীবন, পরিবেশের ভারসাম্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা জানাচ্ছেন, নদীতে এখন মাছ মেলে না, নদীর জল ব্যবহার করতে ভয় পান মানুষ।
এখন প্রয়োজন অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার —
1️⃣ শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বর্জ্য শোধনাগার (STP) চালু করা,
2️⃣ শিল্পবর্জ্য ও নর্দমা নদীতে পড়া বন্ধ করা,
3️⃣ নদীর ঘাটগুলোর নিয়মিত সংস্কার, আগাছা পরিষ্কার ও পলি অপসারণ,
4️⃣ ঠিকাদারদের কাজের জবাবদিহি,
5️⃣ সেচ দফতর ও পৌর প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা।
নদী শুধু জল নয় — এটি জীবনের অংশ, সংস্কৃতির ধারক। মালদার নদীগুলি মরছে আমাদের চোখের সামনে, আর আমরা সবাই চুপ।
এখনই যদি মানুষ ও প্রশাসন একসাথে না এগোয়, আগামী প্রজন্মকে আমরা দিয়ে যাব এক মৃত নদী, এক হারানো ঐতিহ্য। – শঙ্কর চক্রবর্তী





